Published : 17 Nov 2025, 09:35 AM
বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস কোনটি? এই প্রশ্নের উত্তরে যে নামটি সবার আগে আসে, তিনি প্যারীচাঁদ মিত্র। কেবল একজন লেখক নন, প্যারীচাঁদ মিত্র ছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, যার জীবন ছিল নানা বর্ণে রাঙা।
একদিকে তিনি ছিলেন শিল্পপতি, অন্যদিকে সাংবাদিক, সম্পাদক, সমাজ সংস্কারক এবং অবশ্যই বাংলা উপন্যাসের সত্যিকারের পথিকৃৎ। উনিশ শতকের নবজাগরণের সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি তার মেধা ও মনন দিয়ে সমাজের প্রতিটি স্তরে রেখে গেছেন এক গভীর প্রভাব। চলুন, জেনে নিই এই বিরল প্রতিভাধর মানুষটির বর্ণাঢ্য জীবনের গল্প।
১৮১৪ সালের ২২ জুলাই কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে প্যারীচাঁদ মিত্রের জন্ম। সে সময়টা ছিল বাংলায় এক নবজাগরণের যুগ- রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং ‘ইয়ং বেঙ্গল’ গোষ্ঠীর হাত ধরে যখন সমাজের পুরাতন জীর্ণতা ভেঙে নতুন আলোর সঞ্চার হচ্ছিল। তার বাবা রামনারায়ণ মিত্র ছিলেন একজন ব্যবসায়ী, হুন্ডি ও কাগজের ব্যবসায় তার সুখ্যাতি ছিল। কলকাতার ব্রিটিশ বণিক মহলেও তার কদর ছিল। তবে তাদের আদি নিবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার পাণিসেহালা গ্রামে।
শৈশবে গুরুমহাশয়ের কাছে বাংলা এবং একজন মুন্সির কাছে ফারসি ভাষার হাতেখড়ি হয় প্যারীচাঁদের। সে যুগে ফারসি ভাষার গুরুত্ব ছিল। তবে তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ১৮২৭ সালে হিন্দু কলেজে ভর্তি হওয়া। সেখানেই তিনি সাক্ষাৎ পান কিংবদন্তি অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর। ডিরোজিওর মুক্তচিন্তা ও উদার মানবতাবাদী দর্শনে প্যারীচাঁদ প্রভাবিত হন। এই প্রভাবই তাকে ‘ইয়ং বেঙ্গল’ আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ হিসেবে পরিচিত করে তোলে এবং বাংলার রেনেসাঁসের অন্যতম নেতৃত্বে আসীন করে। ডিরোজিও ছাড়াও ডেভিড হেয়ার ও রামতনু লাহিড়ীর মতো আলোকিত মানুষের সমর্থন তিনি পেয়েছিলেন।
বাংলা সাহিত্যে প্যারীচাঁদ মিত্রের সবচেয়ে বড় অবদান নিঃসন্দেহে তার উপন্যাস ‘আলালের ঘরের দুলাল’। ১৮৫৮ সালে এটি বই আকারে প্রকাশিত হলেও, তারও চার বছর আগে অর্থাৎ ১৮৫৪ সাল থেকে তারই প্রতিষ্ঠিত মাসিক পত্রিকায় এটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করে। এই উপন্যাসের মাধ্যমেই বাংলা কথাসাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
প্যারীচাঁদ সাহসিকতার সঙ্গে তৎসম বা সাধু ভাষার জাঁতাকল থেকে বেরিয়ে এসে কথ্য ভাষায় তার উপন্যাসটি লিখেন। তার এই ভাষাশৈলী এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, পরবর্তীকালে কথ্য ভাষা ‘আলালী ভাষা’ নামেই পরিচিতি পায়। কাহিনি ও চরিত্রের প্রয়োজনে তিনি অনায়াসে তদ্ভব, চলিত ও বিদেশি শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা বাংলা ভাষাকে দিয়েছিল এক নতুন সজীবতা ও গতিশীলতা।
‘আলালের ঘরের দুলাল’-এর কেন্দ্রে রয়েছে উনিশ শতকের সমকালীন বাঙালি সমাজ। উচ্চবিত্ত পরিবারের আদুরে সন্তান মতিলালের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন এবং তার পরিণতি এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। মতিলালের চরিত্রটি সেই সময়ের এক শ্রেণির যুবকদের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এছাড়া, ঠকচাচা-র মতো চরিত্রগুলো সমাজের ভণ্ডামি ও সুবিধাবাদী মানসিকতার এক প্রতিচ্ছবি।
সাহিত্য সমালোচক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাসের শিল্পগুণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, “এই উপন্যাসে কেবল রাস্তাঘাটের কর্মব্যস্ততাই নয়, পারিবারিক জীবনের শান্ত দৃঢ়তা, আইন-আদালতের কার্যপ্রণালি এবং নবপ্রতিষ্ঠিত ইংরেজ শাসনের সমাজ নিয়ন্ত্রণের এক সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়।”
সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, “প্যারীচাঁদই ঊনবিংশ শতাব্দীর একমাত্র বাঙালি লেখক যিনি আঁকাড়া বাস্তবকে উপন্যাসে উপস্থিত করতে পেরেছিলেন।”
যদিও কিছু সমালোচক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘আধুনিক বাংলা উপন্যাসের জনক’ হিসেবে আখ্যা দিতে চান, স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্রই ‘আলালের ঘরের দুলাল’কে ‘আমাদের জাতীয় সাহিত্যের আদি সৃষ্টি’ বলে স্বীকার করে গেছেন। অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষের মতো অনেক আধুনিক গবেষকও মনে করেন, অখণ্ড সমাজদৃষ্টি এবং মানবমুখীনতার কারণে ‘আলালের ঘরের দুলাল’-ই বাংলা ভাষার প্রথম সার্থক উপন্যাস।
ঔপনিবেশিক প্রভাব অগ্রাহ্য করে প্যারীচাঁদ নিজস্ব রীতিতে উপন্যাস রচনা করে বাঙালির আত্মমর্যাদাকে নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন। এই উপন্যাসটি ইংরেজিতে ‘দ্য স্পয়েল্ড চাইল্ড’ শিরোনামে প্রকাশিত হয় এবং হীরালাল মিত্র এটিকে নাট্যরূপ দেন, যা ১৮৭৫ সালে বেঙ্গল থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়।
শুধুই ‘আলালের ঘরের দুলাল’ নয়, ছদ্মনাম ‘টেকচাঁদ ঠাকুর’ ব্যবহার করে প্যারীচাঁদ আরও অনেক সাহিত্যকর্ম উপহার দিয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে: ‘মদ খাওয়া বড় দায়, জাত থাকার কি উপায়’ (১৮৫৯), ‘অভেদী’ (১৮৭১), ‘আধ্যাত্মিকা’ (১৮৮০), ‘যৎকিঞ্চিৎ’ (১৮৬৫), ‘রামারঞ্জিকা’ (১৮৬০), ‘বামাতোষিণী’ (১৮৭১), ‘গীতাঙ্কুর’ (১৮৬১), ‘কৃষি পাঠ’ (১৮৬১), ‘ডেভিড হেয়ারের জীবনচরিত’ (১৮৭৮) এবং ‘এতদ্দেশীয় স্ত্রীলোকদিগের পূর্ব্বাবস্থা’ (১৮৭৯)।
ইংরেজি ভাষায়ও তিনি আটটি বই লিখেছেন, যার মধ্যে ‘অ্যা বায়োগ্রাফিক্যাল স্কেচ অফ ডেভিড হেয়ার’ (১৮৭৭), ‘স্ট্রে থটস অন স্পিরিচুয়ালিজম’ (১৮৮০) এবং ‘অ্যাগ্রিকালচার ইন বেঙ্গল’ (১৮৮১) উল্লেখযোগ্য। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথার বিরুদ্ধে তার লেখা ‘দ্য জেমিন্ডার অ্যান্ড রায়টস’ বইটি সেসময় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
প্যারীচাঁদ ছিলেন একজন সক্রিয় সাংবাদিক ও সম্পাদক। ১৮৫৪ সালে তিনি রাধানাথ শিকদারের সহযোগিতায় নারীদের জন্য ‘মাসিক পত্রিকা’ প্রকাশ করেন, যা ছিল সেই সময়ে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। পনেরো বছর বয়সে তিনি দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক জ্ঞানান্বেষণ’ পত্রিকার সম্পাদকীয় লেখার দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া, ১৮৮১ সালে তিনি কৃষি-বিষয়ক স্বল্পায়ু পত্রিকা ‘অ্যাগ্রিকালচার ইন বেঙ্গল’ প্রকাশ করেন, যা তৎকালীন কৃষিশিক্ষার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তার ইংরেজি লেখাগুলো ‘ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া’, ‘ক্যালকাটা রিভিউ’, ‘ইন্ডিয়ান ফিল্ড’, ‘ইংলিশ ম্যান’ ও ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’-এর মতো পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হত।
প্যারীচাঁদের কর্মজীবন শুরু হয় ১৮৩৬ সালে কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরির ডেপুটি লাইব্রেরিয়ান হিসেবে। পরে তিনি লাইব্রেরিয়ান এবং এরপর সেক্রেটারির দায়িত্বও পালন করেন। পিতার মতো তিনিও ব্যবসায় ঢোকেন। ‘কালাচাঁদ শেঠ অ্যান্ড কোম্পানি’ এবং পরবর্তীকালে ‘প্যারীচাঁদ মিত্র অ্যান্ড সন্স’ নামে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ‘গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল কোম্পানি লিমিটেড’, ‘পোর্ট ক্যানিং গ্র্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি’ এবং ‘হাওড়া ডকিং কোম্পানি’র মতো তিনটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবেও তিনি যুক্ত ছিলেন। শিল্পপতি হিসেবে তার সাফল্য প্রমাণ করে যে, বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবসা ও সৃজনশীলতার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।
উনিশ শতকের কলকাতার আলোকিত সমাজে প্যারীচাঁদ মিত্র ছিলেন এক গতিশীল ব্যক্তিত্ব, যিনি কেবল সাহিত্য বা ব্যবসায় নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি, যুক্ত ছিলেন অসংখ্য জনকল্যাণমূলক কাজ ও আন্দোলনের সঙ্গে। ১৮৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘দ্য সোসাইটি ফর দি অ্যাকুইজিশন অব জেনারেল নলেজ’-এর যুগ্ম-সম্পাদক হিসেবে তিনি জ্ঞানচর্চায় ভূমিকা পালন করেন। ‘দ্য বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি’ (১৮৪৩), ‘দ্য ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ (১৮৫১), ‘বেটন সোসাইটি’ (১৮৫১) এবং ‘দ্য ক্যালকাটা সোসাইটি ফর দ্য প্রিভেনশন অফ ক্রুয়েল্টি টু অ্যানিম্যালস’ (১৮৫১)-এর মতো অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৮৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘দ্য বেঙ্গল সোশ্যাল সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনে’র যুগ্ম-সম্পাদক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
১৮২০ সালে কেরি-প্রতিষ্ঠিত ‘অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড হর্টিকালচার সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া’র সদস্য হিসেবে তিনি কৃষি-বিষয়ে অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন, যা ভারতবর্ষের কৃষিশিক্ষার ইতিহাসে অবদান হিসেবে স্বীকৃত। তিনি নারী শিক্ষার প্রচারে উদ্যোগী ছিলেন, বিধবা বিবাহের সমর্থক ছিলেন এবং বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরোধিতা করতেন। পুলিশি অত্যাচারের বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হয় তাকে।
১৮৬০ সালে স্ত্রী বামাকালীর মৃত্যুর পর প্যারীচাঁদ প্রেততত্ত্ব ও থিয়োসফির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। সমমনাদের নিয়ে তিনি ‘ভারতীয় থিয়োসফিক্যাল সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং দেশি-বিদেশি বহু থিয়োসফিক্যাল সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন। তার পরবর্তী অধিকাংশ রচনাতেই থিয়োসফির প্রভাব দেখা যায়, যা তার আধ্যাত্মিক অনুসন্ধিৎসার পরিচায়ক। তিনি কর্নেল ওলকট এবং মাদাম ব্লাভাটস্কি সম্পাদিত ‘থিওসোফিস্ট’ পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
১৮৮৩ সালের ২৩ নভেম্বর এই অসাধারণ মানুষটি কলকাতায় মারা যান। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন এক অফুরন্ত উত্তরাধিকার। প্যারীচাঁদ মিত্র শুধু বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক নন, তিনি ছিলেন এক দূরদর্শী সমাজ সংস্কারক, সফল শিল্পপতি, অভিজ্ঞ সাংবাদিক এবং উদার মানবতাবাদী। তার ‘আলালের ঘরের দুলাল’ বাংলা সাহিত্যকে এক নতুন পথ দেখিয়েছে, কথ্য ভাষাকে দিয়েছে স্বীকৃতি। তার বহুমুখী অবদান উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আজও তিনি আমাদের অনুপ্রেরণা যোগান, মনে করিয়ে দেন যে, সত্যিকারের প্রতিভা কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না, বরং ছড়িয়ে পড়ে জীবনের প্রতিটি শাখায়।