Published : 24 Mar 2026, 01:32 AM
রাতে ঘুম হচ্ছে না, খাবার যেন গলা দিয়ে নামতেই চায় না। একা থাকলেই মাথায় নানা রকম দুশ্চিন্তা ভর করে, আত্মহত্যার চিন্তা ফিরে ফিরে আসে। এরকম মানসিক সমস্যায় ভুগে চিকিৎসকের কাছে না গিয়েই দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাচ্ছেন অতশী (ছদ্মনাম)।
২৫ বছর বয়সী এ তরুণী মনে করছেন, এ সমস্যার জন্য চিকিৎসক দেখিয়ে ওষুধ খাওয়া শুরু করলে সেখান থেকে আর ফেরা সম্ভব হবে না; তাই তিনি চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন না।
ইউটিউব ও গুগল ঘেঁটে ‘মাথা ঠাণ্ডা রাখার’ ও ঘুমের ওষুধ কিনে খাচ্ছেন তিনি।
অতশী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তার মধ্যে আমি একটা মেয়ে মানুষ; শুনেছি সাইকিয়াট্রিস্টরা যেসব ওষুধ দেন সেগুলোতে থাইরয়েডের সমস্যা হয়, ওজন বাড়ে, চুল ঝরে যায়।
“নিজেই নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু রাত হলে তো একা থাকতেই হয়। তখন অনেক চিন্তা আসে। সেটা যেন ফিল না করি সেজন্য খাওয়া শেষ হলেই ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলি।”
ওষুধ ছাড়াও যে কাউন্সেলিং এর সুযোগ রয়েছে, তা জানা নেই তার। মনরোগ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা বললে বন্ধুরা তাতে সায় দেয়নি বলে জানালেন অতশী।
“তারা বলে, আমরাইতো আছি। কিন্তু আমি যে একটা জিনিস শেয়ার করব, ওটা শোনার সময়ও ওদের নাই। ওদের সঙ্গে এক ঘণ্টায়ই বসলাম, কিন্তু বাসায় এসে আমাকে সেইম জিনিসই ফিল করা লাগবে। আর আমাদের সমাজে সাইকিয়াট্রিস্ট মানেই পাগলের ডাক্তার।”

একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গত বছর স্নাতক শেষ করেছেন অতশী। ছয় মাস চাকরিও করেছেন। বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে গতবছর চাকরি ছেড়ে দেন। স্নাতকোত্তরেও ভর্তি হননি আর। সাড়ে তিন বছরের প্রেমের সম্পর্ক সম্প্রতি ভেঙে যায়। এরপর থেকেই মানসিক অবসাদে ভুগছেন তিনি।
অতশী বলছেন, সাত দিন তিনি না খেয়ে ছিলেন; আট কেজি ওজন ঝরেছিল। তখন তার পরিবার কবিরাজ দিয়ে তাকে ‘ঝাড়ায়’।
সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, চাকরি না হওয়া- এসব নিয়ে যখন সমস্যায় ভুগছেন তখন তার বিয়ের উদ্যোগ নেওয়ার কথা তুলে ধরে অতশী বলেন, “তারা বুঝতেছে না, আমি মাত্র একটা সম্পর্ক থেকে বের হয়েছি; ওটাই প্রসেস করতে পারছি না। নতুন একটা সম্পর্কে কেমনে যাব?
“ওরা আসলে সমাজ দেখে, কিন্তু আমার যে একটা মানসিক চাপ যাচ্ছে এটা বুঝতেছে না।”
বর্তমানে অতশী ঢাকায় একা থাকছেন। ফলে একাকিত্ব আরও ঘিরে ধরছে তাকে।
“সারাক্ষণ আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় ঘুরে। বাসা থেকে বের হতে চাই। কিন্তু কারো সঙ্গে বের হওয়ার সুযোগ নাই। একটা সম্পর্কে থেকে অনেক পিছিয়ে গেলাম আমি।”
দেশে অতশীর মত অনেকেই মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। কিন্তু সমাজের কাছে হেয় হওয়ার ভয়ে বেশিরভাগই চিকিৎসকের কাছে যান না। আবার যখন যাওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন কাছেধারে চিকিৎসক পান না।
সময় গড়ালেও পরিস্থিতির যে উন্নতি হচ্ছে না, তা উঠে এসেছে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ বলছে, ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক, ১২ দশমিক ৬ শতাংশ শিশুর মানসিক সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে ৯১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক আর ৯৩ শতাংশ শিশু চিকিৎসা সেবার বাইরে রয়েছে। পরবর্তীতেও এমন পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা।

এত লোক মানসিক স্বাস্থ্য সেবার বাইরে থাকার কারণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী সেবাকেন্দ্র, সচেতনতা, প্রচারের অভাব আর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কম বাজেটকে দায়ী করছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ৯০ শতাংশ সেবাকেন্দ্রই ঢাকাকেন্দ্রিক। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ঢাকা মেডিকেল ও অনেক জেলা সদর হাসপাতালে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ-সাইকিয়াট্রিস্ট থাকলেও পুরো জেলায় সংখ্যাটা এক বা দুই।
ফলে সমস্যায় পড়লে চিকিৎসকের তথ্য না পেয়ে ভুক্তভোগীরা ওঝা, কবিরাজের কাছে গিয়ে পানি পড়া, ঝাড়-ফুঁক নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
“সাইকোলজিস্ট একদমই পাওয়া যায় না। আর সমস্যাটাকে অতিপ্রাকৃত, জ্বিন-ভূতের আছর, অভিশাপ, পাপের ফল মনে করা হয়।”
অধ্যাপক কামালের পর্যবেক্ষণ, পরিবারের কারোর মানসিক সমস্যা হলে; সে পরিবার আত্মগ্লানিতে ভুগতে থাকে, সামাজে তাদের ছোট করে দেখা হয়, অন্য সদস্যদের বিয়ের ক্ষেত্রে সমস্যা হয়- যার ফলে রোগটাকে গোপন করার চেষ্টা হয়।
“মানসিক রোগের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার বিষয়টাকে দেখে, ‘আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি’। আমরা কথায় কথায় বলি, পাবনায় পাঠিয়ে দেব। পাবনা বিষয়টা এল, ওখানে একটা বিশাল মানসিক হাসপাতাল আছে। এসব কারণে মানুষ চিকিৎসকের কাছে যায় না। বা গেলেও অনেক দেরিতে যায়। ততদিনে রোগটা জটিল হয়ে যায়।”
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাহবুবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, দক্ষ জনবল, অবকাঠামো আর সচেতনতার অভাবে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
“আর সচেতন হলেইতো শুধু হবে না, সার্ভিস তো পেতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটা রোগীর যদি জেলা শহরে এসে চিকিৎসা নিতে হয়- সে চিন্তা করবে ‘কবিরাজই দেখাই’। জেলা শহরেইতো দিতে পারতেছি না সাইকিয়াট্রিস্ট, সংখ্যা অল্প।”
এছাড়া কুসংস্কার, সামাজিক অপবাদ, মানসিক চিকিৎসা খাতে বাজেট কম থাকাকেও কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি।

ওষুধ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য ও ওষুধের দুষ্প্রাপ্যতার বিষয়টি তুলে ধরে মাহবুবুর রহমান বলেন, “মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ওষুধগুলো বিভিন্ন জেলায়, উপজেলায় যে পাওয়া যায় না এটাও একটা কারণ। যারা সুস্থ্য আছে তারাও মানসিক রোগীগুলোকে অবহেলার চোখে দেখে। যে কারণে এ সমস্যাগুলো বেশি হচ্ছে।”
যাতে এমবিবিএস পাস করা চিকিৎসকরাও প্রাথমিকভাবে সেবাটা দিতে পারেন, সেজন্য ২০১৩ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন উপজেলায় তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলেছেন ডা. মাহবুবুর।
ওষুধ নির্ভরতা আর ওষুধ খেলে শারীরিক সমস্যা তৈরি হওয়ার যে ধারণা রয়েছে, সেটাকে ভুল বলছেন তিনি।
“কিছু কিছু রোগ আছে, সবসময় ওষুধ খেতে বলি। সমস্যা যদি হয়ও, এটাকে দূর করার পদ্ধতি আছে কিংবা ওষুধ বদলে দিতে পারি। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা খুব কম।”
চার বছর ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আহমেদ (ছদ্মনাম)। তবে কেন এই সমস্যা, সে কারণ জানা নেই তার। আর যেসব সমস্যা অনুভব করছেন সেগুলো বোঝানোর অপারগতা আর আর্থিক সংকটের কারণে সেবা না নেওয়ার কথা বলছেন তিনি।
“এইজন্য আমার টাকাটা লাগবে, সেটা বাসায় বোঝাতে পারব না। উত্তরটা জানা থাকলে হয়ত সমাধান হয়ে যেত। আমি কমফোর্ট ফিল করতেছি না। মনে হয় সামথিং রং। কিছু একটা নাই নাই। মাঝেমধ্যে সুইসাইডের চিন্তা আসে, কিন্তু যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার চেষ্টা চলে।
২০২৪ সালে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর আঁচল ফাউন্ডেশনের চালানো এক গবেষণা বলছে, তাতে অংশ নেওয়া ৭৯ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী হতাশায় ভোগার কথা বলেছেন।
ক্যাম্পাসে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হয় কিনা, এ প্রশ্নে ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী হ্যা, ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী না উত্তর দিয়েছিলেন। আর ২৬ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন এ সম্পর্কে তারা কিছু জানেন না।

ওই গবেষণার সমন্বয়ে ছিলেন শেখ রফিকউজ্জামান। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা কম হয় এবং এই সেবাকে ‘ট্যাবু’ হিসেবে দেখা হয়।
“শিক্ষা ব্যবস্থায় মানসিক সমস্যার উপসর্গ, স্টিগমাগুলো এখনও সেভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। শিক্ষার্থীদের শেখানো হয়নি কিভাবে অল্পতে সন্তুষ্ট থাকা যায়, শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে পারেন না।
“শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বুঝবেন, সে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে না। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে এমন ফাউন্ডেশন, সংস্থা, চিকিৎসক, কর্মী সবকিছুরই প্রচণ্ড অভাব।”

চিকিৎসা না নিলে কী অসুবিধা?
অধ্যাপক কামাল বলছেন, মারাত্মক মানসিক সমস্যার চিকিৎসা শুরুতেই নিলে সেটা জটিল হয় না। আগেই ভালো হয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে।
“অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় পরিবারও বুঝতে পারে না, দেরি করে ফেলে। সমস্যাটা জটিল হয়ে যায়। আর যেগুলো ছোটখাটো সমস্যা সেগুলো মানুষ কোনোভাবে অ্যাডজাস্ট করে চলার চেষ্টা করে।
“ডিপ্রেশনকে প্রাথমিকভাবে অ্যাড্রেস করা গেলে, রিকভারি করা যায়; নাহলে যার ডিপ্রেশন হবে তার আত্মহত্যা করার প্রবণতা অনেক বেড়ে যাবে। মানসিক সমস্যা তীব্রভাবে কর্মক্ষমতাকে হ্রাস করে দেয়।”
সেবার অপ্রতুলতার কারণে দেশে চরম অসহিষ্ণুতা বা সহনশীলতার অভাব বাড়ার কথাও বলছেন তিনি।
অধ্যাপক কামাল বলছেন, “একে অন্যের কথা শুনতে চায় না, সবকিছু রাগ, সহিংসতা দিয়ে সমাধান করতে চায়, নিজের মত অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে বাধ্য করে, মেনে না নিলে রেগে যাচ্ছে, মিছিল করে, সমাবেশ করে মারধর করছে, রাস্তা-ঘাটে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে- এগুলো মানসিক স্বাস্থ্যহীনতার ফলে হচ্ছে।
“সেবা না নিলে যত সময় যাবে আত্মহত্যার প্রবণতাটা বেড়ে যাবে, তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি, ইন্টারনেট আসক্তি বেড়ে যাবে, বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িয়ে যাবে- সেটা সামাজিক, আর্থিক অপরাধ হতে পারে।”
তিনি বলছেন, তীব্র মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ক্ষেত্রে গায়েবি আওয়াজ শোনা, অতিরিক্ত কথা বলা, অসংলগ্ন আচরণ, ঘুম না হওয়া, সহিংস হওয়া, কারো কথা না শোনা, নিজের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে উদাসীনতা, কোনো একটা আচরণ অতিরিক্ত করা বা কোনো একটা আচরণ যা না করার মত তা করা।
তার ভাষায়, আনন্দ নেই, কোনো কিছু নেই তারপরও যে ব্যক্তি হাসছে; তার হাসি থামছে না, দিনের পর দিন এরকম করা- এটা অস্বাভাবিকতা। আর যার একেবারেই কোনো আনন্দ নেই, হাসি নেই; ভালো-মন্দ সব খবরেই বিষণ্ন, সেটাও সমস্যা। এগুলো দীর্ঘ সময় থাকলে চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
“ওষুধের মাধ্যমে এবং কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রই সমাধান সম্ভব। সিরিয়াস হলে হয়ত সারাজীবন ওষুধ খেতে হবে। নিয়ন্ত্রণ করে চলতে হবে।”

গুরুতর মানসিক সমস্যায় যারা ভুগছেন, তারা চিকিৎসা না নিলে ধীরে ধীরে জীবনের মান কমা, কর্মক্ষমতা হারানো, উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়ার মত সমস্যায় পড়তে পারেন।
মাহবুবুর রহমান বলেন, “অনেক রোগী পথে পথে ঘুরে, কিংবা সমাজে ঠাঁই হয় না। দ্রুত চিকিৎসার ভেতরে চলে আসলে উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যত দেরি হয়, ততই ভালো না হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।”
শেখ রফিকউজ্জামান বলেন, সেবা না নিলে গভীর বিষণ্নতা তৈরি হবে। এর ফলে দৈনিক কাজে মনোযোগ দিতে না পারা, উদ্বেগ, প্যানিক অ্যাটাক, নিজেকে শেষ করে দিতেও দ্বিধা করবে না।
“আত্মহত্যা না করলেও খিটখিটে হয়ে যাবে, আক্রমণাত্মক হয়ে যাবে, আবেগের বিষয়গুলো আস্তে আস্তে চলে যাবে, দীর্ঘমেয়াদী কোনো ট্রমা হতে পারে।”
সংকট কোথায়?
মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কর্মরত জনশক্তি প্রতি লাখ জনসংখ্যার জন্য ০.৫০ জন। সাইকিয়াট্রিস্ট প্রায় ৩৫০ (প্রতি লাখ জনসংখ্যার জন্য ০.১৭ জন), সাইকোলজিস্ট ৫৬৫ (প্রতি লাখ জনসংখ্যার জন্য ০.৩৪ জন), সাইকিয়াট্রিক সোশাল ওয়ার্কার ৭ (প্রতি লাখ জনসংখ্যার জন্য ০.০০৪ জন) ও অকুপেশনাল থেরাপিস্টের সংখ্যা ৩২৪ (প্রতি লাখ জনসংখ্যার জন্য ০.১৮ জন)।
আর মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাধারণ চিকিৎসক ২১ হাজার ২৬৭, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কর্মী ৯ হাজার ৪০০, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স ২৮ হাজার ১৬৫, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক হাসপাতালে কর্মরত সেবিকা ৭০০, স্পিচ থেরাপিস্ট ১৭২ জন রয়েছেন।
উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি পড়ানো হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষায়িত স্নাতকোত্তর কোর্স থাকলেও, আলাদা কোনো বিভাগ নেই।

বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে জনবল রয়েছে চারশর কম। তবে ৮৭৯ জন জনবলের প্রস্তাব করা হয়েছে বলেছেন ইনস্টিটিউটের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কামরুজ্জামান মুকুল।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গত মার্চে প্রস্তাব করা হয়েছিল। রাজনৈতিক সংকট ও সরকার বদলের কারণে কাজ থেমে আছে। আবার শুরু করব আমরা। জনবল সংকটে চিকিৎসা ব্যহত হচ্ছে, সার্বিক কার্যক্রমে সমস্যা হচ্ছে।”
ইনস্টিটিউটে প্রতিদিন ১৫-২৫ জনের মত রোগী ভর্তি হয়। সেখানে ৪০০টি শয্যা অনুমোদিত হলেও জনবল সংকটের কারণে ৩৬০টি ব্যবহার করা যাচ্ছে। এর বাইরে তাদের ১৮টি পর্যবেক্ষণ শয্যা রয়েছে।
সেখানে রোগী ভর্তির দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক জেবুন নাহার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সোহরাওয়ার্দী, সলিমুল্লাহ, ঢাকা মেডিকেল কলেজেও সাইকিয়াট্রির আলাদা বিভাগ থাকলেও রোগীদের তা জানা নেই। ফলে এখানে চাপ বেশি থাকায়, প্রায়ই রোগী ভর্তি নেওয়া সম্ভব হয় না।
“মানসিক যত সমস্যা আছে, সবখান থেকে এখানে রেফার করা হয়। এখানে ফ্লোরিংয়েরও সিস্টেম নাই। যারা ভর্তি হয় তাদের দীর্ঘদিন সেবা দিতে হয়। রেসপন্স বুঝতে বুঝতেই অনেক সময় লাগে। ফাঁকা হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়।”
সমাধান কোন পথে?
মানসিক রোগীদের সেবার আওতায় আনতে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবায় যারা নিয়োজিত তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন মাহবুবুর রহমান।
তিনি বলেন, “উপজেলা, জেলা হাসপাতালে সার্ভিসটা পাওয়া যাচ্ছে এ খবরটা যদি পৌঁছে দিতে পারি তাহলে হয়ত রোগীরা আসবেন। তারা প্রাথমিক চিকিৎসাটা দেবেন, প্রয়োজনে আমাদের কাছে রেফার করতে পারেন।”

মহামারীর সময় অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ যশোর, বাগেরহাট, রামপাল এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লাবসহ সব জায়গায় প্রচার চালান। এরপর থেকে সেখানকার মানুষ সচেতন হয়ে সমস্যা হলে চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন বলেছেন তিনি।
বাজেট ও প্রচার বাড়ানো, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি সেবা কেন্দ্রগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দিতে পারে এমন সাইকিয়াট্রিস্ট এবং সাইকোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ তার।
“সবার এক্সেস বাড়াতে হবে। সাতক্ষীরায় কোনো সাইকিয়াট্রিস্ট নেই। মানুষ আমার কাছে ফোন করে বলে, ‘এমন সমস্যা কোথায় যাব?’ আমাকে বলতে হয়, খুলনায় বা যশোরে যান।
“সবার পক্ষে বা গরীব মানুষের পক্ষে যাওয়ার আসার খরচ… দূরে তো। আর মানসিক রোগ যার আছে, তাকে নিয়ে যাওয়ারও একটা ব্যাপার আছে।”
শেখ রফিকউজ্জামান মানসিক সমস্যার বিষয়গুলো আলোচনায় নিয়ে আসার কথা বলছেন।
“আলোচনা কম হওয়ার কারণে মানুষ বুঝতে পারছে না, এটা মানসিক সমস্যা- যেটার চিকিৎসা নিলে ভালো হতে পারে। এডুকেশন পলিসিতে এটা ঢোকাতে হবে, এ খাতে জনবল বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রটা অবহেলার শিকার।”
জনবল বাড়ানো, অবকাঠামো উন্নয়ন, সাধারণ শিক্ষা ও চিকিৎসা শিক্ষায় মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা থাকার কথা বলেছিলেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান।
মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অর্থ বরাদ্দের তথ্য দিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেছিলেন, দেশে প্রশিক্ষিত জনবলের সবচেয়ে বেশি ঘাটতি। এর পাশাপাশি সচেতনতার জন্য সাধারণ ও চিকিৎসা শিক্ষা- দুই জায়গাতেই গুরুত্বটা বাড়বে পর্যায়ক্রমে।