বলিউডে দীর্ঘতম চুম্বন দৃশ্য কি দেবিকা রানীরই?

১৯৩৩ সালে ‘কর্ম’ সিনেমায় দেবিকা রানী ও হিমাংশু রায়ের সেই চুম্বনের দৃশ্য বলিউডের কোনো সিনেমায় প্রথম চুম্বন, যা এখনও আলোচনা আসে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 14 Jan 2023, 07:05 AM
Updated : 14 Jan 2023, 07:05 AM

সুন্দরী রাজকুমারী যখন খানিকটা ঝুঁকে কোমায় থাকা রাজকুমারের ঠোঁটে চুমু খেয়ে তার চেতনা ফেরানোর চেষ্টা করছিলেন, তখনই করে ফেললেন সিনেমাটিক ইতিহাস।

১৯৩৩ সালে ‘কর্ম’ সিনেমায় বাস্তব জীবনের দম্পতি দেবিকা রানী ও হিমাংশু রায়ের সেই চুম্বনের দৃশ্য বলিউডের কোনো সিনেমায় প্রথম চুম্বন এবং একইসঙ্গে সব থেকে বেশি সময় ধরে চুম্বনের রেকর্ড হিসেবে লেখা হয়েছে দীর্ঘ সময়। আদতে এর কোনটিই সত্য নয়।

সেই সময় সংবাদ মাধ্যমে খবর ছাপা হয়েছিল, কর্ম সিনেমার ওই চুম্বন দৃশ্য ছিল চার মিনিটের। পর্দায় সেই দৃশ্য ভারতে অনেক মিথ বা গল্পের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে।

ট্যাবু ভেঙে এরপর বলিউডে অনেক চুম্বন দৃশ্য এসেছে। ববি সিনেমায় ঋষি কাপুর-ডিম্পল কাপাডিয়ার, সত্যম শিবম সুন্দরম সিনেমায় শশী কাপুর-জিনাত আমানের, দয়াবান সিনেমায় বিনোদ খান্না-মাধুরী দীক্ষিতের, রাজা-হিন্দুস্তানি সিনেমায় আমির খান-কারিশ্মা কাপুরের, হালের ধুম-২ সিনেমায় হৃত্বিক রোশান-ঐশ্বরিয়া রাইয়ের চুম্বন দৃশ্য ঝড়ও তুলেছে।

তবে ৯০ বছর আগের দেবিকা ও হিমাংশুর সেই দৃশ্য বলিউডে চুম্বনের পথিকৃৎ হিসেবে এখনও রয়েছে আলোচনায়। সেই দৃশ্যের ঠিকুজি অনুসন্ধান করেছে বিবিসি।

১৯৩৪ সালে ভারতের প্রথম পেশাদার ফিল্ম স্টুডিও বোম্বে টকিজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন হিমাংশু ও দেবিকা, যা ভারতের সবাক চলচ্চিত্রের প্রথম দশকের সিনেমায় আধিপত্য তৈরি করেছিল। সেই ধারা এখনও চলছে।

ভারতীয় সিনেমা নিয়ে সেরা বই হিসেবে গত বছর দেশটির প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া একটি বইয়ে সেই চুম্বন এবং হিমাংশু ও দেবিকা দম্পতির টালমাটাল জীবনের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

‘দ্য লংগেস্ট কিস: দ্য লাইফ অ্যান্ড টাইমস অব দেবিকা রানি’ নামের সেই বইয়ের লেখক কিশোয়ার দেশাই বলেন, “সিনেমাটি এমন সময়ে তৈরি করা হয়েছিল, যখন হিমাংশু রায় ও দেবিকা রানির সবেমাত্র বিয়ে হয়েছে, তারা তখন অনেক বেশি ভালোবাসায় আচ্ছন্ন ছিলেন; তাই স্ক্রিনে প্রেমোন্মত্ত সেই চুম্বন অবাক হওয়ার মতো কিছু ছিল না।”

তিনি জানান, ভারত যেহেতু তখন ব্রিটিশদের অধীনে ছিল এবং অনেক সিনেমাই পশ্চিমাদের দর্শক-শ্রোতার জন্য বানানো হয়েছিল, তাই ভারতীয় সিনেমায় তখন সেই দৃশ্য ‘অস্বাভাবিক কিছু ছিল না’। ১৯২০ ও ১৯৩০ এর দশকের শেষ দিকে অনেক সিনেমাতেই চুম্বনের দৃশ্য ছিল।

“সেই সময়ের প্রচুর সিনেমার মতোই কর্ম বিদেশি ভাবধারাপুষ্ট প্রাচ্যবাদে ডুবে ছিল,” বলেন কিশোয়ার দেশাই।

সিনেমাটিকে ‘ভালোবাসার নাটক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ৬৩ মিনিটের এ সিনেমার পরিচালক ছিলেন ব্রিটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা জেএল ফ্রিয়ার হান্ট। প্রচার করা হয়েছিল, সিনেমাটিতে ‘প্রকৃত রাজ প্রাসাদ এবং প্রাচ্যের জাঁকজমকপূর্ণ দৃশ্য’ রয়েছে।

ভারতীয় রাজবংশের আচার নিয়ে ইংরেজদের যে ধারণা ছিল, যেমন- বাঘ শিকার, কোবরা বা গোখরা সাপের সঙ্গম আর সাপুড়ের দৃশ্য তুলে ধরা হয় কর্ম সিনেমায়।

এতে সব থেকে দীর্ঘ যে চুম্বনের যে দৃশ্যের কথা বলা হচ্ছে, সেটি ছিল সিনেমার একেবারে শেষ দিকে; গোখরার ছোবলে অচেতন রাজপুত্রকে বাঁচাতে মরিয়া রাজকুমারী তাকে চুমু খেয়েছেন।

তবে কিশোয়ার দেশাই বলছেন, “সিনেমায় চার মিনিট ধরে চুম্বনের যে গল্প প্রচলিত রয়েছে, তা সত্যি নয়। আর এটি বলিউড সিনেমায় সব থেকে দীর্ঘ সময় ধরে চুম্বনের দৃশ্যও নয়।

“শুরুতে কেবল একটি চুম্বন ছিল না, ধারাবাহিক বা একের পর এক চুম্বন ছিল। আর যদি সময় হিসাব করেন, তা দুই মিনিট পার হবে না।”

তিনি বলেন, সেসময়ে চুম্বনের দৃশ্যটিই সিনেমাটির দর্শক আকর্ষণের মূল বিষয় ছিল না। অনেক পরে এটি জনপ্রিয় মিথ হয়ে উঠেছে, আর তা সম্ভবত সংবাদ মাধ্যমের কারণেই।

প্রেম-ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ পর্দায় কিংবা পর্দার বাইরে কয়েক দশক ধরেই ব্যাপক ট্যাবু ছিল ভারতে, যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিনেমায় এসবের নির্মাণ অনেক বেড়েছে।

২০০৭ সালে দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে হলিউড অভিনেতা রিচার্ড গিয়ার বলিউড অভিনেত্রী শিল্পা শেঠিকে চুমু খেলে বিক্ষোভ শুরু হয়। পোড়ানো হয় গিয়ারের কুশপুতুল। বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন, গিয়ার ভারতীয় সংস্কৃতির অবমাননা করেছেন।

ওই ঘটনার বছর দুই পর প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার জন্য দিল্লির এক দম্পতির বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ আনা হয়।

কয়েক বছর আগ পর্যন্তও শালীনতার ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে এমন বিষয়গুলোতে চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড কড়া নজর রাখছিল। সেই সময়ে সিনেমায় চুমু খাওয়ার দৃশ্যগুলো চিত্রায়িত করা হত ফুলের ঘষাঘষি কিংবা স্পর্শের মাধ্যমে। এছাড়া সিনেমায় হিরো-হিরোইনের আবেগ-অনুভূতি দেখানো হয়েছে কাপে দুধ কফির ফেনা ছলকে পড়ার দৃশ্যের মাধ্যমে।

তাই কর্ম আলোচনায় থাকছে এই কারণে যে এত বছর আগে বানানো সিনেমাটিতে সরাসরি চুম্বনের দৃশ্য রয়েছে। যদিও সিনেমাটি ছিল ফ্লপ।

‘দ্য লংগেস্ট কিস: দ্য লাইফ অ্যান্ড টাইমস অব দেবিকা রানি’ বইয়ের লেখক কিশোয়ার দেশাই বলছেন, সিনেমাটিতে অপেরা স্টাইলে অভিনেত্রী দেবিকা রানি যে গান করেছেন, তা সত্যিকার অর্থেই ভারতীয়দের জন্য ছিল না, তারা এটি খুব একটা পছন্দ করে না।

“বাণিজ্যিক লাভালাভ সিনেমাটি বানানোর উদ্দেশ্য ছিল না, বরং বোম্বে থেকে বিশ্ব মঞ্চের জন্য ইংরেজরা যে সিনেমা বানাতে পারে, সেটি দেখানোর জন্যই এ সিনেমা বানানো হয়েছিল।”

কিশোয়ার দেশাইয়ের ভাষ্য, হিমাংশু রায় সেসময় কেবলই ইউরোপে সফল হয়েছেন; তাকে উদীয়মান তারকা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু তিনি একজন চতুর ব্যবসায়ী ছিলেন এবং সেসময় বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই) একটি স্টুডিও স্থাপনের কথা ভাবছিলেন। ‘কর্ম’ এর মত একটি সিনেমা বানিয়ে তিনি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন যে, এমন সিনেমা বানাতে পারেন, যা হলিউডের চলচ্চিত্রের সমতুল্য হবে।

এটি হিমাংশুর জন্য প্রয়োজন ছিল, কারণ সেই সময়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা ব্রিটিশ বা ধনী পার্সি সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন, যারা তাদের বেশভূষা আর দৃষ্টিভঙ্গিতে ছিল পশ্চিমা ঘরানার। আর সেখানেই হিমাংশুকে সাহায্য করেছে দেবিকা রানির উপস্থিতি।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বোনের নাতনি দেবিকা রানি নয় বছর বয়স থেকেই ইংল্যান্ডের স্কুলে পড়াশোনা করেন। পশ্চিমা ছাঁচে বড় হন উদার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন এই অভিনেত্রী।

কিশোয়ার দেশাই তার বইয়ে লিখেছেন, কর্ম সিনেমাটি দুর্দান্তভাবে জায়গা করে নেয় লন্ডনের মার্বেল আর্চ থিয়েটারে। ব্রিটিশ রাজপরিবারের কিছু প্রখ্যাত ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। গুজব রয়েছে, রাজা পঞ্চম জর্জ ও কুইন মেরিও কর্ম সিনেমার শোতে উপস্থিত ছিলেন।

দেশাই জানান, চলচ্চিত্রটি প্রশংসনীয় রিভিউ পেয়েছিল, বিশেষ করে দেবিকা রানির জন্য। সমালোচকরা তার সৌন্দর্য আর বচনে মুগ্ধ হয়েছিলেন।

একটি সংবাদপত্র লিখেছিল, তার (দেবিকা রানি) চেয়ে প্রেমময় কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। আরেকটি সংবাদপত্র তার সুন্দর গড়ন, দীপ্তিময় চোখ ও সাবলীল চলনের ব্যাপক প্রশংসা করে।

কর্ম সিনেমার মাধ্যমে দেবিকা রানি প্রতিযোগিতায় সবাইকে ছাড়িয়ে যান। এর মাধ্যমে তিনি ‘ভারতের একমাত্র আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান তারকা’ বনে যান, যাকে হলিউড ও ইউরোপিয়ান সিনেমাও চাইছিল।

কিন্তু ভারতে প্রথম পেশাদার স্টুডিও স্থাপনে হিমাংশু রায়ের সঙ্গে তিনি মুম্বাইতে ফিরে আসেন এবং সেখানে কঠোর পরিশ্রমে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

তিনি এক ডজনেরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। কিংবদন্তি অভিনেতা অশোক কুমারের সঙ্গে পর্দায় একটি সফল জুটিও তৈরি করেছিলেন। ‘অচ্ছুত কন্যা’সহ বেশ কয়েকটি হিট সিনেমা উপহার দিয়েছেন। প্রতিভাবান আর সুন্দরী দেবিকা রানি ভক্তদের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। ‘ভারতীয় সিনেমার ফার্স্ট লেডি’ অ্যাখ্যা পেয়ে যান এই অভিনেত্রী।

কিন্তু শিগগিরই হিমাংশু রায়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের বন্ধন ছিঁড়তে শুরু করে।

লেখক কিশোয়ার দেশাই বলেন, “তিনি খুব কঠোর পরিশ্রম করছিলেন, তবে সেই তুলনায় কৃতিত্ব পাননি। হিমাংশুর সঙ্গে তার সম্পর্কও খারাপ হয়ে যায়, যখন জানতে পারেন যে হিমাংশু আরেকটি বিয়ে করেছিলেন এবং একটি মেয়েও রয়েছে।”

হিমাংশুর মৃত্যুর কয়েক বছর পর দেবিকা রানি রুশ চিত্রশিল্পী সেতোস্লাভ রোয়েরিচকে বিয়ে করেন। রোয়েরিচকে লেখা চিঠিতে দেবিকা রানি বর্ণনা করেছিলেন, তার প্রথম স্বামী হিমাংশু রায় তার সঙ্গে কতটা খারাপ আচরণ করেছেন। অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে বাধ্য করেছিলেন।

এক অনুষ্ঠানের ঘটনার বর্ণনায় দেবিকা রানি লিখেছিলেন, সিনেমার একটি স্ক্রিপ্ট দিয়েই তাকে বেদম মারধর করা হয়েছিল। মেঝেতে পড়ে গিয়ে রক্তাক্ত হওয়া অবধি মারধর চলছিল।

হিমাংশুর সঙ্গে দেবিকার সম্পর্কের ফাটল সবাই প্রত্যক্ষ করেছিলেন, যখন দেবিকা তার একজন সহঅভিনেতার সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিলেন।

কিশোয়ার দেশাই বলেন, এরপরও তাকে (দেবিকা রানি) স্বাগত জানানো হয়েছিল। কারণ তার বিকল্প ছিল না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে বোম্বে টকিজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কারণ প্রতিষ্ঠানটির সব জার্মান কর্মীদের ক্যাম্পে বন্দি করেছিল ভারতে ব্রিটিশ শাসকরা।

১৯৪০ সালে ব্যাপক মানসিক চাপে হিমাংশু রায়ের মৃত্যু হলে দেবিকা রানি প্রযোজক হিসেবে ওই স্টুডিওর হাল ধরেন। মধুবালা ও দিলীপ কুমারের মতো কিংবদন্তি অভিনেতাদের সুযোগ করে দেন এবং অনেক সুপারহিট চলচ্চিত্র উপহার দেন।

কিন্তু ১৯৪৫ সালে কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে সেতোস্লাভ রোয়েরিচকে বিয়ে করে হিমাচল প্রদেশে চলে যান। পরবর্তীকালে থিতু হন বেঙ্গালুরুতে। ১৯৯৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বেঙ্গালুরুতেই ছিলেন।

কিশোয়ার দেশাই বলেন, “রোয়েরিচের সঙ্গে বিয়ের পর দেবিকা রানি এমন জীবনই পেয়েছিলেন, যা তিনি প্রত্যাশা করেছিলেন।”

দেবিকা রানি বোম্বে টকিজ ছেড়ে যাওয়ার পর সেটি অবশ্য বেশিদিন টিকে ছিল না। ১৯৫৪ সালে সবকিছু গুটিয়ে নেওয়ার আগের বছরগুলোতে ধুঁকে ধুঁকে চলেছে, জানান দেশাই।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক