Published : 04 Sep 2025, 12:14 PM
বাংলাদেশের সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনকে বুধবার রাতে যখন ফোন করা হল; তখন ১২টা বাজতে এক ঘণ্টা বাকি।
জন্মদিনের আগাম শুভেচ্ছা জানাতেই তিনি বললেন, “আমি তো জন্মদিন উদযাপন করি না। তবুও ধন্যবাদ।”
সাবিনা ইয়াসমিনের জন্ম ১৯৫৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর; ঢাকায়। বৃহস্পতিবার ৭১ বছর পূর্ণ করলেন এই শিল্পী।
পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারে দশ হাজারের বেশি গান তিনি কণ্ঠে তুলেছেন; তার কণ্ঠ জায়গা করে নিয়েছে কোটি মানুষের হৃদয়ে। এমন জনপ্রিয় শিল্পীর জন্মদিন কেন অনাড়ম্বর?
সাবিনা ইয়াসমিন গ্লিটজকে বললেন, “আমি বিগত কয়েক বছর ধরেই জন্মদিন উদযাপন করি না। কোনো আয়োজনও করি না। আগেও আমি নিজ থেকে খুব একটা জন্মদিন উদযাপন করতাম না।
“আর গত কয়েক বছর ধরে তো এদিনটা আসলেই আমার মন খুব খারাপ হয়ে যায়। আমার খুব কাছের কত মানুষই তো পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। তাদের কথা মনে পড়ে। নিজের শরীরটাও ভালো থাকে না।”

জন্মদিনে সাবিনা ইয়াসমিন মন খারাপ করে থাকতে চাইলেও ভক্তকুল সেই সুযোগ তাকে দিতে চান না। নানাভাবেই উদযাপিত হয় সাবিনা ইয়াসমিনের জন্মদিন। ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষিরা তাকে শুভেচ্ছাও জানান।
এবারের জন্মদিন ঘিরে সাবিনা ইয়াসমিনের দীর্ঘ সংগীতযাত্রা, সংগ্রাম, সাফল্য এবং স্মৃতিকথা জানাতে নির্মাণ করা হয়েছে বিশেষ ডকুফিল্ম ‘জুঁই ফুল: সাবিনা ইয়াসমীন’।
ডকুফিল্মটি তৈরি করেছেন চ্যানেল আইয়ের বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ। সাবিনা ইয়াসমিনের জন্মদিন ঘিরে প্রচার হবে তথ্যচিত্রটি।
চ্যানেল আই জানিয়েছে, শুক্রবার দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে চ্যানেল আইয়ে ‘জুঁই ফুল: সাবিনা ইয়াসমিন’ প্রচার হবে।
এছাড়া শিল্পকলা একাডেমিতে অগামী শনিবার তাকে ঘিরে একটি অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে।
গ্লিটজের মাধ্যমে জন্মদিনে অগণিত ভক্তদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন।
তিনি বলেন, “আমি যে এত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। এমন সৌভাগ্য তো সবার হয় না। এজন্য আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। সবাই আমাকে শুভেচ্ছা জানান, এজন্য আমি সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সবার জন্য অনেক দোয়া থাকল, সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।”

সাবিনার বর্ণাঢ্যজীবন
মাত্র সাত বছর বয়সে প্রথমবার স্টেজে গান করেন সাবিনা; ১৯৬২ সালে এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে প্রথম গান করেন।
১৯৬৭ সালে প্রথম প্লেব্যাক করেন আমজাদ হোসেন ও নুরুল হক বাচ্চু পরিচালিত ‘আগুন নিয়ে খেলা’ সিনেমায়।
এরপর আর ডি বর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সত্য সাহা, সুবল দাস, আলম খান, বাপ্পি লাহিড়ী, আলী হোসেন, খন্দকার নুরুল আলম, আলাউদ্দিন আলী, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মত সুরকারদের সুরে অসংখ্য চলচ্চিত্রের গান কণ্ঠে তুলেছেন তিনি।
সহশিল্পী হিসেবে কুমার শানু, আশা ভোঁসলে, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মত শিল্পীকে পেয়েছেন সাবিনা।
গীতিকার নয়ীম গহরের লেখা ও সুরকার আজাদ রহমানের সুরে সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া দেশাত্মবোধক গান ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’ একাত্তরের রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিল।
নজরুল ইসলাম বাবুর কথায় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরে সাবিনার কণ্ঠে অমর হয়েছে ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’গানটি।

কয়েক বছর আগে গ্লিটজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবিনা ইয়াসমিন বলেছিলেন, “ছোট থেকেই গান গাইছি। বাড়িতে একটা সংগীতের পরিবেশ দেখেছি। মা গান গাইছেন, বাবাও খুব ভালো গাইতেন। বোনেরা তো গাইছেন। আম্মার গানের গলা অসম্ভব সুন্দর ছিলো এবং তিনি গাইতেনও খুব সুন্দর। এত সুন্দর হারমোনিয়াম বাজাতেন, আমি অবাক হয়ে দেখতাম এবং শুনতাম।
“আমার বড় বোন ফরিদা ইয়াসমীন, ফৌজিয়া খান উচ্চাঙ্গ শিখতেন ওস্তাদ দুর্গাপ্রসাদ রায়ের কাছে। আমরা তখন বাবার চাকরির সুবাদে নারায়ণগঞ্জ থাকতাম। আমি আর নীলুফার মাঝেমাঝে বসতাম তাদের পাশে। দেখতাম কী শিখছেন।”
শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি জানিয়ে সাবিনা বলেন, “গানের ব্যাপারটা আমার ভেতরে ছিলই। আমার মা ও নানা একসঙ্গে গান শিখতেন মুর্শিদাবাদে, ওস্তাদ কাদের বক্সের কাছে। তিনি সে সময়ের নামকরা একজন সংগীতজ্ঞ ও ওস্তাদ ছিলেন। সেই সময় মুসলিম নারীদের জন্য গান-বাজনা চর্চা করা সহজ ছিলো না। পরে অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সংসারে ঢুকে গান-বাজনা কিছুই হলো না আম্মার।
“আমার মায়ের মনে জেদ ছিল এজন্য, আমাদের অর্থাৎ তার সন্তানদের গান শেখানোর বিষয়ে। আরেকটা ব্যাপার, আম্মা পড়াশোনাতেও অসম্ভব ভালো ছিলেন, সেটাও চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি তার পক্ষে। এজন্য আমাদের এ দুটি দিকেই সমান মনোযোগী করতে সচেষ্ট ছিলেন তিনি।”
শিক্ষাজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন সাবিনা ইয়াসমিন।
সংগীতে অবদানের জন্য ১৯৮৪ সালে একুশে পদক, ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার ও ১৪ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন এই শিল্পী।
আগের খবর