Published : 26 Jan 2026, 02:27 PM
বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে কিংবদন্তী শিল্পী রুনা লায়লার রেয়াজের ধরন নিয়ে কিছু অজানা কথা সামনে এসেছে। যা তুলে ধরেছেন তার স্বামী চিত্র অভিনেতা নায়ক আলমগীর।
পাশাপাশি রুনা লায়লার শিল্পীজীবনের অর্জন, সম্মান–ভালোবাসা নিয়েও কথা বলেছেন আলমগীর।
অভিনেতার কথায়, “বাংলাদেশ গর্ব করে বলতে পারে আমাদের একজন রুনা লায়লা আছে।”
মানুষের এই ভালোবাসা পাওয়া একজন শিল্পীর জীবনে এটি বড় প্রাপ্তির উদাহরণ বলেও মন্তব্য করেছেন আলমগীর।
আলমগীর বলেন, "তোমাকে নিয়ে অনেক অনেক বছর আগে শুনেছি যে ভারতীয় এক পত্রিকায় লেখা হয়েছিল যে, তোমরা রুনাকে আমাদেরকে দিয়ে দাও, আমরা ফারাক্কার পানি তোমাদেরকে দিয়ে দেব। তো এটা একজন শিল্পীর জীবনের বিরাট পাওয়া। অনেক বড় পাওয়া।"
একটি বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশনের একটি অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে গিয়েছিলেন রুনা লায়লা। সেখানে অনুষ্ঠানের মাঝে রুনা লায়লাকে নিয়ে এক ভিডিও বার্তায় এসব কথা বলেন আলমগীর।
তিনি বলেন, "রুনা লায়লা জীবনে অনেক সম্মান ও ভালোবাসা পেয়েছেন। সম্মান মানুষ পায়, জনগণই তা দেয়, তবে ভালোবাসা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।"
রুনা লায়লার রেয়াজের ধরন নিয়েও কথা বলেন আলমগীর। তিনি জানিয়েছেন, তানপুরা নিয়ে বসে দীর্ঘ সময় রেয়াজ করতে তিনি কখনও রুনা লায়লাকে দেখেননি। আধুনিক সময়ে যে যন্ত্র দিয়ে সুর ধরে রেখে গলা মেলানো হয়, সেটির সঙ্গেও তিনি কখনও রেয়াজ করেন না। তবে হাঁটতে হাঁটতে, ঘরের কাজ করতে করতে, কাপড় গোছাতে গোছাতে এমনকি বাথরুমেও রুনা লায়লাকে তান করতে দেখেন এই অভিনেতা।
আলমগীর বলেন,"বিষয়টি নিয়ে একদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম এই যে তুমি তো বসে কোনো রেয়াজ করো না এটা কি গান হচ্ছে? সেসময় রুনা বলেন,'আমার দরকার হল আমার গলাটাকে জায়গা মত রাখা। আমি তানগুলো করছি এতেই আমার রেয়াজ হয়ে যাচ্ছে। আর জীবনে এত রেয়াজ করেছি আর এতো শিখা শিখেছি বিভিন্ন ওস্তাদদের কাছে, সুরটা কিন্তু এখন আমার কানে।"

ওই অনুষ্ঠানে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন রুনা লায়লা নিজেও। স্বামী আলমগীরের এক বিশেষ গুণ নিয়েও কথা বলেছেন।
রুনা লায়লা বলেন, "আলমগীরের চুলের একটু অবসেশন আছে, সে সবসময় চুল ঠিক করতে থাকে। কোনো জরুরি বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে তাকে দেখা যাবে চুল ঠিক করছে, লিফটে উঠলেও চুল গোছাতে থাকবে।"
অনুষ্ঠানে নানা আলোচনার মধ্যে রুনা লায়লা স্মরণ করেছেন নব্বই দশকে একদিনে ১০টি করে তিন দিনে মোট ৩০টি গান গেয়ে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের কথাও।
সেই গল্প শুনিয়ে রুনা লায়লা বলেন, "আমরা আরম্ভ করেছিলাম সকাল ৯টায়, ৬টার মধ্যে শেষ হয়ে গেছে ১০টা গান। ট্র্যাক করা ছিল, একটার পর একটা, একটার পর একটা করে ৩০টা গান করলাম তিন দিনে।"
শৈশব আর ক্যারিয়ারের শুরুর সময়টা পাকিস্তানে কাটলেও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ফেরেন রুনা লায়লা। গানে গানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমাদৃত হলেও বাংলাদেশেই প্রাণ খুঁজে পেয়েছেন কিংবদন্তী এই শিল্পী।
১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সিলেটে জন্ম হয় জনপ্রিয় এই শিল্পীর। বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ এমদাদ আলী ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা এবং মা আমেনা লায়লা ছিলেন সংগীত শিল্পী। মামা সুবীর সেনও ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী।
বাবার বদলির চাকরির কারণে আড়াই বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে রাজশাহী থেকে পাকিস্তানের মুলতানে চলে গিয়েছিলেন। শৈশব কাটে পাকিস্তানের লাহোরে। সেখানেই উচ্চাঙ্গ সংগীতে দীক্ষা নেন ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খান ও আবদুল কাদের পিয়ারাংয়ের কাছে। গজলে দীক্ষা পান পণ্ডিত গোলাম কাদিরের (মেহেদি হাসানের ভাই) কাছে।

রুনা সিনেমায় প্লেব্যাক শুরু করেন কিশোরী বয়স থেকেই। উর্দু গানের বড় বড় শিল্পীদের সঙ্গে গাইতেন। 'জুগনু' সিনেমা দিয়ে ১৯৬৫ সালে তার প্লেব্যাক ক্যারিয়ার শুরু হয়। আর বাংলা সিনেমাতে গান গাওয়া শুরু করেন সুবল দাসের সুরে 'স্বরলিপি' ছবিতে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রায় এক হাজার গান রেকর্ড হয়ে যায় তার।
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে আসেন রুনা। সে সময় ভারতে বড় তিনটি কনসার্টে গান পরিবেশন করে সে দেশের দর্শকদের কাছেও সমাদৃত হন। বিশেষ করে ‘দমাদম মাস্ত কলন্দার’ গানটির জন্য ভারতে আলাদা পরিচিতি পান তিনি। ভারতের দুই কিংবদন্তী সংগীত শিল্পী লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলের সঙ্গেও সখ্য হয়।
আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা নারী কণ্ঠশিল্পীর পুরস্কার পেয়েছেন রুনা লায়লা। বাংলাদেশ সরকার এই শিল্পীকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক স্বাধীনতা পুরস্কারেও ভূষিত করেছে। এছাড়া ভারতে পেয়েছেন সায়গল পুরস্কার। পাকিস্তান থেকে তার ঝুলিতে এসেছে নিগার, ক্রিটিক্স, গ্র্যাজুয়েটস পুরস্কার।
কেবল গান নয়, চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘শিল্পী’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করেছেন।
বাংলা ছাড়াও উর্দু, হিন্দি পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি, পশতু, বেলুচি, আরবি, পারসিয়ান, মালয়, নেপালি, জাপানি, ইতালীয়, স্প্যানিশ, ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় গান করেছেন। রুনা লায়লা হয়ে ওঠেন কিংবদন্তি শিল্পী, উপমহাদেশীয় সংগীত জগতের এক বিস্ময়কর নাম।