Published : 23 Aug 2025, 11:00 PM
ব্যান্ড শিল্পী, গীতিকার ও সুরকার নকীব খানের চৌষট্টি বছরের জীবনে গান-সুরের সঙ্গে কেটেছে ৫০ বছরের বেশি; সংগীতের ভুবনে তার এ দীর্ঘযাত্রা উদযাপনের অনুষ্ঠান ভরে উঠল গান আর স্মৃতিচারণায়।
শনিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ক্রিস্টাল বলরুমে হয়ে গেল ‘নকীব খান ফিফটি ইয়ারস সেলিব্রেশন’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠান। এতে উপস্থিত ছিলেন নকীব খানের দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা-সহকর্মীরা।
অনুষ্ঠানে সংগীতশিল্পী খুরশীদ আলম, রফিকুল আলম, ফেরদৌস ওয়াহিদ, মনির খান, জালাল উদ্দীন খান জিলু, সুরকার মিল্টন খন্দকার, রবি চৌধুরী, ফুয়াদ নাসের বাবু, শহীদ মাহমুদ জঙ্গী, বাপ্পা মজুমদার, আসিফ ইকবাল, পার্থ বড়ুয়া, শওকত আলী ইমনের কথায় উঠে এসেছে নকীব খানের সংগীতে ডুবে থাকার কথা।
টেলিভিশন জার্নালিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ (টিজেএফবি) আয়োজিত অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগীতশিল্পী বাপ্পা মজুমদার।
শিল্পীদের গানের রয়্যালটি ঠিকঠাক পাওয়া ব্যবস্থার প্রতি জোর দেন খুরশীদ আলম। বলেন, "নকীব খান অনেক চালাক মানুষ, তিনি গানকে পুরোপুরি পেশা হিসেবে নেননি৷ গানের পাশাপাশি করপোরেট জীবনেও প্রতিষ্ঠিত। দেশের অনেক শিল্পী তার ৫০ বছর উদযাপন এত বড় করে করতে পারেনি- সৈয়দ আব্দুল হাদী, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিনসহ অনেকে। কিন্তু নকীব খান তা পেরেছেন। তার জন্য তাকে সাধুবাদ।
“আমাদের দেশের শিল্পীদের অবস্থা খুব খারাপ। সরকারের কাছে আমার অনুরোধ, শিল্পীদের গানের রয়্যালটির ব্যবস্থা যদি করে দিতেন তাহলে খুব উপকার হত শিল্পীদের।"
সংগীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন, "বৃক্ষের পরিচয় ফলে, নকীব নামক ফল যে ৫০ বছর যাবত আমাদের শিল্পে এত সুন্দর গান দিয়ে আসছে তার জন্য এই দেশের মানুষ তার কাছে কৃতজ্ঞ। তার এই সৃষ্টি সারাজীবন স্বীকৃতি দিয়ে যাবে বলে আশা করি। শুধু ৫০ বছর নয়, যতদিন বেঁচে থাকবে নকীব তার গান দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করবে।
”সারা পৃথিবীর সংগীত কিন্তু এক জায়গায় আবদ্ধ নেই, নিয়মিত পরিবর্তন হচ্ছে। আমাদের ৫০ দশকে, ৬০ দশকে গানের একটা মৌলিকত্ব ছিল। এখন আধুনিক ধারার গানের পরিবর্তন হচ্ছে, নকীব কিন্তু সেই ধারার সঙ্গে মিলে গান গেয়ে যাচ্ছেন। সেজন্য নকীব আমাদের কাছে প্রিয় এই প্রজন্মের কাছে ও প্রিয়।"

রফিকুল আলম বলেন, "আমার সঙ্গে নকীব খান কয়েকবার কী বোর্ড বাজাতে গিয়েছিলেন। একজন শিল্পী গান করেন, গান লেখেন, সুর করেন, যন্ত্র বাজান অনেক গুণ নকীবের। আমি চাই নকীব আরও ৫০ বছর একই গতিতে এগিয়ে যাক।"
শিশু বয়স থেকেই নকীব খানের গানের প্রতি আগ্রহ থাকার কথা তুলে ধরেন নকীব খানের বড় ভাই সুরকার জালাল উদ্দীন খান জিলু।
ছোটবেলার স্মৃতি মনে করে তিনি বলেন, "নকীবের যখন এক বছর, আমার তখন ১১ বছর। ও যখন কান্না করত আমার মনে হত হারমোনিয়ামে বাজালে সে থেমে যাবে। বাবাকে বললাম, একটা হারমোনিয়াম বাজালে তার কান্না থেমে যাবে। আসলেই তা হল। অর্থাৎ নকীবের সংগীতের প্রতি টান শিশুকাল থেকেই ছিল।
"নকীবের গানের ৫০ বছর উদযাপন এবং এই অর্জন দেখে আমি খুব গর্বিত। তার গান হাজার হাজার বছর ধরে চলুক এটাই আমার চাওয়া। কারণ নকীবের গান মেলোডিক। মেলোডিক গান কিন্তু আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আমি মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি থেকে অনেক আগেই বিদায় নিয়েছি। এখন যারা আছেন তাদের কাছে অনুরোধ করব তারা যেন মেলোডিক গানগুলো বাঁচিয়ে রাখতে কাজ করে যান।"
মন শুধু মন ছুঁয়েছে গানের সুরকার জালাল উদ্দীন খান জিলু। ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নকীব খান বলেন, "আমার জনপ্রিয় গান 'মন শুধু মন ছুঁয়েছে' গানটি লিখেছি আমি, কিন্তু সুর করেছেন আমার ভাই। উনি আমার থেকে ১০ বছরের বড়, আমার বাবা হঠাৎ করেই ইন্তেকাল করেন। আমাদেরকে চালানোর জন্য, সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আমার ভাইকে সংগীত জীবন থেকে বিদায় নিতে হয়েছে।

”উনি অনেক বড় মাপের সুরকার ছিলেন, আমাদের জন্য উনি সংগীত নিয়ে এই ত্যাগ করেছেন। আমার আজকে এতদূর পৌঁছানোর পেছনে একমাত্র কৃতিত্ব আমার ভাই জিলু খানের।"
নকীবের মানবিক গুণের প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করে ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, "নকীব যখন ফোন দিলেন খুশি হলাম। তার সংগীত জীবনের ৫০ বছর উদযাপন এটা আনন্দের। তার ফোন পেয়েই এইখানে আসে। নকীব খানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় থেকে এখন পর্যন্ত নকীবের যে গুণটি মুগ্ধ করার মত সেটি হল সে অন্যকে সম্মান দিতে জানেন।
”নকীব অনেক গান, সুর উপহার দিয়েছেন যা এখনো জনপ্রিয়। মেলোডি এমন একটা জিনিস যেটা মানুষকে অনেক বছর বাঁচিয়ে রাখে। নকীব তার গান দিয়ে বেঁচে থাকুক। নকীবের প্রতি অনুরোধ করব তুমি গান থেকে সরে যেও না। যতদিন বেঁচে থাক গানটা, সুরটা করে যেও।"
মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীনের বছর খানেক পর জন্মস্থান চট্টগ্রাম থেকে শুরু হয় নকীব খানের সংগীতের যাত্রা। বালার্ক ব্যান্ডে গায়ক, পিয়ানিস্ট ও শিল্পী হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ হয়। এরপর ১৯৭৪ সালে তিনি যোগ দেন সোলসে।
এ ব্যান্ডে প্রায় ১০ বছর ছিলেন নকীব খান। এরপর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে ১৯৮৫ সালে গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড রেনেসাঁ। সেই থেকে রেনেসাঁ নিয়েই শ্রোতাদের ভালোবাসা কুড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।
সোলসের ‘নদী এসে পথ’, রেনেসাঁর ‘হৃদয় কাদামাটির কোনো মূর্তি নয়’, ‘ভালো লাগে জোছনা রাতে’, ‘ও নদী রে’, ‘আচ্ছা কেন মানুষগুলো’, ‘তুমি কি আজ বন্ধু’, ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’, ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’সহ অনেক শ্রোতাপ্রিয় ও জনপ্রিয় গান রয়েছে নকীব খানের গাওয়া ও সুর করা।

নকীব খানকে নিয়ে এ অনুষ্ঠানের বিষয়ে আয়োজক টিজেএফবির সভাপতি রেদুয়ান খন্দকার বলেন, "নকীব খান আমাদের সংগীত জগতের একজন কিংবদন্তি। তার ক্যারিয়ারের ৫০ বছর উদযাপনের এই আয়োজন করতে পেরে আমরা আনন্দিত। আমরা এটা বিশ্বাস করি বেঁচে থাকতেই তার কাজের জন্য সম্মাননা জানানো দরকার। কেউ মারা গেলে সেটা নিয়ে আয়োজন করে কোনো লাভ হয় না। আমরা নকীব খানকে দিয়ে শুরু করেছি এই আয়োজন সামনে আরও চলবে বলে আশা করছি।"
এরপর মঞ্চে একসঙ্গে গান করেন বাপ্পা মজুমদার ও নকীব খান। দর্শকদের শোনালেন 'রানওয়ে' শিরোনামের গান।
নকীব খান গেয়ে শুনিয়েছেন 'ও নদীরে তুই যাস কোথায় রে', 'তুমি তো পটে আঁকা ছবি নও, ফুলদানির কোনো ফুল নও', চট্টগ্রামের ভাষায় গাইলেন 'আরত বাড়িত যাইয়ো তুই’, তুমি এলে পায়ে পায়ে'।
নকীব খানের সুর করা গান গেয়ে শুনিয়েছেন শিল্পী সাব্বির জামান ও ঋতুরাজ।
অনুষ্ঠানে নকীব খানের সঙ্গে পারফর্ম করেছে সোলস ব্যান্ড। পার্থ বড়ুয়া ও নকীব খান একসঙ্গে গেয়েছেন' মন শুধু মন ছুঁয়েছে', 'তোকে পুতুলের মত করে সাজিয়ে', 'হৃদয় কাঁদামাটির কোনো মূর্তি নয়'। আর সবাইকে মুগ্ধ করে 'তুমি কী আজ বন্ধু' গান দিয়ে শেষ হয়েছে অনুষ্ঠান।