Published : 11 Oct 2025, 01:18 PM
আমার ধৈর্য একদমই নেই, বললো মাঙ্গোশি। মা সবসময় এটাই বলে।
ধৈর্য আসলে ভালোবাসার আরেক রূপ, বললো গাছটি। ধৈর্য মানে হলো জীবনের প্রতি ভালোবাসা। যখন তুমি জীবনকে খুব ভালোবাসো, তখন অপেক্ষা করতেও তোমার আপত্তি থাকে না।
কিন্তু আমি চাই সবকিছু দ্রুত করতে। অনেক কাজ বাকি।
আমরা মহাগাছেরা সময় নিয়ে কাজ করি। শুধু একটি কুঁড়ি ফোটাতে আমাদের পুরো শীত লেগে যায়। একটি পাতা মেলে ধরতে লাগে আধা বসন্ত। আমরা সময়ের প্রেমে পড়েছি। চারপাশে দুনিয়াকে দেখি দৌড়ঝাঁপ করতে, অথচ তারা কোথাও পৌঁছায় না। আমরা ধীরে চলি, কিন্তু সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকি।
কীসে ব্যস্ত থাকো তোমরা?
বড় হতে। আলোকে জীবন বানাতে।
তোমার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লাগল, বললো মাঙ্গোশি। তুমি যেখানেই যাও, আমাদের মনে রেখো।
আমরা গাছেরা নীরবে কাজ করি, কিন্তু আমাদের সেই কাজ না হলে পৃথিবীই ভেঙে পড়বে।
আমি সবসময় তোমাদের মনে রাখব, বললো মাঙ্গোশি, আর গাছটিকে জড়িয়ে ধরল ভালোবাসায়। এরপর বাওবাব চাইল তাকে আরও অনেক জায়গায় নিয়ে যেতে। অসংখ্য আশ্চর্য গাছের সঙ্গে দেখা করাতে। তারা গেল ড্রাগন ব্লাড ট্রি-র কাছে।
সে মাঙ্গোশিকে জীবনের কিছু জাদুকরী গোপন কথা বললো, যা সে অনেক পরে বুঝতে পারবে। তারা দেখল আনুনুয়েবে গাছ, অদ্ভুত রহস্যময় আর পবিত্র। চারপাশের হাওয়াই ফিসফিস করে বলছিল, যা কিছু এর কাছে আসে, তা মরে যায়।
এক ঝটকা সফরে তারা পৌঁছল কঙ্গোর এক বনে। যেখানে আফ্রোমোসিয়া গাছ মেঘ ছুঁয়ে থাকা মুকুট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক তখনই মাঙ্গোশির মনে পড়ল তার অসুস্থ মায়ের কথা। হৃদয়টা ধক করে উঠল, সে কি অনেক বেশি দেরি করে ফেলল? আমাকে এখনই বাড়ি ফিরতে হবে, বললো মাঙ্গোশি। তাহলে শক্ত করে ধরো! বললো বাওবাব।
এক ঝলকে মাঙ্গোশি আবার ফিরে এল বনে। সে জেগে উঠল এক গাছের গোড়ায়। আকাশে তখন ভোরের আলো ফুটে উঠছে। চারপাশে ঠান্ডা। তবু সে এখনো সেই ফুল খুঁজে পায়নি। সে উঠে দাঁড়াল আর জঙ্গলের ভেতরে ঢোকার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হঠাৎ খেয়াল করল, চারপাশের গাছ নেই! সবটা জায়গা ফাঁকা, খোলা মাঠের মতো।
আর সেখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বড় বড় মেশিন। ঠিক তখনই কিছু লোক এল, হাতে করাত আর কাটার মেশিন নিয়ে। তুমি এখানে কী করছো? একজন লোক চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল। আমি আমার মায়ের জন্য ফুল খুঁজছি। মা অসুস্থ, মাঙ্গোশি উত্তর দিল।
তাহলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাও। এখানে কোনো ফুল নেই, বললো লোকটি। তাহলে তোমরা কী করছ? মাঙ্গোশি জানতে চাইলো।
আমরা এসেছি এই বাওবাব গাছটা কাটতে, সে আঙুল তুলে দেখাল।
কেন কাটতে চাও? এটা তোমাদের কী ক্ষতি করেছে?
তুমি একটা শিশু। এসব বোঝো না, বললো লোকটি।
আমি এতটুকু বুঝি যে তোমরা কোনো কারণ ছাড়াই এই গাছকে হত্যা করতে চাইছো। আর আমি সেটা হতে দেব না।
লোকটা হেসে উঠল। তুমি কী করবে? কীভাবে আমাদের থামাবে?
প্রথমে আমাকে কাটতে হবে, তারপর এই গাছ ছুঁতে পারবে, দৃঢ়ভাবে বললো মাঙ্গোশি।
লোকটা তাকিয়ে তার কর্মীদের আদেশ দিল মাঙ্গোশিকে ধরে নিয়ে যেতে। কিন্তু প্রথম যে লোকটি তাকে ধরতে এলো, মাঙ্গোশির ভীষণ চিৎকারে তার কান বেজে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ফেলে রেখে দৌড়ে পালাল।
মাঙ্গোশি যখন চিৎকার করছিল, তখন মনে হচ্ছিল সে দ্বিগুণ বড় হয়ে গেছে। গাছকাটা লোকেরা হতভম্ব হয়ে গেল, কী করবে তারা এই অদ্ভুত মেয়েটির সঙ্গে, যে তাদের কাছে গেলেই ভয়ানক চিৎকার করে উঠে, আর যার চেহারায় যেন দ্বিগুণ শক্তি ভেসে উঠছে।
কয়েক মিনিট পর আরেকজন লোক এগিয়ে এল। মনে হলো সে-ই এখানে সবচেয়ে বড় কর্তাব্যক্তি। এখানে কী হচ্ছে? সে বললো। আমি ম্যানেজার। আমাদের কাজ করতে হবে। তুমি এখনই বাড়ি ফিরে যাও।
আমি যাচ্ছি না। আমি এই গাছকে মরতে দেব না।
কেন? ম্যানেজার জিজ্ঞেস করল।
কারণ এই গাছ আমার বন্ধু।
ম্যানেজার মেয়েটির দিকে তাকাল, তারপর গাছের দিকে। একটা গাছ আবার বন্ধুও হয় নাকি? তুমি জানো গাছ দিয়ে আমরা কী করি? আমরা গাছ কেটে ঘর বানাই, আসবাব বানাই, আর কিছু গাছ দিয়ে তো বইও তৈরি হয়। এগুলো আমাদের কাজ। তাই বাড়ি চলে যাও।
না, আমি যাব না, যতক্ষণ না তুমি আমাকে প্রতিশ্রুতি দাও যে এই গাছ কাটা হবে না।
ম্যানেজার আবার গাছের দিকে তাকাল। তার চোখে সেটা কেবল একটি গাছই। আমি চাইলে পুলিশ ডাকতে পারি তোমার জন্য, সে বললো। কিন্তু ডাকব না। তবে বলো তো, কেন এই গাছ তোমার বন্ধু?
সে কেবল আমাদের সাহায্য করতে চায়। সে আমাদের বাতাস দেয়। সব গাছই আমাদের বন্ধু। তারা আমাদের ভালোবাসে। তাদের ছাড়া আমরা বাঁচব না।
ম্যানেজার মাঙ্গোশির দিকে তাকিয়ে রইল। আমারও তোমার বয়সী একটা মেয়ে আছে, সে বললো। যদি সে তোমার মতো সাহসী হতো, তবে আমি খুব গর্ব করতাম। তাই আমি তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমরা এই গাছ কাটব না।
শুধু এই গাছ নয়, অন্যগুলোও নয়। কল্পনা করো, আকাশ থেকে কেউ যদি আসে আর বলে, তোমাকে বাঁচাব। কিন্তু তোমার চারপাশের সবাইকে মেরে ফেলব, তাহলে কেমন লাগবে? মাঙ্গোশি জিজ্ঞেস করল।
ম্যানেজার উত্তর দিতে পারল না। ততক্ষণে দিন গড়িয়ে গরম বেড়ে গেছে। লোকগুলো অস্থির হয়ে উঠল। কিন্তু এরই মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ল, এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে বনে। একটি ছোট মেয়ে একদল গাছকাটা লোকের কাজ আটকে দিয়েছে। এমনকি এক সংবাদপত্রের লোক এসে হাজির হলো, সঙ্গে ক্যামেরা নিয়ে। সে একা আসেনি। ধীরে ধীরে চারপাশে লোক জড়ো হতে লাগল।
তারা দাঁড়িয়ে দেখল, একটি ছোট মেয়ে গাছের সামনে দাঁড়িয়ে, দু’হাত ছড়িয়ে যেন তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করছে। সে কী করছে? লোকজন জানতে চাইলো।
সে গাছ কাটতে দিচ্ছে না।
কেন?
সে মনে করে বন আমাদের রক্ষা করে।
সে ঠিকই বলছে! মানুষজন বললো।
আরও বেশি লোক জড়ো হতে লাগল। যত মানুষ জড়ো হলো, ততই গাছকাটা লোকদের পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে উঠল। ম্যানেজার মাঙ্গোশিকে টাকা দিতে চাইলো, কিন্তু সে নিল না। সে ভয়ও দেখাল, পুলিশ ডাকবে, তাকে ধরে নিয়ে যাবে।
কিন্তু মাঙ্গোশি ভয় পেল না। তোমরা আমার বন্ধুকে মেরে ফেলতে পারবে না, সে দৃঢ় কণ্ঠে বললো। মানুষেরা তাকে সমর্থন করল। চারপাশের গ্রামের শিশুরা খবর পেয়ে দৌড়ে এলো তার পাশে দাঁড়াতে। তাদের বাবা-মায়েরাও এলেন। তুমি কী করছ? শিশুরা জিজ্ঞেস করল। ওরা বন কাটতে চায়। আমি মনে করি, আমাদের থামানো উচিত।
শিশুরা বন ভালোবাসত। তারা কিছুতেই বুঝতে পারছিল না, মানুষ কেন বন কেটে ফেলে। এই গাছ আমার বন্ধু, বললো মাঙ্গোশি। শিশুরা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল সেই বৃদ্ধ বাওবাব গাছের দিকে। গাছটিও তাদের দিকে তাকাল, তবে কিছু বললো না। সে নিশ্চুপ রইল, খুশি হলো। কারণ ছোট ছোট শিশুরা তার চারপাশে খেলছিল। মাঙ্গোশির যখন ক্ষুধা পেল, সে মায়ের বানানো খাবার খেল। তৃষ্ণা পেলে শিশুরা মায়ের কাপ দিয়ে পানি এনে দিল।
চলবে...