Published : 12 May 2026, 12:34 PM
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের শহর ‘কান’ ঝলমল করে ওঠে মে মাস আসলেই। কারণ এই সময়ে ‘দেশ বিদেশের পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং সংবাদিকরা ভিড় জমান ‘কান চলচ্চিত্র’ উৎসব ঘিরে।
কানে চাইলে যে কেউ চলচ্চিত্র জমা দিতে পারেন। এসব সিনেমা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনের প্রতিনিধিদের দেখার সম্ভাবনা থাকে। এই আসরেই নতুন নির্মাতাদের জন্য মিলে যেতে পারে প্রযোজক। অর্থাৎ নতুন সিনেমার প্রদর্শনী, নতুন চিত্রনাট্য-বিনিয়োগকারীর খোঁজ, পরিবেশকদের প্রকল্প যাচাই-বাছাই, তারকাদের চোখ ধাঁধানো ফ্যাশন-সবকিছুর সমন্বয়ে উৎসব হয়ে ওঠে চলচ্চিত্র জগতের এক মহামিলন।
বিবিসি লিখেছে, মঙ্গলবার থেকে ফ্রান্সের সাগরপাড়ে শুরু হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই চলচ্চিত্র উৎসব। ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসব চলবে আগামী ২৩ মে পর্যন্ত। ওইদিন পুরস্কার ঘোষণা করা হবে।

এবার উৎসবের পর্দা উঠবে ফরাসি পরিচালক পিয়ের সালভাদোরির ‘দ্য ইলেকট্রিক কিস’ সিনেমার মাধ্যমে।
কানের আসর শুরু হয়েছিল ১৯৪৬ সালে, ছোট আকারে। ওই বছরে থেকে সেরা চলচ্চিত্রকে পুরস্কৃত করা হয়। আর আসরের সেরা পুরস্কার ‘পাম দি’অর’ বা ‘স্বর্ণপাম’ দেওয়া হচ্ছে ১৯৫৫ সাল থেকে।
এবারের উৎসবে প্রধান জুরির দায়িত্ব পালন করবেন নন্দিত কোরীয় নির্মাতা পার্ক–চান উক। আর বিশেষ সম্মাননা পাচ্ছেন ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’খ্যাত পরিচালক পিটার জ্যাকসন এবং কিংবদন্তি অভিনেত্রী ও গায়িকা বারবারা স্ট্রাইস্যান্ড।
জমজমাট প্রতিযোগিতার আভাস
এবারের এশীয় ও ইউরোপীয় নির্মাতাদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এ বছর স্বর্ণপাম জেতার লড়াইয়ে আছে ২২টি সিনেমা।
বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ান নির্মাতা না হোং জিনের ‘হোপ’ এবং ইরানি নির্মাতা আসগর ফারহাদির ‘প্যারালাল টেলস’ নিয়ে সিনেমাপ্রেমীরা আলোচনা করছেন।
তালিকায় আরও আছে জেমস গ্রের ‘পেপার টাইগার’, পেদ্রো আলমোদোভারের ‘আমার্গা নাভিদাদ’, হিরোকাজু কোরে-এদার ‘শিপ ইন দ্য বক্স’ ও রয়সুকে হামাগুচির ‘অল অব আ সাডেন’।
রয়েছে ফরাসী সিনেমার আধিক্য; কিছু ফরাসী সিনেমার নির্মাণ করেছেন বিদেশি নির্মাতারা। মূল প্রতিযোগিতায় তিনজন ফরাসি নারী নির্মাতার সিনেমাও জায়গা পেয়েছে।
‘আঁ সাঁর্তে রিগা’ বিভাগে আছে মরক্কোর পরিচালক লায়লা মাররাকচির ‘লা মাস দুলসে’ ও ফিলিস্তিনি নির্মাতা রাকান মায়াসির ‘ইয়েস্টারডে দ্য আই ডিডন্ট স্লিপ’।
এই বিভাগে এবারের অন্যতম চমক নেপালি সিনেমা ‘এলিফ্যান্টস ইন দ্য ফগ’। অবিনাশ বিক্রম শাহর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এটি। বনঘেরা একটি নেপালি গ্রামে বসবাসকারী কিন্নর সম্প্রদায়ের গল্প নিয়ে ‘এলিফ্যান্টস ইন দ্য ফগ’ বানিয়েছেন বিক্রম।
ইরানের রাজনৈতিক দমনপীড়ন নিয়ে নির্মিত ‘রিহার্সেল ফর আ রেভোল্যুশন’ আগে থেকেই আলোচনায়।
রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা আন্দ্রেই পেট্রোভিচ জাভ্যাগিনসেভের প্রত্যাবর্তনও এবারের উৎসবের বড় ঘটনা হিসেবে দেখা যাচ্ছে। কোভিড মহামারীর সময় গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর এবং যুদ্ধের কারণে রাশিয়া ছাড়ার পর এটাই তার প্রথম সিনেমা ‘মিনোটর’। ইউক্রেইন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষকে কীভাবে বাধ্যতামূলকভাব সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে হয়-সে ঘটনাই এই সিনেমার উপজীব্য
ক্রিটিকস উইকে দেখানো হবে লেবানীয় পরিচালক আলী চেরির ‘দ্য সেন্টিনেল’ ও সিরিয়ান পরিচালক দাউদ আল আবদুল্লাহর ‘নাফরন’।
আছে তথ্যচিত্র। আছে এরিক কাঁতোয়াঁকে নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘কাঁতোয়াঁ’। এছাড়া ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের ‘বিতর্কিত’ ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচ নিয়ে তথ্যচিত্র ‘দ্য ম্যাচ’। যেখানে দিয়েগো মারাদোনার সেই ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের গল্পও তুলে ধরা হয়েছে।
মালয়ালম পরিচালক চিদাম্বরম তার ‘বালান: দ্য বয়’ এবং অভিনেত্রী মানসী পারেখ তার গুজরাটি প্রজেক্ট নিয়ে কান ফিল্ম মার্কেটে অংশ নিচ্ছেন।
আসরে জমা পড়েছে ২ হাজার ৫৪১টি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা। এক দশক আগের তুলনায় এই সংখ্যা এক হাজারটির বেশি। এই সিনেমাগুলো এসেছে বিশ্বের ১৪১টি দেশ থেকে।
হলিউডের চাকচিক্য অনুপস্থিত
পৃথিবীর সব দেশের সিনেমার পরিচালকদের কাজ নিয়ে ‘কান উৎসব’ একটি বড় প্রদর্শনীর মঞ্চ হওয়ার কথা থাকলেও, গেল কয়েক বছরে সেখানে হলিউডের আধিপত্য দেখা গেছে। গেলবার হ্যারিসন ফোর্ডের বির্দায়ী সময় বা তারকা অভিনেতা টম ক্রুজের উপস্থিতি উৎসবকে করেছিল বর্ণিল। এবারে ভিন্ন চিত্র। এবার বড় কোনো মার্কিন স্টুডিও তাদের ব্লকবাস্টার সিনেমা নিয়ে উৎসবে আসছে না।
ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’, স্টিভেন স্পিলবার্হের ‘ডিসক্লোজার ডে’র মত গ্রীষ্মকালীন ব্লকবাস্টার বা আলেহান্দ্রো জি. ইনারিতুর ‘ডিগার’ এবং ডেভিড ফিঞ্চারের ‘ক্লিফ বুথ’ এর মত হলিউডের পুরস্কারপ্রত্যাশী সিনেমাগুলোর কোনোটিইর প্রিমিয়ার কানে হচ্ছে না।
গত এক দশকে কানে নিয়মিত জায়গা পেয়েছে ‘স্টার ওয়ারস’ এর মত বড় ফ্র্যাঞ্চাইজিও, এবার সেটিই নেই।
এর বদলে ক্রিশ্চিয়ান মুঙ্গিউ ‘ফিয়র্ড’ এবং পাওয়েল পাভলিকোভস্কি ‘ফাদারল্যান্ড’, নিকোলান উইন্ডিং রেফনের ‘হার প্রাইভেড হেল’ এর মত সিনেমাগুলো উত্তাপ ছড়াবে উৎসবে। এ ধরনের নির্মাতাদের সিনেমাগুলো গল্পনির্ভর ও শিল্পঘেঁষা বলে বর্ণনা করেছে ভ্যারাইটি।
হলিউডের ব্লকবাস্টার সিনেমাগুলোর অনুপস্থিতির কারণ হল, এগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তৈরি হয়নি।
সিনেটিক মিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা এবং অভিজ্ঞ সেলস এজেন্ট জন সলস বলেন, “বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্রের জন্য কান হল বছরের প্রধান প্রদর্শনী মঞ্চ। ক্যালেন্ডারে এই সময়টির কারণে আমেরিকান পুরস্কার-সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্রগুলোর জন্য এটি সবসময়ই একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

সিনেমা বিশ্লেষকরা বলছে, সোশাল মিডিয়ায় প্রচারণায় ঝুঁকে পড়া, খরচ কমানো হলিউড এবার কান থেকে অনেকটা দূরে থেকেছে। এছাড়া কানের সমালোচকদের চুরচেরা বিশ্লেষণও তাদেরকে কান বিমুখ করে তুলছে।
তবে হলিউড যে একেবারে ম্রিয়মাণ তা নয়। জন ট্রাভোলটা নিজের পরিচালনার প্রথম সিনেমা ‘প্রপেলার ওয়ান–ওয়ে নাইট কোচ’ নিয়ে কানে থাকছেন।
স্কারলেট জোহানসন ও অ্যাডাম ড্রাইভার আসছে ‘পেপার টাইগার’ সিনেমা নিয়ে প্রচারে। ‘দ্য ম্যান আই লাভ’ সিনেমা নিয়ে হাজির থাকছে রামি মালিক।
এ ছাড়া লালগালিচায় হাভিয়ের বারদেম, ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট, উডি হ্যারেলসন, কেট ব্লাঞ্চেট ও জুলিয়ান মুর আলো ছড়াবেন। আরও থাকছেন থাকবেন ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন, আলিয়া ভাট, করণ জোহর, অদিতি রায় হায়দারি, কল্যাণী প্রিয়দর্শন, তারা সুতারিয়া, মৌনি রায়সহ আরও অনেকে।
বিচারকের আসরে যারা
কানের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো কোরীয় পরিচালক জুরিপ্রধান হয়ে আসছেন। তিনি পার্ক–চান উক।
বিচারক প্যানেলে পার্ক–চান উকের সঙ্গে আরও থাকবেন হলিউড অভিনেত্রী ডেমি মুর, আইরিশ অভিনেত্রী রুথ নেগা, অস্কারজয়ী চীনা পরিচালক ক্লোয়ে ঝাও, সুইডিশ অভিনেতা স্টেলান স্কার্সগার্ড, বেলজিয়ান পরিচালক লরা ওয়ান্ডেল।
এছাড়া চিলির পরিচালক দেয়েগো সেসপেদেস, আইভোরীয়-আমেরিকান অভিনেতা ইসাক ডি বাঙ্কোলে ও স্কটিশ চিত্রনাট্যকার পল ল্যাভার্টিও থাকছেন।
ক্রিটিকস উইক বিভাগের জুরিপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ভারতীয় নির্মাতা পায়েল কাপাডিয়া। ২০২৪ সালে তার সিনেমা ‘অল উই ইমাজিন অ্যাজ লাইট’ গ্র্যান্ড প্রিক্স জেতার পর এটি ভারতের জন্য এক বিশাল অর্জন।
২৩ মে উৎসবের সমাপনী আয়োজনে সেরা সিনেমার নাম ঘোষণা করবেন এই বিচারকেরা।
বিতর্কে এআই
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবারের কান উৎসবের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। পরিচালক স্টিভেন সোডারবার্গের তথ্যচিত্র ‘জন লেনন: দ্য লাস্ট ইন্টারভিউ’ নিয়ে বিতর্ক চলছেই।
এই সিনেমায় মৃত্যুর আগে জন লেননের দেওয়া এক অডিও সাক্ষাৎকারকে দৃশ্যমান করতে এআই–জেনারেটেড ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এআইয়ের এই ব্যবহারকে কেউ সৃজনশীল উদ্ভাবন হিসেবে দেখছেন; আবার কারও ভাষ্যএটি মৃত শিল্পীর স্মৃতির বাণিজ্যিক ব্যবহার।
কিছুদিন আগে গোল্ডেন গ্লোব কর্তৃপক্ষও এআই ব্যবহারের নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেছে। তাতে বলা হয়েছে, মানুষের সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ থাকলে এআই ব্যবহৃত চলচ্চিত্র ‘অযোগ্য হবে না’।