Published : 27 Aug 2025, 09:05 PM
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গানের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়ে সব শ্রেণির শ্রোতাদের মাঝে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা এক শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। যিনি প্রথম প্লেব্যাক করেন ১২ বছর বয়সে, এর পর দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে তার গানে বুঁদ হয়ে আছেন শ্রোতারা।
কিংবদন্তি এই শিল্পীর দীর্ঘ সংগীতযাত্রা, সংগ্রাম, সাফল্য এবং স্মৃতিকথা জানাতে নির্মাণ করা হয়েছে বিশেষ ডকুফিল্ম ‘জুঁই ফুল: সাবিনা ইয়াসমীন’।

ডকুফিল্মটি তৈরি করেছেন চ্যানেল আইয়ের বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ। সাবিনা ইয়াসমিনের জন্মদিন ঘিরে প্রচার হবে তথ্যচিত্রটি।
বিজ্ঞপ্তিতে চ্যানেল আই জানিয়েছে, আগামী ৫ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে চ্যানেল আইয়ে ‘জুঁই ফুল: সাবিনা ইয়াসমিন’ প্রচার হবে।
'জুঁইফুল: সাবিনা ইয়াসমিন’ তথ্যচিত্রটিতে শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাইখ সিরাজ।
সিরাজ বলেন, “এই ডকুফিল্ম নির্মাণের আগে সবচেয়ে বেশি সময় দিতে হয়েছে গবেষণায়। আর শুটিং সম্পন্ন হওয়ার পর সময় ব্যয় হয়েছে সম্পাদনায়।”
সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, “অনুভূতি প্রকাশ করতে পারছি না। শাইখ সিরাজ ভাই আমাকে নিয়ে এমন সুন্দর এক ডকুফিল্ম নির্মাণ করেছেন, যা দেখে আমি অবাক হয়েছি। এতোটা দারুণ আর গোছানো হবে আমি ভাবিনি।”

সিরাজ বলেন দিলশাদ ইয়াসমিন থেকে কীভাবে সাবিনা ইয়াসমিন হয়ে উঠলেন সেই গল্প দেখা যাবে এই তথ্যচিত্রে।
তিনি বলেন, “প্রথম গান গেয়ে সাবিনা ইয়াসমিন কত পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন, প্রথম শোতে আয়োজকরা কী দিয়েছেন, কীভাবে মাত্র ১২ বছর বয়সে আলতাফ মাহমুদের হাত ধরে সিনেমায় গান গাওয়ার সুযোগ পেলেন, কিংবা দিলশাদ ইয়াসমিন থেকে পরবর্তী জীবনে সাবিনা ইয়াসমিন হয়ে উঠলেন, আমাদের সংস্কৃতির ইতিহাস হয়ে উঠলেন তা দেখানো হবে।
“তার সংগ্রাম, সাফল্য, শিল্পীসত্তাসবকিছুই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে চেয়েছি এই ডকুফিল্মে।”

কয়েক বছর আগে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবিনা ইয়াসমিন বলেছিলেন, “ছোট থেকেই গান গাইছি। বাড়িতে একটা সংগীতের পরিবেশ দেখেছি। মা গান গাইছেন, বাবাও খুব ভালো গাইতেন। বোনেরা তো গাইছেন। আম্মার গানের গলা অসম্ভব সুন্দর ছিলো এবং তিনি গাইতেনও খুব সুন্দর। এত সুন্দর হারমোনিয়াম বাজাতেন, আমি অবাক হয়ে দেখতাম এবং শুনতাম।
আমার বড় বোন ফরিদা ইয়াসমীন, ফৌজিয়া খান উচ্চাঙ্গ শিখতেন ওস্তাদ দূর্গাপ্রসাদ রায়ের কাছে। আমরা তখন বাবার চাকরির সুবাদে নারায়ণগঞ্জ থাকতাম। আমি আর নীলুফার মাঝেমাঝে বসতাম তাদের পাশে। দেখতাম কী শিখছেন।”
তার শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি জানিয়ে সাবিনা বলেন, “গানের ব্যাপারটা আমার ভেতরে ছিলই। আমার মা ও নানা একসঙ্গে গান শিখতেন মুর্শিদাবাদে, ওস্তাদ কাদের বক্সের কাছে। তিনি সে সময়ের নামকরা একজন সংগীতজ্ঞ ও ওস্তাদ ছিলেন। সেই সময় মুসলিম নারীদের জন্য গান-বাজনা চর্চা করা সহজ ছিলো না। পরে অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সংসারে ঢুকে গান-বাজনা কিছুই হলো না আম্মার।
“আমার মায়ের মনে জেদ ছিল এজন্য, আমাদের অর্থাৎ তার সন্তানদের গান শেখানোর বিষয়ে। আরেকটা ব্যাপার, আম্মা পড়াশোনাতেও অসম্ভব ভালো ছিলেন, সেটাও চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি তার পক্ষে। এজন্য আমাদের এ দুটি দিকেই সমান মনোযোগী করতে সচেষ্ট ছিলেন তিনি।”
মাত্র সাত বছর বয়সে প্রথমবার স্টেজে গান করেছেন সাবিনা; ১৯৬২ সালে এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে প্রথম গান করেন। ১৯৬৭ সালে প্রথম প্লেব্যাক করেন আমজাদ হোসেন ও নুরুল হক বাচ্চু পরিচালিত ‘আগুন নিয়ে খেলা’ সিনেমায়।
এরপর আর ডি বর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সত্য সাহা, সুবল দাস, আলম খান, বাপ্পি লাহিড়ী, আলী হোসেন, খন্দকার নুরুল আলম, আলাউদ্দিন আলী, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মত সুরকারদের সুরে অসংখ্য চলচ্চিত্রের গান কণ্ঠে তুলেছেন তিনি।
সহশিল্পী হিসেবে কুমার শানু, আশা ভোঁসলে, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মত শিল্পীকে পেয়েছেন তিনি।
গীতিকার নয়ীম গহরের লেখা ও সুরকার আজাদ রহমানের সুরে সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া দেশাত্মবোধক গান ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’ একাত্তরের রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিল।
নজরুল ইসলাম বাবুর কথায় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরে সাবিনার কণ্ঠে অমর হয়েছে ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’গানটি।
শিক্ষাজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন সাবিনা ইয়াসমিন।
সংগীতে অবদানের জন্য ১৯৮৪ সালে একুশে পদক, ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার ও ১৪ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।