Published : 26 Jun 2026, 09:14 PM
গান, কবিতা আর স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে ভাষা সংগ্রামী, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক কামাল লোহানীর ৯২তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।
এ উপলক্ষে শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনের কমরেড মনিসিংহ-ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্ট মিলনায়তনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের নেতৃবৃন্দ কামাল লোহানীর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং প্রদীপ প্রজ্বালন করেন।
এরপর উদীচী কেন্দ্রীয় সংগীত বিভাগের শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে ‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো’ গানটি পরিবেশন করেন।
সাংস্কৃতিক পর্বে একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন উদীচীর কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য শিখা সেন গুপ্তা ও ঢাকা মহানগর সংসদের আবৃত্তি সম্পাদক সুমিত পাল। এছাড়া একক সংগীত পরিবেশন করেন কেন্দ্রীয় সংগীত বিভাগের শিল্পী বিজয় বণিক।
উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি শিবাণী ভট্টাচার্য্যের সভাপতিত্বে আলোচনা পর্বে বক্তারা কামাল লোহানীর জীবন, আদর্শ ও দেশের প্রগতিশীল আন্দোলনে তার ভূমিকা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সংগঠন বিষয়ক সম্পাদক শেখ আনিসুর রহমান।
উদীচীর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বলেন, “কামাল লোহানী তার দীর্ঘ জীবনে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে দেশের সব প্রগতিশীল আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক সংবাদটি তিনি নিজেই লিখে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পাঠ করেছিলেন।”

তিনি বলেন, "২০১২ সালে উদীচীর সভাপতি হওয়ার পর কামাল লোহানী সারাদেশে সংগঠনকে বিস্তৃত করতে অনন্য ভূমিকা রাখেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনেও তার নেপথ্য অবদান ছিল চিরস্মরণীয়।"
সভাপতির বক্তব্যে শিবাণী ভট্টাচার্য্য বলেন, “কামাল লোহানী আমৃত্যু সংস্কৃতির সঙ্গে এবং সংস্কৃতির সংগ্রামে সোচ্চার ছিলেন। ছায়ানট ও ক্রান্তি–দুই সংগঠনেই তিনি নৃত্য, আবৃত্তি, অভিনয় ও সংগীতে যুক্ত ছিলেন।”
অন্যদের মধ্যে যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল কবির, উদীচীর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক বদিউর রহমানের কন্যা সুপা সাদিয়া, উদীচীর ঢাকা মহানগর সংসদের সাধারণ সম্পাদক কংকন নাগ, কেন্দ্রীয় সদস্য নিবাস দে, সহ-সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ ঘোষ এবং সহ-সভাপতি প্রবীর সরদার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
সবশেষে উদীচীর শিল্পীদের সমবেত কণ্ঠে ‘আজি শুভদিনে পিতার ভবনে অমৃত সদনে চলো যাই’ গানটি পরিবেশনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

কামাল লোহানীর আনুষ্ঠানিক নাম আবু নাইম মোহা. মোস্তফা কামাল খান লোহানী। ১৯৩৪ সালের ২৬ জুন সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া গ্রামের খান মনতলা গ্রামে তার জন্ম।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটে। এরপর সাংবাদিকতা, সংস্কৃতি ও গণআন্দোলনের সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন।
সাংবাদিক হিসেবে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় দায়িত্ব পালন করলেও তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে ওঠে একজন সংস্কৃতি সংগ্রামী হিসেবে। পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের ওপর যে আঘাত নেমে এসেছিল, তার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অন্যতম অগ্রসেনানী।
১৯৬২ সালে কামাল লোহানী ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পরে ১৯৬৭ সালে রাজনৈতিক আদর্শের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ক্রান্তি’ গড়ে তোলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক ও বার্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলার কাজে যুক্ত ছিলেন। স্বাধীনতার পর তার কণ্ঠেই দেশবাসী প্রথম বিজয়ের সংবাদ শুনেছিল।
কামাল লোহানী চার বছর বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।
কর্মজীবনে কামাল লোহানী দৈনিক মিল্লাত দিয়ে সাংবাদিকতার শুরু করেন। এরপর আজাদ, সংবাদ, পূর্বদেশ, দৈনিক বার্তায় গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। সাংবাদিক ইউনিয়নে দুই দফা যুগ্ম সম্পাদক ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতেও দুই বার মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করা এই সাংস্কৃতিক সংগঠক ২০১৫ সালে একুশে পদক পান।
মহামারীর মধ্যে ২০২০ সালের ২০ জুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান কামাল লোহানী, ৮৫ বছর বয়সে থেমে যায় তার সংগ্রামী জীবনের যাত্রা।