Published : 16 Sep 2025, 11:34 AM
কিংবদন্তি শিল্পী ফরিদা পারভীনের দুঃশ্চিন্তা ছিল, তার অনুপস্থিতিতে 'অচিন পাখি সংগীত একাডেমি' চলবে কি করে!
মৃত্যুর মাসখানেক আগে এ প্রতিষ্ঠানের সংগীতের শিক্ষক মারুফ হোসেনকে তিনি বলেছিলেন, ‘অচিন পাখি’ যেন এগিয়ে নেওয়া হয়।
‘গুরুর’ সেই কথাটিকেই ‘শেষ নির্দেশনা’ হিসেবে মেনে নিয়েছেন এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা।
লালনের সাধক-শিল্পী ফরিদা পারভীনের প্রয়াণের পর ‘অচিন পাখির’ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলেছেন, তারা ফরিদা পারভীনের আদর্শ লালন করে এবং তার প্রতি দায়বদ্ধ থেকে ‘অচিন পাখির’ কার্যক্রম ধরে রাখবেন।
এ প্রতিষ্ঠানের পুরনো এক শিক্ষার্থীর কথায়, ‘অচিন পাখি’ মূলত চলত ফরিদা পারভীনের গানের আয়ে। তার ঘনঘন অসুস্থতায় প্রতিষ্ঠানের ভবন ভাড়া এবং শিক্ষকদের বেতন দিতে তাদের হিমশিম খেতে হয়েছে।
ঢাকার তেজকুনি পাড়ার হোন্ডার গলিতে একটি ভাড়া বাড়িতে ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশন 'অচিন পাখি সংগীত একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা পায় ১৬ বছর আগে। ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে লালনের গানের যে চর্চা হয়ে এসেছে গেল পাঁচ দশক ধরে, সেটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে তিনি এই প্রতিষ্ঠান তিলে তিলে গড়ে তোলেন।
শনিবার রাতে যখন ফরিদা পারভীনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চার তলার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের সামনে আরও অনেকের সঙ্গে ভিড় করেছিলেন ‘অচিন পাখি সংগীত একাডেমির’ শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
আরও পড়ুন:
শেষ সাক্ষাৎকার: লালনের গানের সঙ্গে ফরিদা পারভীনের এক জীবন
হাসপাতালে ওই রাতে 'অচিন পাখির’ কয়েকজন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয় গ্লিটজের।

‘অচিন পাখির’ সংগীতের শিক্ষক মারুফ হোসেন স্মরণ করেন শেষ কয়েক মাসের কথা, ফরিদা পারভীনের সঙ্গে তার শেষ কিছু কথা।
মারুফ গ্লিটজকে বলেন, “মে মাসের পর আর অচিন পাখিতে আসতে পারেননি আপা। তিনি আশা করেছিলেন, সুস্থ হয়ে আমাদের সঙ্গে বসবেন, একসঙ্গে পরিকল্পনা করবেন কীভাবে একাডেমিটা সুন্দরভাবে চালানো যায়। জুলাইয়ে অসুস্থ হয়ে বাসায় ফেরার পর আমরা স্টুডেন্ট-শিক্ষকরা গিয়েছিলাম উনাকে দেখতে। কয়েকবার করেই গিয়েছিলাম।
আরও পড়ুন:
‘গান গাইতে না পেরে হারাম হয়েছিল ঘুম, সেদিনই বুঝেছিলাম লালনই আমার পথ'
অচিন দেশের যাত্রী হলেন লালনশিল্পী ফরিদা পারভীন
"অসুস্থতার পর কিছুটা স্মৃতিভ্রম হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মধ্যে আমাকে চিনতেন, আবার চিনতেন না। ফুসফুসে সমস্যা ছিল বলে উনার কাছে যেতে ভয় পেতাম। তবে একদিন যাওয়ার পর উনি আমাকে চিনেছেন এবং একটা কথাই বলেছেন, ‘অচিন পাখি এগিয়ে নিয়ে যেও।’ মনে হচ্ছে, এ কথাটাই উনার শেষ নির্দেশনা ছিল।”

২০০৮ সাল থেকে ফরিদা পারভীনের সঙ্গে পরিচয় মারুফের। ওই বছর ১৯ মার্চ ‘অচিন পাখির’ কার্যক্রম শুরুর সময় থেকেই তিনি একাডিমির সঙ্গে আছেন।
ফরিদা পারভীনকে হারিয়ে এই শিক্ষকের মুখে শোনা গেল দায়বদ্ধতার প্রতিশ্রুতি।
“লালনের গানকে যদি কেউ সবচেয়ে নিবিড়ভাবে ধারণ করে থাকেন, সেটা ফরিদা পারভীন। তার ধ্যান-জ্ঞানই ছিল, বাচ্চারা লালনকে শিখুক, বাঁচুক সেই দর্শনে। এখন আমাদের সাধ্যমত আপার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা থেকে আমরা অচিন পাখি চালিয়ে যাব। আগানোর চেষ্টা করব।"
অচিন পাখির বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ফরিদা পারভীনকে 'আম্মা' বলতেন।
চোখ মুছতে মুছতে শিক্ষার্থী সামার জাইমা বললো, “আমরা তো ভেবেছিলাম আম্মা (ফরিদা পারভীন) আবার সুস্থ হয়ে আসবেন, ধীরে ধীরে হলেও আমাদের সঙ্গে বসে গান শেখাবেন। উনার এই চলে যাওয়া আমাদের অচিন পাখির গান শেখার আসরটা চিরকালের জন্য অপূর্ণ করে দিল।”
শিক্ষার্থী মাহের লাবিব খান কাঁপা গলায় বলছিল, “আম্মার (ফরিদা পারভীন) চলে যাওয়া আমাদের জন্য, সংগীতের জন্য মেনে নেওয়া অনেক বেশি কষ্টকর হবে। উনি সবসময় আমাদের মধ্যে জীবিত থাকবেন। উনার আদর্শকে ধারণ করে অচিন পাখি নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব।”
অভিভাবকরাও স্তম্ভিত। তাদের মুখে একটাই কথা, তারা তাদের সন্তানদের একজন অভিভাবক হারিয়েছেন।
আরও পড়ুন:
শহীদ মিনারে ফরিদা পারভীনকে শেষ বিদায়
শেষ বিদায়ে ফরিদা পারভীনকে শ্রদ্ধা
ইয়াসিন আলী খান নামের একজন অভিভাবক বললেন, "ফরিদা পারভীনের কাছে আমাদের সন্তানরা যেন শুধু গানই শেখেনি, শিখেছে মানবতার বাণী, ভালোবাসার শিক্ষা। গুরু না থাকলেও তার বাণী যেন টিকে থাকে সেই চাওয়া এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের থাকবে।”
ফরিদা পারভীনের মৃত্যুর দুইদিন পর সোমবার কথা হয় ‘অচিন পাখির’ দেখাশোনার সঙ্গে যুক্ত আরেক শিক্ষার্থী আতিকুল ইসলাম আতিকের সঙ্গে।
তিনি বলেন, "আম্মাকে হারিয়ে অচিন পাখির অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশ কিছুদিন যাবৎ আম্মার অনুপস্থিতিতে স্কুলের ভাড়া এবং শিক্ষকদের বেতন দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কারণ অচিন পাখির কার্যক্রম চলত মায়ের গানের আয়ে। দেনা ধার করে চালাচ্ছি, অচিন পাখি ভালো নেই।"
অচিন পাখির সামনের কার্যক্রম কীভাবে চলবে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনিসুর রহমান বলেন, "আমরা ভেবেছিলাম আপা সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে, উনাকে নিয়ে আমরা ক্লাস করতে পারব। এই মৃত্যু আমাদের মেনে নিতে অনেক কষ্ট হবে। অচিন পাখি যেহেতু আপার একটা স্বপ্ন।
"আপার স্বপ্নকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য চেষ্টা এবং ইচ্ছে আমাদের আছে। আমরা যারা আছি শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী, গাজী আবদুল হাকিম ভাই মিলে চেষ্টা করব সামনে আমাদের কার্যক্রমগুলো এগিয়ে নেওয়ার জন্য। আর আপার এই প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আমরা আপাকে স্মরণ করব, আপার কাজগুলো বাঁচিয়ে রাখব।"

গেল মে মাসে গ্লিটজ টিম গিয়েছিল ‘অচিন পাখিতে’। সেদিন গ্লিটজকে এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে প্রতিষ্ঠান নিয়ে স্বপ্ন, উদ্দেশ্য এবং তার অনুপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার কথা বলেছিলেন ফরিদা পারভীন।
প্রতিষ্ঠানের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়া এবং নিজস্ব ভবন না থাকায় এ প্রতিষ্ঠান অনেকদিন ধরে ধুকছে।
আরও পড়ুন:
'খাঁচা ভেঙে অচিন পাখি হয়ে উড়ে গেলি': ফরিদা পারভীনের প্রয়াণে শিল্পীদের শোক
ভক্তরা কাঁদলেন, 'কাঁদল' আকাশ, বিদায় নিলেন ফরিদা পারভীন
তিনি বলেছিলেন, “যেহেতু আমি লালন সাঁইজির গান করি, লালন গানের চর্চা করি। লালন ফকিরের গানের সেই ধারাকে উত্তরসূরীদের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই এই প্রতিষ্ঠান। আমার গুরু মোকছেদ আলী সাঁইজির কাছে আমি লালন গান শিখেছি, সেই প্রেম ও শ্রদ্ধা থেকেই এই প্রতিষ্ঠান তৈরির ভাবনা এল।
“একদিন মারুফকে বললাম আমার একটা আর্জি তৈরি হয়েছে, তোমাদের নিয়ে একটা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করতে চাই। সেখানেই অচিন পাখি নামটা আসে।”

লালনের ভাবনায় এ সংগীত প্রতিষ্ঠানটির নাম রাখা হয়েছে জানিয়ে ফরিদা পারভীন বলেন, "লালন বলেছিলেন, ‘অচিন পাখি বাসে মনে, যার বাঁধন নাই ঘরে’। আমিও সেই অচিন অনুভবটিকে এই সংগীত একাডেমির মাধ্যমে জীবন্ত রাখতে চাই।"
কেবল লালনের গান নয়, সংগীতের প্রথম যে শর্ত ‘সরগম’, সেটি শেখানো হয় 'অচিন পাখি সংগীত একাডেমিতে।
এছাড়া শাস্ত্রীয় সংগীত, রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল সংগীত, ক্লাসিক্যাল গান গানও শেখানো হয়। এ তালিকায় আছে দেশের গান ও ছড়া গানও।
তবে অচিন পাখিতে ভর্তি হওয়ার সময় শিক্ষার্থীর একটি শর্ত জানিয়ে দেওয়া হয়, তাকে অবশ্যই লালনের গানের তালিম নিতে হবে।
গানের পাশাপাশি বাঁশি, তবলা, দোতারা, গিটারের মত বাদ্যযন্ত্রও শেখানো হয় একাডেমিতে। আটজন প্রশিক্ষক রয়েছে যারা নিয়মিত তালিম দিয়ে থাকেন।
৭১ বছর বয়সী ফরিদা পারভীন বেশ কিছু দিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। কিডনি সমস্যা ও ডায়াবেটিসসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।
গত ২ সেপ্টেম্বর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ফরিদা পারভীনকে। পরে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়; সেখান থেকে আর তাকে ফেরানো যায়নি।
নজরুল, আধুনিক ও দেশের গান গাইলেও লালন ফকিরের গানেই নিজেকে পুরোপুরি বিলিয়ে দিয়েছিলেন একুশে পদক পাওয়া ফরিদা পারভীন।
লালনের গান গেয়ে ফরিদা কেবল নিজেই জনপ্রিয় হননি, এই সংগীতকে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও পৌঁছে দিয়েছেন।
আরও পড়ুন:
'সত্য বল সুপথে চল' থেকে ফরিদা পারভীনের শুরু, এরপর কেবল অপার হয়ে বসে থাকা
বাবা-মায়ের কবরে শায়িত হলেন ফরিদা পারভীন