Published : 29 Dec 2025, 11:06 AM
আরেকটি কঠিন বছর পার করল দেশীয় চলচ্চিত্র। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দর্শক সংকট ও প্রেক্ষাগৃহের দুরাবস্থার চাপ নিয়ে কেটে গেল বারোটি মাস।
বিদায়ী বছরে প্রায় অর্ধশত সিনেমা মুক্তি পেলেও ব্যবসায়িক সাফল্য ঘুরপাক খেয়েছে মূলত দুই ঈদকেন্দ্রিক কয়েকটি সিনেমায়। বছরজুড়ে তারকাবহুল উপস্থিতি, প্রশংসিত কিছু নির্মাণ ও নতুন মুখের আগমন থাকলেও সামগ্রিকভাবে হল মালিক, প্রযোজক ও শিল্পীদের বাস্তবতায় শোনা গেছে হতাশার গল্পই।
চলচ্চিত্র প্রদর্শক, প্রযোজক ও পরিবেশকদের তথ্য, ৪৭টির মত সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে বিদায়ী বছরে, যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম। তবে এত সিনেমার ভিড়েও সারাবছর দর্শক টানতে পেরেছে মূলত দুই ঈদকে কেন্দ্র করে মুক্তি পাওয়া চার-পাঁচটি সিনেমা। এর বাইরে অধিকাংশ সিনেমাই দর্শক খরায় ভুগেছে।
অন্যান্য বছর ভারতীয় সিনেমা আমদানি করে কিছুটা ব্যবসা হয় হল মালিকদের। এ বছর ভারতীয় সিনেমা আমদানি না এলেও সিনেপ্লেক্সগুলোতে চলেছে হলিউড ও নেপালি সিনেমা।
দেশের বড় মাল্টিপ্লেক্স স্টার সিনেপ্লেক্স দর্শক ও টিকেট বিক্রির দিক থেকে পাঁচটি সিনেমাকে ব্যবসাসফল হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে উৎসবের বাইরেও মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রিকশা গার্ল’, ‘বলী’, ‘সাবা’, ‘বাড়ির নাম শাহানা’, ‘ফেরেশতে’ ও ‘দেলুপি’ নির্মাণশৈলী, গল্প, অভিনয় ও অভিনয়শিল্পীদের কারণে আলাদা করে সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সিনেমাগুলো হাউজফুল না হলেও কিছুটা দর্শক ধরে রেখেছিল।
স্টার সিনেপ্লেক্সের মিডিয়া ও মার্কেটিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মেসবাহউদ্দিন আহমেদ গ্লিটজকে বলেন, “দর্শক চাহিদা, গ্রহণযোগ্যতা ও আয়ের দিক বিবেচনায় আমরা পাঁচটি সিনেমাকে এগিয়ে রেখেছি। সিনেমাগুলো হলো ‘বরবাদ’, ‘তাণ্ডব’, ‘উৎসব’, ‘দাগী’ ও ‘জংলি’।”
এর বাইরে আরও কয়েকটি সিনেমা প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ব্যবসা করেছে।
“‘দেলুপি’ সিনেমা প্রায় চার সপ্তাহ চলেছে; ‘সাবা’ আমরা দ্বিতীয়বারের মত হলে তুলেছি। এছাড়া ‘বাড়ির নাম শাহানা’ ও ‘ফেরেশতে’ সিনেমাও আলোচনায় ছিল,” বলেন মেসবাহ।
বিদায়ী বছরে ব্যবসার অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কয়েক বছর ধরেই চলচ্চিত্রের ব্যবসা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। আমরা মূলত ঈদকেন্দ্রিক ব্যবসা করি। বছরের তিন থেকে চার মাস, অর্থাৎ ঈদের সময়টুকুতেই ব্যবসা হয়। সারাবছর মন্দা থাকে, কারণ দর্শকের চাহিদা অনুযায়ী কনটেন্ট আমরা পাই না।
“ভালো কনটেন্ট পেলে দর্শক সিনেমা হলে আসে, এর প্রমাণ বারবার মিলেছে। ঈদের সময় হলভর্তি দর্শক হয়। কিন্তু সারাবছর সেই মানের কনটেন্ট দিতে না পারায় দর্শক হলে আসে না। আগামী বছরের নতুন সিনেমার প্রচারেও দেখা যাচ্ছে, সবাই ঈদকে ঘিরেই প্রস্তুতি নিচ্ছে।”
সব সিনেমা একসঙ্গে ঈদে মুক্তি পেলে ঝুঁকি তৈরি হয় বলেও মনে করেন তিনি।
“সব সিনেমাকে আমরা সমান সংখ্যক শো দিতে পারি না। সিনেমাগুলো যদি বছরজুড়ে সময় ভাগ করে মুক্তি পায়, তাহলে হলের অবস্থা ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমার মনে হয়।”

বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় আটটি সিনেমা। রোজার মাসে প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ থাকায় মার্চে কোনো সিনেমা মুক্তি দেওয়া হয়নি। এপ্রিলে রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে মুক্তি পায় ছয়টি সিনেমা। ঈদের পর মে মাসে প্রেক্ষাগৃহে আসে ‘জয়া আর শারমিন’ ও ‘আন্তঃনগর’- এই দুটি সিনেমা।
জুনে কোরবানির ঈদ উপলক্ষে মুক্তি পায় আরও ছয়টি সিনেমা। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে মোট ১২টি সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া হয়। অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে মুক্তি পায় ১১টি সিনেমা। ‘খিলাড়ি’ ও ‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’ সিনেমা মুক্তির মধ্য শেষ হয় বছর।
বছর জুড়ে মুক্তিপ্রাপ্ত এসব সিনেমার অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন জয়া আহসান, শাকিব খান, শবনম বুবলী, শরিফুল রাজ, সিয়াম আহমেদ, আরিফিন শুভ, পূজা চেরী, আফরান নিশো, নুসরাত ফারিয়া, রাফিয়া রশিদ মিথিলা, তমা মির্জা, আজমেরী হক বাঁধনসহ অনেকেই।
ছোটপর্দার অভিনয়শিল্পীদেরও একটা বড় অংশকে দেখা গেছে সিনেমায়। এ তালিকায় ছিলেন সাবিলা নূর, তাসনিয়া ফারিণ, এফ এস নাঈম, আফসানা মিমি, জাহিদ হাসান, চঞ্চল চৌধুরী, মোশাররফ করিম, মেহজাবীন চৌধুরীসহ অনেকে।
বছরজুড়ে মুক্তি পাওয়া সিনেমাগুলোতে তারকাবহুল উপস্থিতি থাকলেও সেই উপস্থিতি কি প্রেক্ষাগৃহে স্বস্তি ফেরাতে পেরেছে- এমন প্রশ্নে চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জ্বল বলেন, “আমাদের সিনেমা হল মালিকদের কপাল খুবই খারাপ। বছর পার হলেও সুদিন আর ফিরে আসেনি। জয়া আহসান থেকে শাকিব খান, আরিফিন শুভ, আফরান নিশো সবারই সিনেমা এসেছে এই বছর। তার মধ্যে যে চার-পাঁচটি সিনেমা কিছুটা ব্যবসা করেছে, সেগুলোও মূলত দুই ঈদকেন্দ্রিক।
“সারা বছর ভালো কনটেন্ট না থাকায় নিয়মিত ব্যবসা করা সম্ভব হয়নি। গত বছরের তুলনায় চলতি (বিদায়ী) বছর পরিস্থিতি আরও খারাপ গেছে।”
বছরজুড়ে সংকটের কারণ তুলে ধরে উজ্জ্বল বলেন, “আন্দোলন-সংগ্রাম, সরকার পরিবর্তন, মন্ত্রণালয়ের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের অভাব এবং সিনেমা আমদানি বন্ধ থাকার মত বিষয়গুলো একসঙ্গে প্রভাব ফেলেছে। সব মিলিয়ে সিনেমা হল মালিকদের জন্য বছরটি মোটেও ভালো কাটেনি।”
প্রায় অর্ধশতাধিক সিনেমা মুক্তি পেলেও পরিচালকদের দৃষ্টিতে বছরটি খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না।
পরিচালক সমিতির সভাপতি শাহীন সুমন বলেন, “বাংলা চলচ্চিত্র শুধু এ বছর নয়, গত কয়েক বছর ধরেই প্রকৃত অর্থে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। একই সংকট ও স্থবিরতার মধ্য দিয়েই সময় কাটছে, উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। আগের বছরগুলোর মত এবারও বিক্ষিপ্তভাবে দুই-চারটি সিনেমা কিছুটা ব্যবসা করেছে, তবে সামগ্রিক চিত্র বদলায়নি।”

তার ভাষ্য, চলচ্চিত্রের সংকট বহুমাত্রিক। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুদৃষ্টি না থাকলে এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। পর্যাপ্ত সিনেমা হলের অভাব, বড় অঙ্কের বিনিয়োগে প্রযোজকদের অনীহা- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল।
“দেশে সিনেমা হল নেই, প্রযোজকরা লগ্নি করতে ভয় পায়, কারণ একটা ভালো সিনেমা করতে গেলে এখন কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হয়। একটা-দুটা সিনেপ্লেক্স থেকে সেই টাকা তুলে আনা সম্ভব না। সব মিলিয়ে বাণিজ্যিক সিনেমা ও সিনেমা হল সংস্কারে যদি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থাকে তাহলে অবস্থা পরিবর্তনের দিকে যাবে।”
অনেকটা একই মত প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির সাবেক নেতা খোরশেদ আলম খসরুর।
গ্লিটজে তিনি বলেন, “সংখ্যার হিসাবে সিনেমা মুক্তি পেলেও বিনিয়োগের দিক থেকে বছরটি ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। গেল বছরের অগাস্ট থেকেই পরিবেশটা কিছুটা থমথমে। অল্প বাজেটের সিনেমাগুলো কিন্তু ভালো ব্যবসা করেছে, তেমন ‘বরবাদের’ মত হিট সিনেমা পুরো লগ্নি তুলতে পারেনি শুধু ই-টিকেটং, বক্স অফিস বা সিনেমা হলের সঠিক অবকাঠামো না থাকায়।”
তিনিও মনে করেন, প্রযোজকদের ঝুঁকি কমাতে হলে সিনেমা হল আধুনিকায়ন, প্রদর্শনব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে রাষ্ট্রীয় সহায়তা জরুরি। এসব উদ্যোগ না নিলে চলচ্চিত্রে টেকসই বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনা কঠিনই থেকে যাবে।
দেশান্তরী অনেক শিল্পী
চলচ্চিত্র শিল্পের চলমান সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্পীদের জীবনেও। গত এক বছরে বড় পরিসরে দেশের বাইরে পাড়ি জমিয়েছেন চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অঙ্গনের একাধিক পরিচিত মুখ।
চলচ্চিত্রশিল্পীদের মধ্যে অভিনেতা জায়েদ খান, মাহিয়া মাহি, সাইমন সাদিক, অমিত হাসান, মামনুন হাসান ইমন, আলেকজান্ডার বো, বাপ্পী চৌধুরী ও আমিন খানসহ অনেকেই দেশ ছেড়েছেন।

ছোটপর্দার অভিনয়শিল্পীদের মধ্যেও বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তাদের মধ্যে আছেন সুবর্ণা মুস্তফা, হৃদি হক, লিটু আনাম, সাজু খাদেম, উর্মিলা শ্রাবন্তী কর, সোনিয়া হোসেন এবং নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী।
এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে বিতর্কের মুখে পড়ে পর্দা থেকে দূরে রয়েছেন রিয়াদ, ফেরদৌস, অরুণা বিশ্বাস, নিপুণ আক্তার, রোকেয়া প্রাচী, জ্যোতিকা জ্যোতি, সোহানা সাবা, তানভীন সুইটি ও তারিন জাহানসহ আরও অনেকে।
চলচ্চিত্র শিল্পের এই ভগ্নদশার কারণেই শিল্পীরা দেশ ছাড়ছেন বলে মনে করেন চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিশা সওদাগর।
তিনি বলেন, “এখন সত্যি বলতে কোনো কাজ নেই। দেশের বর্তমান যে পরিস্থিতি, পর্যাপ্ত কাজ হচ্ছে না। একজন শিল্পীর জীবন পরিচালনার জন্য যে পরিমাণ কাজ দরকার, তা কেউ পাচ্ছে না।
“দেশের বাইরে গেলে অন্তত কোনো একটা কাজ করে জীবন চালানো যায়। কারণ শিল্পীর জীবন শুধু পর্দার ঝলকানিতে সীমাবদ্ধ নয়, তাদেরও পরিবার চালানোর দায় রয়েছে।”
কাজ থাকলে অনেকেই দেশ ছাড়তেন না বলেও মনে করেন এই অভিনয়শিল্পী।