২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

সাবানের বুদবুদের ইতিহাস ও বিজ্ঞান

একটি সহজ আনন্দের গভীর গল্প

সাবানের বুদবুদের ইতিহাস ও বিজ্ঞান
‘সাবানের বুদবুদ’, শিল্পী জঁ-ব্যাপতিস্ত শারদ্যাঁ, আনুমানিক ১৭৩৪।

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 Jul 2025, 02:25 AM

Updated : 26 Aug 2026, 01:18 PM

সাবানের বুদবুদ, আমরা যাকে সাধারণত শিশুদের খেলনা হিসেবেই ভাবি। আসলে তা কেবল খেলা নয়। ছোট্ট, হালকা, রঙিন এই গোলক বহু শতাব্দী ধরে মানুষকে ভাবিয়েছে। শিল্প, সাহিত্য, দর্শন আর বিজ্ঞানে, সবখানেই বারবার ফিরে এসেছে এই বুদবুদের ঝলমলে উপস্থিতি।

প্রাচীন উৎস

প্রথমদিকে প্রাচীন মিসরীয়রা ওষুধ হিসেবে সাবানের বুদবুদ ব্যবহার করত। তারা বিশ্বাস করত, সাবান মিশ্রিত পানিতে ফুঁ দিয়ে বুদবুদ তৈরি করলে, সেই বুদবুদ শরীরের ভেতরে সুস্থতার বার্তা নিয়ে যাবে। গ্রিক ও রোমানরাও এই বিশ্বাসে বুদবুদকে ওষুধ হিসেবে দেখতেন, বিশেষ করে শ্বাসজনিত অসুস্থতা নিরাময়ের জন্য।

বুদবুদের সঙ্গে দর্শনের সম্পর্ক

“একটি বুদবুদ তৈরি করো, আর তা দেখো, তাতেই জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়,” বলেছিলেন বিজ্ঞানী লর্ড কেলভিন। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বুদবুদের ভঙ্গুরতা দিয়ে জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব বোঝাতে চেয়েছে। রোমান লেখক পেট্রোনিয়াস এক বন্ধুর মৃত্যুর পর বলেছিলেন, “আমরা মাছির চেয়েও তুচ্ছ। আমরা তো কেবল বুদবুদ!” এই চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় ল্যাটিন কথাটি: ‘হোমো বুলা’, মানে ‘মানুষ এক বুদবুদ’।

‘সাবানের বুদবুদে ফুঁ দিচ্ছে একটি বালক', শিল্পী কারেল দ্যুইহার্দ্যাঁ, ১৬৬৩, স্থান: ডেনমার্কের জাতীয় চিত্রশালা ‘স্ট্যাটেন্স মিউজিয়াম ফর কুনস্ট’।

‘সাবানের বুদবুদে ফুঁ দিচ্ছে একটি বালক', শিল্পী কারেল দ্যুইহার্দ্যাঁ, ১৬৬৩, স্থান: ডেনমার্কের জাতীয় চিত্রশালা ‘স্ট্যাটেন্স মিউজিয়াম ফর কুনস্ট’।

শিল্পের ক্যানভাসে বুদবুদ

ডাচ চিত্রশিল্পীরা ছিলেন এই ধারার অগ্রপথিক। ১৫৭৪ সালে কর্নেলিস কেটেল প্রথমবারের মতো চিত্রকলায় একটি বুদবুদের দৃশ্য আঁকেন। পরের শতকে আরও অনেক শিল্পী শিশুরা বুদবুদ ফুঁ দিচ্ছে এমন দৃশ্য আঁকেন, যাতে শিশুসুলভ আনন্দের ভেতরেও জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের বার্তা মিশে থাকে। দেখা যায়, কখনো বুদবুদের পাশে রাখা হয় খুলি, মোমবাতি বা ভাঙা ফুল; সব মিলিয়ে আনন্দের পাশেই থাকে মৃত্যুর ছায়া। তবে শিল্পী ইয়ান স্টিনের মতো কেউ কেউ আনন্দরত লোকদের পাশেও বুদবুদ এঁকেছেন। বলতে চেয়েছেন, এই আনন্দও ক্ষণিক।

সতেরশ শতকে ইউরোপের অভিজাত শ্রেণির মধ্যে সাবানের বুদবুদ এক অভিনব বিনোদন হয়ে ওঠে। শিল্পীরা তখন বুদবুদকে রঙিন ও আকর্ষণীয় রূপে উপস্থাপন করতেন। ‘বাবলোলজি’ নামে পরিচিত এই শিল্পচর্চায় অনেক খ্যাতিমান শিল্পী অংশ নিতেন, যারা পাইপ বা যন্ত্র দিয়ে বিভিন্ন আকার ও দৃশ্যের বুদবুদ তৈরি করতেন।

বিজ্ঞানের চোখে বুদবুদ

১৬৭২ সালে বিজ্ঞানী রবার্ট হুক গবেষণায় দেখান, বুদবুদের ফিল্ম যখন পাতলা হয়, তখন তার গায়ে দেখা যায় রঙধনুর মতো রঙ। আর নিউটন তার বিখ্যাত বই ‘অপটিকস’-এ ব্যাখ্যা করেন, বুদবুদের রঙ আসে পাতলা স্তরে আলোর প্রতিফলন থেকে। ১৮২৭ সালে আঁকা চিত্রকর্ম ‘নিউটন ডিসকাভার্স দ্য রিফ্র্যাকশন অফ লাইট’-এ নিউটনকে এক শিশুর বুদবুদ ফুঁ দেওয়ার দৃশ্য অবলোকন করতে দেখা যায়। ইতালীয় চিত্রশিল্পী পেলাজিও পালাজি বোঝাতে চেয়েছেন, বুদবুদও হতে পারে জ্ঞানের উৎস। যেমন আপেল মাধ্যাকর্ষণের জন্য, তেমনি বুদবুদ ছিল আলোর রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি।

উনিশ শতকে বিজ্ঞানীরা সাবানের বুদবুদ নিয়ে আরও গবেষণা শুরু করেন। তারা দেখতে পান, একটি বুদবুদ আসলে পদার্থবিজ্ঞানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নীতির উদাহরণ; যেমন পৃষ্ঠটান, মাধ্যাকর্ষণ ও বায়ুচাপ। আজও বিভিন্ন পরীক্ষায় এই ছোট্ট বুদবুদ ব্যবহার করা হয় এই নীতিগুলো বুঝতে।

‘আলো বিচ্ছুরণের রহস্য আবিষ্কার করছেন নিউটন’, শিল্পী পেলাজিও পালাজি, ১৮২৭।

‘আলো বিচ্ছুরণের রহস্য আবিষ্কার করছেন নিউটন’, শিল্পী পেলাজিও পালাজি, ১৮২৭।

সাবানের বুদবুদ হয়তো দেখতে হালকা-পাতলা আর শিশুতোষ মনে হতে পারে, কিন্তু এর ভেতর লুকিয়ে আছে জটিল রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের খেলা। বুদবুদ তৈরি হয় সাবানের পাতলা ফিল্ম দিয়ে, যেটা পৃষ্ঠটানের কারণে গুটিয়ে গোল হয়ে ওঠে। তরলের অণুগুলোর একে-অপরের প্রতি আকর্ষণ এই টান তৈরি করে। ফলাফল? বুদবুদ সবসময় গোল হয়, কারণ গোলাকার আকৃতিই সবচেয়ে কম পৃষ্ঠফলের মাধ্যমে সর্বোচ্চ আয়তন ধারণ করতে পারে।

আবার বুদবুদের রঙিন ছটা আসে আলো প্রতিফলনের কারণে। যখন আলো সাবানের ফিল্মের ওপর ও নিচের দিকে প্রতিফলিত হয়, তখন আলো-তরঙ্গের সংঘর্ষে রঙের এক অপূর্ব নাচন শুরু হয়। এই আলো-ছায়ার খেলা সবসময় বদলাতে থাকে, কারণ বুদবুদের গায়ে ফিল্মের পুরুত্বও বদলায়। বুদবুদ সাধারণত ক্ষণস্থায়ী। তবে সঠিক পরিবেশে এটি টিকে থাকতে পারে বেশ কিছুক্ষণ।

বাণিজ্যে ও বিজ্ঞাপনে বুদবুদ

উনিশ শতকে চিত্রশিল্পী জন মিলেইস একটি বালকের বুদবুদ ফুঁ দেওয়ার ছবি আঁকেন। পরে সেটি ব্যবহৃত হয় ‘পিয়ারস’ সাবানের বিজ্ঞাপনে। এই ছিল বুদবুদ-ভিত্তিক বিজ্ঞাপনের প্রথম সূচনা, যেখান থেকে বুদবুদের মানে পাল্টে যায়, এখন সে ‘তাজা ও পরিষ্কার থাকার প্রতীক’।

লেখকেরা কী বললেন?

ফ্রান্সিস বেকন লিখেছিলেন, “পৃথিবীটা একটা বুদবুদের মতো।” আর কবি রিচার্ড ক্রাশও তার এক কবিতায় বুদবুদের ভেতরকার আলো-ছায়ার খেলা বর্ণনা করতে গিয়ে এমনসব চিত্রকল্প এনেছেন যা প্রায় অলীক। দস্তয়েভস্কি লিখেছিলেন, “বুদবুদ, খাঁটি কল্পনার প্রতীক।” আর মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, “একটা সাবানের বুদবুদ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিস। ভাবো তো, যদি গোটা দুনিয়ায় শুধু একটা বুদবুদ থাকত, সেটা কিনতে কে না চাইত?”

‘সাবানের বুদবুদ’, শিল্পী চার্লস আমেদি ফিলিপ ভাঁ লু, ১৭৬৪।

‘সাবানের বুদবুদ’, শিল্পী চার্লস আমেদি ফিলিপ ভাঁ লু, ১৭৬৪।

আধুনিক যুগের আনন্দ

আজকের দিনে শিশু-কিশোররা পার্কে দাঁড়িয়ে বুদবুদ তৈরি করে, আবার পেশাদার বাবল শিল্পীরা চোখধাঁধানো প্রদর্শনী করেন। প্রযুক্তি ও নিত্যনতুন পণ্য যেমন বাবল গান, জায়ান্ট বাবল ওয়ান্ড, সব মিলিয়ে বুদবুদের অভিজ্ঞতা আগের চেয়ে আরও আনন্দময় হয়ে উঠেছে।

সাবানের বুদবুদ শুধু একটি শিশুতোষ খেলা নয়। বরং এটি ইতিহাস, বিজ্ঞান, শিল্প আর কল্পনার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। যখনই আপনি একটি বুদবুদ তৈরি করবেন, মনে রাখবেন, আপনি এক শতাব্দীপ্রাচীন রহস্য ও সৌন্দর্যের অংশ হয়ে উঠছেন।

তথ্যসূত্র: ডেইলি জে-স্টোর ডট ওআরজি