Published : 10 Feb 2026, 01:58 PM
‘সাহসী মানুষ চাই’ কবিতায় কবি মোহন রায়হান লিখেছিলেন- “বোঝে না সংস্কৃতি আমাদের অশিক্ষিত নেতা, বরং নির্বাচন ভালো বোঝে”। মোহন রায়হান এখন জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে আছেন।
এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংস্কৃতিবিরোধী শক্তির জয় হলে হাজার বছরের বাংলা সংস্কৃতির চর্চা বাধার মুখে পড়বে বলে তিনি ‘আতঙ্কিত’।
তবে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনি ইশহেতারে সংস্কৃতিচর্চাকে ‘বাধাগ্রস্ত’ নয়, বরং এগিয়ে নেওয়ার জন্য নানা রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বাংলা সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তুলে ধরার প্রতিশ্রুতিও আছে তাদের।
এসব প্রতিশ্রুতিতে সন্তুষ্ট হতে পারছে না সংস্কৃতিকর্মীরা। তারা ব্যালটেই ‘সাম্প্রদায়িকতা’, ‘দুর্নীতি’, ‘লুটপাটতন্ত্র, ‘মব-সন্ত্রাস’, ‘নারীবিদ্বেষীদের’ রুখে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
কবি মোহন রায়হান ‘সাহসী মানুষ চাই’ কবিতাটি লিখেছিলেন অনেক বছর আগে। তবে কবিতাটি এখনো প্রাসঙ্গিক বলেই মনে করেন তিনি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে মোহন রায়হান বলেন, “আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর শিল্প-সংস্কৃতি সম্বন্ধে গভীর উপলব্ধি নাই। আবার শিল্প-সংস্কৃতিকে বাদ দেওয়ার চিন্তাও করতে পারে না। কারণ এই শিল্প-সংস্কৃতি হাজার বছর ধরে বহমান। এজন্য তারা নির্বাচনি ইশতেহারে সংস্কৃতি সম্বন্ধে কমবেশি বলেছে।”
সংস্কৃতিকর্মীদের সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি আশঙ্কা করছি, যারা হাজার বছরের বাংলা সংস্কৃতির বিরোধী, তারা যদি ক্ষমতায় আসে- তাহলে তো আমরা বাংলা সংস্কৃতিই চর্চা করতে পারবো না। এটা নিয়ে আমি আতঙ্কিত।”

রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনি ইশতেহারে শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে গভীর কোনো পরিকল্পনা জানাতে ‘ব্যর্থ’ হয়েছে বলে মনে করেন অভিনয় শিল্পী সংঘের সভাপতি আজাদ আবুল কালাম। এজন্য তিনি খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছেন না বলে জানান।
আজাদ আবুল কালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এবং রাষ্ট্রের কর্তাদের মধ্যে শিল্প-সংস্কৃতিচর্চা নিয়ে একটা উদাসীনতা বা উপেক্ষা রয়েছে। এবারও দলগুলো যে নির্বাচনি ইশতেহার দিয়েছে, তাতে শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে আশাবাদী হওয়ার মতো কিছু পাইনি।”
জুলাই গণঅভ্যুথানের পর সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ‘শিল্প-সংস্কৃতি’। মব আতঙ্কে অনেক জায়গায় নাটক, সিনেমা, গানের অনুষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। মাজারে হামলা হয়েছে। হামলা চালিয়ে লুটপাট করার পাশাপাশি আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে ছায়ানট ও উদীচীর কার্যালয়ে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে তা কমে আসবে বলে মনে করেন আজাদ আবুল কালাম।

তিনি বলেন, “মব-সন্ত্রাসের যে আস্ফালন, তা হয়তো নির্বাচিত সরকার এলে কমবে। কিন্তু সংস্কৃতি নিয়ে যে প্রত্যাশার জায়গা, তা পূরণ হওয়ার লক্ষণ দেখছি না। কারণ আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে গভীর উপলব্ধিটাই নাই।”
কী আছে ইশতেহারে?
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধ করার কথা ইশতেহারে বলেছে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। তারা অনৈতিক আকাশ-সংস্কৃতি ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
একই সঙ্গে জাতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ সঙ্গীত, নৃত্যকলা, নাটক, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রসহ সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখাকে আরও সমৃদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বহির্বিশ্বের শুভ ও কল্যাণময় উপাদানগুলো জাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সমন্বয়ের কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করেছে।
বিএনপির ইশতেহারে জাতীয় ভাবধারাপন্থী ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় ভাবধারার পরিপন্থী অপসংস্কৃতির চর্চাকে নিরুৎসাহিত করা হবে বলেও জানানো হয়।
বিএনপি বলছে, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশে সব ধরনের বাধা অপসারণ এবং সংস্কৃতির মাধ্যমে স্বাধীন চিন্তা ও মতাদর্শের সুষ্ঠু প্রতিফলন নিশ্চিত করা হবে। সুস্থ সংস্কৃতি ও বিনোদন চর্চার পরিবেশ গঠনের লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির প্রতিশ্রুতিও রয়েছে ইশতেহারে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে সংস্কৃতিচর্চা ও সৃজনশীল বিনোদনের ক্ষেত্র বিস্তারে এই উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এছাড়া জাতীয় সংস্কৃতির প্রধান প্রধান ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় পদক প্রদানের রীতি আরো সম্প্রসারিত করা এবং শিশু-কিশোরদের বিনোদন ও বিকাশে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস শো’ চালুর কথাও আছে বিএনপির ইশতেহারে।
জামায়াতে ইসলামী ইশতেহারে বলা হয়েছে, সাংস্কৃতিক নীতি প্রণয়ন, দেশীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি বিনিময় ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক বোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক গবেষকদের নিয়ে একটি জাতীয় সাংস্কৃতিক কমিশন গঠন করা হবে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ২১টি দপ্তর বা সংস্থার মান উন্নয়ন, যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং গতিশীল করার ক্ষেত্রে একটি বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
জামায়াত বলছে, দেশের জনগণের বোধ-বিশ্বাস ও আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা হবে। অশ্লীলতা পরিহার এবং যে কোনো ধর্মের প্রতি অবমাননকর উপস্থাপনা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হবে। ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর আলোকে বিভিন্ন ধরণের চলচ্চিত্র নির্মাণের যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক দিবসগুলো পালনের ব্যবস্থা করা হবে। প্রবাসী নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে উদ্ধুদ্ধকরণ এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের শিল্প-সংস্কৃতি তুলে ধরা হবে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হবে। সাহিত্যিক ও শিল্পীদের অবদানের ভিত্তিতে সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় পেনশন ব্যবস্থা চালু করা হবে। শিল্পীকল্যাণ তহবিলের বাজেট বৃদ্ধি করা হবে।
বাম-প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোর নতুন জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ ইশতেহারে বলেছে- সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক চেতনা, মতপ্রকাশ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর সব বাধা প্রত্যাহার করে শিল্পী, লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের হয়রানি ও সেন্সরশিপ বন্ধ করবে তারা।

সাহিত্য, নাটক, সংগীত, চলচ্চিত্র ও লোকজ সংস্কৃতিতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও প্রগতিশীল মূল্যবোধ বিকাশে সাংস্কৃতিক নীতি প্রণয়ন, ইতিহাস বিকৃতি ও সাম্প্রদায়িক অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে সুস্থ্য ও প্রগতিমুখী সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরদার করার কথা আছে তাদের ইশতেহারে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, বর্ষবরণ ও নবান্ন উৎসব উন্মুক্ত স্থানে করা হবে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে উদযাপন করা হবে। এছাড়া এবি পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও গণসংহতি আন্দেলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে তাদের ভাবনার কথা বলেছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ইশতেহারে বলেছে, নাগরিকরা তাদের নিজ নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবেন। এছাড়া, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ও ভাষা আন্দোলন দিবসসহ সমস্ত জাতীয় দিবস যথাযথ মর্যাদা এবং সর্বজনীন অংশগ্রহণের মাধ্যমে পালন করা হবে।
ব্যালটেই জবাব দেওয়ার আহ্বান সংস্কৃতিকর্মীদের
গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য এক বিবৃতিতে বলেছে, “সাম্প্রদায়িকতা, দুর্নীতি ও লুটপাটতন্ত্রের বিরুদ্ধে আপসহীন, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ এবং ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ ও শ্রেণি নির্বিশেষে সকল প্রকার বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াকু- দেশপ্রেমিক, সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাই।”
এই নির্বাচন ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে উল্লেখ করে তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, “এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষায় সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার বাস্তবায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ।”
নারীবিদ্বেষী, মব সন্ত্রাসের হোতা ও ধর্মব্যবসায়ী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীকে পরাজিত করার সুস্পষ্ট আহ্বান জানায় তারা।

বিবৃতিতে সই করেন গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান লালটু, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, প্রগতি লেখক সংঘের কোষাধ্যক্ষ দীনবন্ধু দাশ, গণসংস্কৃতি কেন্দ্রের সমন্বয়ক জাকির হোসেন, সমাজ অনুশীলন কেন্দ্রের সমন্বয়ক বিমল কান্তি দাশ, সংগঠক রঘু অভিজিৎ রায়, বাংলাদেশ থিয়েটারের দলপ্রধান খন্দকার শাহ আলম, সমাজচিন্তা ফোরামের আহবায়ক কামাল হোসেন বাদল, বাংলাদেশ মাইম এসোসিয়েশনের সভাপতি ম. আবু হারুন টিটো, বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চের সম্পাদক ইনজামাম, সাংজোগাড়ের সাধারণ সম্পাদক অংকন চাকমা, উদীচীর সহ সাধারণ সম্পাদক ইকবালুল হক খান, বিবর্তনের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিরুন নুজহাত মণীষা প্রমুখ।
নির্বাচনে সাম্প্রদায়িকতা, দুর্নীতি, লুটপাটতন্ত্র, কালো টাকা ও পেশিশক্তির দৌরাত্ম্য রুখে দেয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর একাংশের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম এবং সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে।
অন্যদিকে উদীচীর অপর অংশের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন পৃথক বিবৃতিতে বলেছেন, “নির্বাচন যেন দেশের সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশে সম্পন্ন হয় সে জন্য নির্বাচন কমিশন, সরকার ও প্রশাসনের সর্বাত্মক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কালো টাকা, পেশিশক্তি ও প্রশাসনিক কারসাজি বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।”