Published : 17 Aug 2025, 12:32 AM
বাংলা নাটকের উৎস সন্ধান করতে গেলে এক গভীর ধোঁয়াশাচ্ছন্ন পথে হাঁটতে হয়। এ এক পুরোনো বিতর্ক, আমাদের নাট্যকলা কি হাজার বছরের লোকায়ত ধারার বিবর্তিত রূপ, নাকি ঔপনিবেশিক কালে পাওয়া এক পশ্চিমা উপহার? একদল গবেষক, যেমন রমেশচন্দ্র মজুমদার বা সেলিম আল দীন, মনে করেন- এ মাটির গভীরে, গণমানুষের চর্চার মধ্যেই নিহিত আছে বাংলা নাটকের শিকড়।
তাদের মতে, ভরত মুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’ থেকে শুরু করে প্রাচীন ও মধ্যযুগের নানা নাট্যরীতির মধ্যেই এর উৎস খুঁজতে হবে। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে কোনো একক ব্যক্তি হঠাৎ করে নাটক ‘আবিষ্কার’ করেননি।
অন্যদিকে, সুকুমার সেন বা কবীর চৌধুরীর মতো প্রাজ্ঞজনেরা মনে করেন, আজ আমরা থিয়েটার বলতে যা বুঝি সেই প্রসেনিয়াম মঞ্চ, নির্দিষ্ট অঙ্ক ও দৃশ্যে বিভক্ত নাটক এবং স্বতন্ত্র নাট্যকারের ধারণা, তার পুরোটাই পাশ্চাত্যের অনুকরণে নির্মিত। তাদের কাছে নাটক ‘সাহিত্যের কনিষ্ঠতম সন্তান’, যার প্রাতিষ্ঠানিক জন্ম এই বঙ্গে ইংরেজদের হাত ধরেই।
এই বিতর্কের মাঝে একটি নাম উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, যিনি এক যুগান্তকারী বাঁকবদলের সাক্ষী- রুশ পর্যটক ও গবেষক গেরাসিম লেবেদেফ। ১৭৯৫ সাল। লেবেদেফ কলকাতায় স্থাপন করলেন ‘বেঙ্গলি থিয়েটার’। তারই উদ্যোগে প্রথমবার দুটি ইংরেজি নাটক ‘ডিসগাইজ’ ও ‘লাভ ইজ দ্য বেস্ট ডক্টর’ বাংলায় অনূদিত হলো এবং ‘ডিসগাইজ’ মঞ্চস্থও হলো।
লেবেদেফ বাংলা নাটকের জনক না হলেও, তিনিই প্রথম সেই দরজাটা খুলে দিয়েছিলেন, যা দিয়ে পাশ্চাত্য নাট্যরীতির আলো এসে পড়েছিল এই বঙ্গে। তার এই পদক্ষেপের পর প্রায় অর্ধশতাব্দী কেটে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে মঞ্চে ইংরেজি ও সংস্কৃত নাটকের অনুবাদ অভিনীত হতে থাকে, কিন্তু বাংলা ভাষায় একটি স্বকীয়, মৌলিক নাটক লেখার সাহস কেউ করে উঠতে পারেননি।
অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো ১৮৫২ সালে। দীর্ঘ পঞ্চান্ন বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এক বাঙালি ভদ্রলোক কলম তুলে নিলেন। তার নাম তারাচরণ শীকদার। তিনি লিখলেন ‘ভদ্রার্জুন’, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘প্রথম মৌলিক নাটক’। যদিও এ দাবি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কোন কোন গবেষকের মতে রামনারায়ণ তর্করত্নের নাটকগুলোও প্রায় সমসাময়িক, কারও মতে একটু আগে।
‘ভদ্রার্জুন’ ছিল একটি মিলনান্তক বা কমেডি ঘরানার নাটক। ঠিক সেই বছরই, সামান্য পরে, প্রকাশিত হয় যোগেন্দ্রচন্দ্র গুপ্তের ‘কীর্তিবিলাস’, যা ছিল বাংলা সাহিত্যের প্রথমদিকের বিয়োগান্তক বা ট্র্যাজেডি নাটক। কিন্তু প্রকাশের কালানুক্রমিক বিচারে তারাচরণ শীকদারই অর্জন করেন প্রথম বাঙালি নাট্যকারের সম্মান। তিনিই প্রথম সেই পথটি নির্মাণ করেছিলেন, যার ওপর দিয়ে হেঁটে পরবর্তীকালে হরচন্দ্র ঘোষ ‘ভানুমতি চিত্তবিলাস’ (১৮৫৩) কিংবা রামনারায়ণ তর্করত্ন ‘কুলীন-কুল-সর্ব্বস্ব’ (১৮৫৪) রচনার সাহস পেয়েছিলেন। তবে শর্মিষ্ঠা-কে (১৮৫৯) প্রথম সার্থক ও আধুনিক নাটক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, যার রচয়িতা মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
তারাচরণ যখন নাটকটি লিখছেন, তখন বাংলার নাট্যচর্চা মূলত সংস্কৃত নাটকের দ্বারা প্রভাবিত। কিন্তু তিনি সচেতনভাবেই সেই প্রভাবকে পাশ কাটাতে চেয়েছিলেন। তিনি বেছে নিয়েছিলেন ইউরোপীয় নাটকের আঙ্গিক। মহাভারতের সুভদ্রা হরণের পরিচিত কাহিনিকে তিনি পাঁচটি অঙ্কে বিভক্ত করেন এবং প্রতিটি অঙ্ককে আবার একাধিক দৃশ্যে বিন্যস্ত করেন।
তিনি নাটকের শুরুতে এলিজাবেথীয় নাটকের মতো একটি ‘প্রোলগ’ (গৌরচন্দ্রিকা বা উপক্রমণিকা) যুক্ত করেন। সংলাপে গদ্য ও পদ্যের মিশ্রণ ঘটান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি তৎকালীন নাটকের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সংগীতের আধিক্য এবং সঙের উপস্থিতি সচেতনভাবে পরিহার করেন। এ সবই ছিল পাশ্চাত্য নাট্যরীতির সরাসরি প্রভাব, যা বাংলা নাটকের জন্য ছিল এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।
‘ভদ্রার্জুন’ নাটকের কাহিনিবিন্যাসও ছিল সুসংহত। প্রথম অঙ্কে নারদের চক্রান্তে অর্জুনের দ্বাদশ বর্ষের জন্য বনবাস, দ্বিতীয় অঙ্কে দুর্যোধনের সঙ্গে সুভদ্রার বিবাহের আয়োজন, তৃতীয় অঙ্কে অর্জুনের প্রত্যাবর্তন এবং সত্যভামার সহায়তায় সুভদ্রার সঙ্গে তার গান্ধর্ব বিবাহ, চতুর্থ অঙ্কে নারদের প্ররোচনায় দুর্যোধনের বরবেশে দ্বারকায় আগমন এবং পঞ্চম অঙ্কে সুভদ্রা হরণ ও বলরামের ক্ষোভের মধ্য দিয়ে নাটকের সমাপ্তি। এই পর্যায়ক্রমিক ঘটনাপ্রবাহে একটি নাটকীয় গতি সুস্পষ্টভাবে লক্ষণীয়।
তারাচরণ শীকদার তার গ্রন্থের ভূমিকায় নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি ইউরোপীয় নাটকের শৃঙ্খলা অনুসারেই নাটকটিকে সাজিয়েছেন। তবে প্রথম প্রচেষ্টা হিসেবে ‘ভদ্রার্জুন’-এ কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। গবেষক সুকুমার সেন মনে করেন, নাটকটি সাহিত্য হিসেবে খুব একটা সার্থক হয়ে উঠতে পারেনি। তার মতে, বলরাম ছাড়া আর কোনো চরিত্রই সেভাবে বিকশিত হয়নি। দুর্ভাগ্যবশত, প্রথমদিকের মৌলিক নাটক হওয়া সত্ত্বেও ‘ভদ্রার্জুন’ মঞ্চস্থ হওয়ার সুযোগ পায়নি।
কিন্তু এই সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি বা সীমাবদ্ধতার পরও তারাচরণ শীকদারের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তিনি হয়তো নিখুঁত একটি শিল্পকর্ম তৈরি করতে পারেননি, কিন্তু তিনি একটি নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে, অনুবাদের বৃত্তের বাইরে এসেও বাংলা ভাষায় মৌলিক নাটক রচনা করা সম্ভব। তিনি যে পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন, সেই পথেই বাংলা নাটক তার নিজস্ব ভাষা খুঁজে পেয়েছে, নিজস্ব শৈলী নির্মাণ করেছে এবং আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে।
পরিহাসের বিষয় হলো, বাংলা নাটকের ইতিহাসে যার এমন যুগান্তকারী অবদান, সেই তারাচরণ শীকদারের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায় না। তার জন্ম, মৃত্যু, কর্মজীবন, সবই কালের গর্ভে বিলীন। বাংলা নাটকের এই পথিকৃৎ আজও আমাদের কাছে এক বিস্মৃতপ্রায় অধ্যায়। তার পূর্ণাঙ্গ জীবনচরিত উন্মোচিত হলে হয়তো বাংলা নাটকের ইতিহাসের এক অমূল্য রত্নভাণ্ডার আমাদের সামনে খুলে যাবে।