Published : 18 Nov 2025, 12:56 PM
ভ্রমণ আমার কাছে নিছক স্থান পরিবর্তন নয়, এ এক আত্মিক রূপান্তর। যদিও নিজেকে খুব ভ্রমণবিলাসী বা ভ্রমণবিরহী কোনটাই বলি না, তবুও সুযোগের ক্যানভাসে দেশ-বিদেশের নতুন ছবি আঁকতে মনটা উন্মুখ হয়ে থাকে।
ভ্রমণ মানেই তো নতুনকে জানা, অজানাকে শেখা আর নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা। সে হোক দলবদ্ধ বা একক, আমার পথচলায় ক্লান্তি নেই। আমার পেশাগত জীবনের সূত্রেই দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে পা পড়েছে, যার অধিকাংশই ছিল দলবদ্ধ সফর।
আজকের গল্পটা আমার সর্বশেষ বিদেশ ভ্রমণের, ২০২৪ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহের এক ঝলমলে অধ্যায়। গন্তব্য ছিল পারস্য উপসাগরের তীরে জেগে ওঠা এক বিস্ময়, মরুর দেশ কাতার। মধ্যপ্রাচ্যে এটাই আমার প্রথম পদার্পণ, তাই মনের ভেতর ছিল একরাশ উত্তেজনা আর কৌতূহল।
আমাদের মতো দেশ থেকে কাতারে ভিজিট ভিসা পাওয়াটা বেশ কঠিন হলেও আমার ছোট ভাই শুভ সিংহ রনির আন্তরিক আমন্ত্রণ ও নিপুণ আয়োজনে সবকিছুই সহজ হয়ে গেল। ভিসা থেকে বিমানের টিকেট, সবকিছুই যেন জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় প্রস্তুত। অফিসের ব্যস্ততা থেকে ছুটি নিয়ে আমিও প্রস্তুত হলাম মরুভূমির বুকে এক নতুন অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে।

কর্মসূত্রে চট্টগ্রামে আমার বাস, তাই চট্টগ্রাম থেকেই আমার যাত্রা শুরু হয়। বিরতিহীন সোনার বাংলা ট্রেন আমাকে নিয়ে চলল ঢাকার পথে। পড়ন্ত বিকেলের স্নিগ্ধ আলোয় চারপাশের প্রকৃতি দেখতে দেখতে রাত পৌনে দশটায় বিমানবন্দর স্টেশনে পৌঁছাই। যাত্রার শুরুটা ছিল মসৃণ আর আনন্দদায়ক। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে দেখি ফ্লাইটের তখনও অনেক দেরি। তাই ধীরেসুস্থে বোর্ডিং পাস আর ইমিগ্রেশনের পাঠ চুকিয়ে শুল্কমুক্ত দোকানগুলোতে ঘুরতে লাগলাম।
রাত তিনটা ত্রিশে কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইট যখন ঢাকার আকাশ ছাড়ল, আমার মন তখন দোহা পৌঁছানোর অপেক্ষায় অধীর। কাতার সময় সকাল সাড়ে নটায় হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর এক নতুন পৃথিবীর দরজা খুলে গেল। এ শুধু বিমানবন্দর নয়, যেন শিল্পকলার এক বিশাল সংগ্রহশালা। মাঝখানে হলুদ রঙের সেই বিশাল ‘ল্যাম্প বেয়ার’ ভাস্কর্যটি যেন একাকী প্রতীকের মতো বসে আছে, আধুনিকতার এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মাঝে এক টুকরো সারল্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাইরে অপেক্ষায় থাকা ছোট ভাই রনি আর তার বন্ধু রাজেশের উষ্ণ অভ্যর্থনা দীর্ঘ যাত্রার সব ক্লান্তি এক নিমিষে দূর করে দিল।
বিকেলে আমি আর রনি বেরিয়ে পড়লাম দোহা শহর ছাড়িয়ে এক নতুন দিগন্তের দিকে। আমাদের গন্তব্য লুসাইল শহর, ভবিষ্যতের পাতা থেকে উঠে আসা এক জীবন্ত স্বপ্ন। শুনেছি, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে মরুভূমির শূন্য ক্যানভাসে এই শহরটি প্রায় শূন্য থেকে আঁকা হয়েছে। মনোরম ও সুশৃঙ্খল মেট্রো বাসে করে বাসার সামনে থেকেই মাতার আল কাদিম মেট্রোরেল স্টেশনে গেলাম। সেখান থেকে পাতাল রেলে চেপে বসলাম। ২০২২ বিশ্বকাপের উত্তাপ যেন এখনও শহরের বাতাসে মিশে আছে।
লুসাইল মেরিনা শহরে পৌঁছেই আমরা গেলাম আইকনিক ‘কাতারা টাওয়ার্স’ দেখতে, যা স্থানীয়দের কাছে ‘মুন হোটেল’ নামেও পরিচিত। এর স্থাপত্যশৈলী দেখে আমি মুগ্ধ! যেন দুটি বিশাল বাঁকানো তরবারি আকাশকে আলিঙ্গন করতে চাইছে। এই টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে আর সাগর পাড়ের মনোরম পথে হেঁটে আমরা অনেক ছবি তুললাম। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে টাওয়ারের আলোকসজ্জা এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করল। সেদিনের রাতটা শেষ হলো এক নেপালি রেস্টুরেন্টে মাছের বারবিকিউ দিয়ে, যার স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে।

পরের দিন সন্ধ্যায় আমরা গেলাম দোহার অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান, ‘ভিলাজিও মল’। ভাবুন একবার, বাইরে গনগনে মরুভূমি, আর ভেতরে আপনি গন্ডোলায় ভাসছেন ইতালির ভেনিসের খালে! পুঁজিবাদের এমন শৈল্পিক রূপায়ণ আর কোথায় দেখা যায়? মলের ভেতরে ঢুকতেই আমি অবাক! মাথার ওপর বিশাল সিলিং জুড়ে আঁকা হয়েছে নীলাকাশ, যেখানে সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। আর পায়ের নিচে বয়ে চলেছে কৃত্রিম খাল, যার ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে সুসজ্জিত গন্ডোলা।
আমরা খালের ওপর সুন্দর সেতুগুলোতে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম। এখানে বোরকা পরা নারীরা যখন ‘গুচি’ বা ‘প্রাদা’র শোরুম থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এক অদ্ভুত কিন্তু সুন্দর সংমিশ্রণ চোখে পড়ে। কেনাকাটার চেয়েও এখানকার পরিবেশ আর স্থাপত্যশৈলী আমাকে বেশি মুগ্ধ করেছে। মনে হচ্ছিল যেন এক রূপকথার জগতে প্রবেশ করেছি।
রনির অফিস থাকলে আমি একাই বেরিয়ে পড়তাম শহরটাকে আবিষ্কার করতে। তার দেওয়া মেট্রো কার্ডটা ছিল আমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। একদিন চলে গেলাম ‘পার্ল কাতার’, এক কৃত্রিম দ্বীপ, যা আধুনিকতা ও বিলাসের এক দারুণ মিশ্রণ। নামেই যার পরিচয়। একসময় কাতারের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে ছিল মুক্তা আহরণের ওপর। সেই ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতেই যেন সাগরের বুক চিরে তৈরি হয়েছে এই কৃত্রিম দ্বীপ, আধুনিক যুগের একগুচ্ছ মুক্তা।
আরেকদিন গেলাম দোহার ঐতিহাসিক প্রাণকেন্দ্র ‘সুক ওয়াকিফ’-এ। আধুনিক দোহার মাঝে এ যেন এক প্রাচীন আরবের মরূদ্যান। এখানে বাতাসের প্রতি পরতে মিশে আছে এলাচ, দারুচিনি আর তীব্র ‘উদ’-এর সুগন্ধ। গলির বাঁকে দেখা মিলবে বাজপাখির বাজারের (ফ্যালকন সুক), যেখানে একেকটি পাখির দাম নাকি একটি বিলাসবহুল গাড়ির সমান! বাজপাখি পালন কাতারিদের জন্য শুধু শখ নয়, এটি তাদের আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের প্রতীক।
লোকমুখে প্রচলিত, দক্ষ বাজপাখি নাকি তার মালিকের জন্য মরুভূমিতে শিকার ধরে আনত, যা ছিল বেঁচে থাকার অন্যতম রসদ। বাজারের অন্য প্রান্তে রয়েছে আরবিয়ান ঘোড়ার আস্তাবল, যাদের দেখলে মনে হয় যেন রূপকথার পাতা থেকে উঠে এসেছে।
এক সপ্তাহের এই সফরে আরও কত কী দেখলাম! যেমন, স্থপতি আই. এম. পেই-এর অনবদ্য সৃষ্টি ‘ইসলামিক আর্ট মিউজিয়াম’। প্রখ্যাত এই স্থপতি নাকি এই ডিজাইন করার আগে ছয় মাস ধরে মুসলিম বিশ্ব ভ্রমণ করেছিলেন এর আসল ‘রূহ’ বা ‘আত্মা’ খুঁজে বের করতে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, বোরকা পরিহিতা কোনো নারী যেন সাগরের দিকে মুখ করে বসে আছেন।
আর দেখলাম শিপিং কন্টেইনার দিয়ে তৈরি আলোচিত স্টেডিয়াম ‘৯৭৪’। ৯৭৪টি কন্টেইনার দিয়ে তৈরি এই স্টেডিয়ামটি আধুনিক স্থাপত্যের এক দারুণ রসিকতা, কারণ কাতারের আন্তর্জাতিক ডায়ালিং কোডও ৯৭৪! এটিই বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম স্টেডিয়াম যা পুরোপুরি খুলে ফেলা যাবে।
এই সফরে রনি, রাজিব ভাই, ওয়ালী ভাই, শুভ আচার্য্য, ফুয়াদ, মিঠুন, পাভেলসহ অনেকের আন্তরিক সঙ্গ আমার ভ্রমণকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। এক সপ্তাহ চোখের পলকে কেটে গেল, কিন্তু কাতার সফরের অপূর্ণতা রয়েই গেল। এই আধুনিক অথচ ঐতিহ্যের ধারক দেশটিতে আবার ফিরে আসার ইচ্ছা নিয়েই দেশে ফিরলাম। মরুর বুকে এই কদিনের স্মৃতি আমার জীবনের এক অমূল্য সঞ্চয় হয়ে থাকবে।