Published : 21 Mar 2026, 10:35 PM
এফডিসির দুই নম্বর শুটিং ফ্লোরে ঢুকতেই মনে হল যেন সত্যিকারের কোনো রেলওয়ে স্টেশন।
বিশাল স্টুডিওজুড়ে তৈরি করা হয়েছে ট্রেনের বগি, জানালার পাশে সারি সারি সিট, মাথার ওপর লাগেজ রাখার তাক, এমনকি বগির ভেতরের আলো আর নম্বরও রাখা হয়েছে বাস্তব ট্রেনের আদলে।

দুটি বগি দিয়ে ট্রেনের আদলে এই সেট তৈরি করা হয়েছে ঈদে মুক্তি পাওয়া ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার জন্য।
ক্যামেরা, লাইট আর কর্মীদের ব্যস্ততার মাঝেও সেটটির সূক্ষ্ম নকশা চোখে পড়ে।
জানালার বাইরে কৃত্রিম দৃশ্য, বাস্তব ট্রেনের মত হালকা দুলুনির অনুভূতি তৈরি করতে বসানো হয়েছে মাটি থেকে এক ফুট উঁচু প্যাঁচানো লোহার স্প্রিং।
সব মিলিয়ে দর্শক যেন পর্দায় সত্যিকারের ট্রেনযাত্রার অভিজ্ঞতাই পান, সে ভাবনাতেই পরিচালক তানিম নূর যত্ন নিয়ে তৈরি করেছেন পুরো সেট। আর তার এই সেট তৈরির কারিগর শিল্প নির্দেশক রাজীম আহমেদ।
রাজীম বলেন, “সিনেমার জন্য দেশে এই প্রথম কোনো ট্রেনের সেট তৈরি করা হয়েছে, এখানে বাস্তবসম্মত লুক দেওয়ার জন্য কোনো আপস করা হয়নি। পুরো ট্রেন মেটাল বা লোহা দিয়ে বানানো সম্ভব ছিল না, তাই কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তব ট্রেনের বগির মত এর পরিমাপ ও অনুপাত নিখুঁত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।”

বাংলাদেশের সিনেমায় ট্রেনের দৃশ্য তো কম নেই। আগে যদি সত্যিকারের ট্রেনে শ্যুট করা সম্ভব হয়ে থাকে, এবার কেন সেট তৈরি করতে হল?
শিল্প নির্দেশক রাজীম বললেন, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার পুরো গল্পটাই ট্রেনের ভেতরে। সে কারণে প্রায় ১৫ দিনের মত শুটিং করতে হয়েছে।
“বাস্তব ট্রেনে তো এত দীর্ঘ সময় শুটিং সম্ভব না, তাই বাস্তব ট্রেনের আদলে সেট তৈরি করা।”
তিনি বলেন, “সেটটা তৈরি করতে বিভিন্ন ধরনের লোক লেগেছে, শিল্প নির্দশক দলের সদস্য ছাড়াও কাঠমিস্ত্রী, ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, স্যানিটারি মিস্ত্রি সব মিলিয়ে ৪৫ জন লোক নিয়ে কাজটি সম্পন্ন করতে হয়েছে। আর সেট তৈরি করতে সময় লেগেছে ২৬ দিন।”
তবে এই সেট তৈরি করতে কতটা চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপে তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হল।
স্টুডিও ও ফ্লোর সংকট
রাজীম আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে বড় আকারে সেট তৈরি করতে যেসব প্রযুক্তির প্রয়োজন, সেটা নেই। দক্ষ লোকজন নেই, সিনেমার সেট নির্মাণের জন্য যে বিশাল জায়গা প্রয়োজন, তাও নেই।
“বর্তমানে এফডিসিতে কয়েকটি ফ্লোর সচল আছে, যার মধ্যে বড় সিনেমার সেট তৈরির জন্য একমাত্র উপযুক্ত জায়গা হল দুই নম্বর ফ্লোর। অন্য ফ্লোরগুলো খুব ছোট, যেখানে বিজ্ঞাপনের জন্য কাজ করা যায়। সিনেমার জন্য যে জায়গা প্রয়োজন, সেটা অন্য ফ্লোরে নেই। সেজন্য আমাদের বেগ পেতে হয়েছে।”
রাজীম বলেন, “শুটিংয়ের আগে অনেক অনুরোধ করে এই ফ্লোর পেতে হয়েছে। দেখা গেছে, ফ্লোর ভাড়া নেওয়ার জন্য দুইজন দাঁড়িয়ে আছে। এমনো হয়েছে, অন্য কেউ ফোন করে জানতে চেয়েছে আমরা ফ্লোর কবে ছাড়ব। একটা চাপ নিয়েই কাজ শেষ করতে হয়েছে।”

বিভিন্ন সময়ে জায়গার অভাবে কাজ করতে গিয়ে নানা সংকটের মুখোমুখি হওয়ার কথাও বললেন এ শিল্প নির্দেশক।
“এমনো হয়েছে সেট পাওয়া যাচ্ছে না, তাই শুটিং পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হচ্ছে, আবার কোনো কারণে কাজটি ফেঁসে গেলে তখন আবার স্ট্রাগল করতে হয়, কারণ আমাদের পর আরেকজন সেটটি নিবে, তাদেরও প্রস্তুতির একটা ব্যাপার থাকে।”
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া শিল্প নির্দেশক শিহাব নূরুন নবীও সেট তৈরির জায়গার অপ্রতুলতার কথা বললেন। ‘নোনা জলের কাব্য’ সিনেমার শিল্পনির্দেশনার জন্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
শিহাব বলেন, “বাংলাদেশে সেট তৈরি করতে ইনডোর ফ্লোর বলতে এফডিসি, দীপ্ত টিভি, চ্যানেল ওয়ান, এনটিভি, ও নাইন এন হাফ স্টুডিও রয়েছে। আর বড় কোনো কাজ করতে হলে একটাই ফ্লোর, সেটা হল এফডিসির দুই নম্বর ফ্লোর। যতটা বড় ফ্লোর দরকার, সেটা আমাদের এইখানে নেই।”

দক্ষ জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব
শিহাব নূরুন নবীর মতে, বড় ফ্লোর না থাকা একটি বড় সমস্যা। কিন্তু সিনেমার সেট নির্মাণে সবচেয়ে বড় সংকট হল দক্ষ জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব।
“আমাদের এখানে দক্ষ কর্মী খুব কম। দেশে সেট ডিজাইন বা আর্ট ডিরেকশন শেখানোর মত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব একটা নেই। অনেকেই কাজ করতে করতে এক ধরনের দক্ষতা অর্জন করেন। তাতে সময় বেশি লাগে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকায় নতুন প্রযুক্তি বা বিশ্বে নতুন কী হচ্ছে, সেগুলো জানতে আমাদের বেগ পেতে হয়।”

যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর দিক থেকেও দেশের চলচ্চিত্র শিল্প যে পিছিয়ে আছে, সে কথাও বললেন এ শিল্প নির্দেশক।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প তুলনামূলক ছোট হওয়ায় বড় ধরনের সেট নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সুযোগ সীমিত। সেই তুলনায় বিজ্ঞাপন শিল্প বড়। অনেকেই বিজ্ঞাপনের কাজ করতে করতে পরে সিনেমায় আসছেন। আমরা নিজেরাও বিজ্ঞাপনের কাজ করতে করতে কিছু ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ করেছি, সেগুলোই এখন সিনেমায় ব্যবহার করার চেষ্টা করি।”
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস পুরনো হলেও সিনেমায় শিল্প নির্দেশকের ভূমিকা আগে এতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হত না।
শিহাব নূরুন নবী বলেন, “সিনেমায় আর্ট ডিরেক্টর নিতে হবে এই ধারণাই তো আগে ছিল না পরিচালক, প্রযোজকদের। এই বিভাগটার আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হত না। গত ১০–১৫ বছর ধরে একটু গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে যারা কাজ করছে খুব চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছে।”
কাজ করতে গিয়ে সময় ও বাজেট সংকটও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
“অনেকে মনে করেন, এক মাস প্রস্তুতি নিলেই একটি চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করা যায়। কিন্তু ঠিকভাবে করতে গেলে অন্তত তিন মাসের প্রি-প্রোডাকশন দরকার। লোকেশন রেকি, সেট ডিজাইন, স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী ভিজ্যুয়াল পরিকল্পনা সব মিলিয়ে সময় লাগে। কিন্তু সেই বাজেট দেওয়া হয় না। একটি বড় চলচ্চিত্রের জন্য শিল্প নির্দেশনার জন্য অন্তত ৩০ লাখ টাকা বাজেট থাকা উচিত, কিন্তু বাস্তবে তার অর্ধেকও পাওয়া যায় না,” বলেন শিহাব।

বিশ্বের অনেক দেশে চলচ্চিত্র শিল্প ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় বড় স্টুডিও কমপ্লেক্স। সেসব জায়গায় নানা ধরনের স্থায়ী সেট তৈরি করে রাখা হয়।
ভারতের হায়দরাবাদের রামোজি ফিল্ম সিটি বিশ্বের বৃহত্তম চলচ্চিত্র স্টুডিও কমপ্লেক্সগুলোর একটি। সেখানে গ্রাম, শহর, বিমানবন্দর, প্রাসাদ, রাস্তা, ট্রেন এমন নানা ধরনের সেট স্থায়ীভাবে তৈরি করে রাখা হয়েছে।
একইভাবে মুম্বাই ফিল্ম সিটি, হলিউডেও এমন সব সেট তৈরি করা আছে। নির্মাতারা প্রয়োজন অনুযায়ী সেই সেট ভাড়া নিয়ে শুটিং করতে পারেন।
বিদেশের স্থায়ী স্টুডিওর সঙ্গে বাংলাদেশের পার্থক্য তুলে ধরে শিহাব বলেন, “আমাদের এখানে কিছু রিসোর্ট বা খামারবাড়ি আছে, যেখানে নিয়মিত শুটিং হয়। কিন্তু নির্দিষ্টভাবে সিনেমার জন্য তৈরি স্থায়ী স্টুডিও খুব একটা নেই। এফডিসির ফ্লোর ও শুটিং স্পটগুলো সংস্কার করলেও একটা সম্ভাবনা দেখা যেত।”
বাংলাদেশে সিনেমা নির্মাণের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে একমাত্র স্থায়ী জায়গা হল বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন বিএফডিসি।
একসময় অধিকাংশ বাংলা সিনেমার সেট তৈরি হত এফডিসির ফ্লোরে। গ্রাম, আদালত, পুলিশ স্টেশন বা জমিদারবাড়ির মত সেট বানিয়ে সেখানেই চলত শুটিং। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণ কাজে নানা ধরনের চাহিদা তৈরি হলেও তা মেটানোর মত অবকাঠামো এফডিসিতে তৈরি হয়নি। যা ছিল, যত্নের অভাবে সেগুলোও অনেকটা অকেজো হয়ে গেছে।

এফডিসির শুটিং স্পটের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ফ্লোর, স্টুডিও চত্বর, কড়ইতলা, এডিটিং মাঠ, বাগান, ক্যান্টিন, গ্যারেজ, ভবনের ছাদ, স্টল, লবি, করিডোর, মেডিকেল সেন্টার, ঝরনা স্পট। এসব জায়গার বেশিরভাগই এখন ব্যবহারের অযোগ্য।
এখন শুটিংয়ের উপযুক্ত স্থান বলতে রয়েছে কেবল প্রশাসনিক ভবনের সামনে আর ঝরনা স্পটের আশপাশের খোলা জায়গাটুকু। বাকি সব জায়গা অনেকটা দুর্দশাগ্রস্ত।
যে জমিদারবাড়ি আগে সিনেমায় বড়লোকের বাড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হত, সেটি দীর্ঘদিন পড়ে আছে অযত্ন-অবহেলায়। পুকুরের পানি আবর্জনায় ভরা, কৃত্রিম ঝরনাটিও অকেজো।

এফডিসিতে আগে ছিল নয়টি ফ্লোর, বর্তমানে টিকে আছে ছয়টি ফ্লোর। এর মধ্যে তিনটি ফ্লোরের দশা অনেকটাই বেহাল।
গত বছর থেকেই এফডিসির আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান তানি। সে কাজের অগ্রগতি কতদূর, তা জানতে কথা হয় তানির সঙ্গে।
তিনি বলেন, “ফ্লোরগুলো সংস্কার করতে হবে। পানি পড়ে, এসি নষ্ট, নানান অসুবিধা আছে। শীতকালটা আমাদের খুব সুন্দর চলল, তবে বর্ষার আগে যদি আমরা ঠিক করে না ফেলি, তাহলে বৃষ্টির পানি পড়ে সেগুলোও নষ্ট হয়ে যাবে।”
সেজন্য দরকার বরাদ্দ। বরাদ্দ পেলে বর্ষার আগে ফ্লোরগুলোর সংস্কার করা সম্ভব হবে বলে আশায় আছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

এফডিসির বিদ্যমান ফ্লোরগুলো সংস্কারের পাশাপাশি পরিত্যক্ত জায়গাগুলো ব্যবহার করে ছোট ছোট শুটিং সেট তৈরির পরিকল্পনার কথাও তিনি বললেন।
এছাড়া এফডিসির চলমান কমপ্লেক্স প্রকল্প এবং কবিরপুরে নির্মাণাধীন 'ফিল্ম সিটির' কাজ শেষ হলে সেখানে নতুন শুটিং ফ্লোর ও সেট ব্যবহারের সুযোগ মিলবে।
বাণিজ্যিক স্টুডিওর হল কী?
বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে স্টুডিও ভাড়া দেয় 'স্টুডিও নাইন এন হাফ'। সেখানে আছে চারটা ফ্লোর।
এর মধ্যে দুটো ফ্লোর ৬০ বাই ৮০ ফুট, আর উচ্চতা হচ্ছে ৩০ ফুট। ৬০ বাই ৮০ ফুটের আরেকটি ফ্লোরের উচ্চতা ৩৫ ফুট। আর চতুর্থ ফ্লোরটির আকার ৬০ বাই ৬০, উচ্চতা ৩০ ফুট।
প্রতিটা ফ্লোরের সঙ্গে আলাদা মেকআপ রুম আছে। এছাড়া খাবারের জন্য আলাদা জায়গা, প্রোডাকশন কর্মীদের জন্য আলাদা জায়গা, বাইরে সেট তৈরি করার জন্য জায়গা আছে।
প্রত্যেক ফ্লোরের সঙ্গে ছেলেদের এবং মেয়েদের জন্য আলাদা আলাদা ওয়াশরুমের ব্যবস্থা আছে। নামাজের জায়গা, পার্কিংয়ের ব্যবস্থাসহ নানান কিছু রয়েছে এই স্টুডিওতে।

নয়জন মিলে পরিচালনা করছেন এই স্টুডিও। তাদের মধ্যে একজনের সঙ্গে কথা হয় এই স্টুডিও নিয়ে। তবে তিনি নাম প্রকাশ করে কথা বলতে চাইলেন না।
স্টুডিওর ব্যস্ততা কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এইখানে বেশি হয় বিজ্ঞাপনের কাজ। সিনেমার কাজ হয় অল্প। কিছু ফিকশন ও ওটিটির কাজ হয়।”
নির্মাতারা এখানে কী কী সুবিধা পান? স্টুডিওর পরিচালক বললেন, ‘সব ধরনের’ সুবিধাই এখানে আছে।
“আমাদের ফ্লোর সবসময় পরিষ্কার রাখা হয়, প্রত্যেক ফ্লোরের সঙ্গে প্রতিদিন শুটিংয়ের জন্য একজন করে ক্লিনার থাকে, প্রোডাকশনের সবার জন্য বসার আলাদা জায়গা আছে, প্রত্যেক ফ্লোরের সঙ্গে চারটা করে স্ট্যান্ড ফ্যান থাকে, টেবিল-চেয়ার থাকে।
“নির্মাতাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এখানে কাজ করতে গেলে তারা নির্ভয়ে কাজ করতে পারবে। কোনো সমস্যা নাই। কাজের জন্য যতটুকু নিরাপত্তা প্রয়োজন, ওই নিরাপত্তাটা আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করি।”
তবে এফডিসির তুলনায় এ স্টডিওর ভাড়া বেশি জানিয়ে তিনি বলেন, “যেহেতু এটা একটা প্রাইভেট স্টুডিও, তাই খরচ বেশি। এখানে দিন হিসেবে ভাড়া হয়। শুটিং দিনে ফ্লোর ভাড়া হচ্ছে ২৫ হাজার টাকা। আর যখন শুটিংয়ের কনস্ট্রাকশনের কাজ চলে, তখন ১১ হাজার টাকা প্রতিদিন।”
বেড়েছে বিদেশ নির্ভরতা
গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের বড় বাজেটের সিনেমাগুলোর বড় অংশের শুটিং হচ্ছে দেশের বাইরে। ভারত, নেপাল, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কায় হচ্ছে দৃশ্যধারণ।

২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দরদ’ সিনেমার শুটিং হয়েছে ভারতের বারানসি ও এলাহাবাদে। একই বছর বড় বাজেটের সিনেমা ‘তুফান’ এর শুটিংও হয়েছে ভারতে।
গত বছর মুক্তি পাওয়া ‘বরবাদ’ সিনেমার দৃশ্যধারণের কাজ হয়েছে মুম্বাইয়ে। একইভাবে ‘তাণ্ডব’ সিনেমার শুটিং হয়েছে ভারতে।
এবার ঈদে মুক্তি পাওয়া ‘রাক্ষস’, ‘প্রিন্স: ওয়ানস আপন আ টাইম ইন ঢাকা’ সিনেমাগুলোর বেশিরভাগ শুটিং দেশের বাইরে হয়েছে।
এমন আরও অনেক সিনেমা আছে, যেগুলোর দৃশ্যধারণ হয়েছে দেশের বাইরে।
এই বিদেশ নির্ভরতার কারণ জানতে চাইলে ‘তুফান’ ও ‘তাণ্ডব’ সিনেমার সঙ্গে যুক্ত নির্বাহী প্রযোজক সাব্বির আহমেদ সোহাগ বলেন, বড় পরিসরের সিনেমা করতে গেলে দেশে ‘নানা ধরনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখে’ পড়তে হয়।
“বড় সিনেমা মানেই বড় আয়োজন। কিন্তু আমাদের এখানে সেই ভিশন বাস্তবায়নের মত অনেক কিছুই নেই। যেমন প্রয়োজনীয় প্রপস, পিরিয়ডিক্যাল বা ভিন্টেজ গাড়ি, আধুনিক প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম কিংবা পর্যাপ্ত দক্ষ টেকনিক্যাল ক্রু নেই।”
তিনি বলেন, অনেক সময় গল্পের প্রয়োজনে বিশেষ ধরনের অস্ত্র বা প্রপস দরকার হয়, কিন্তু সেগুলো দেশে পাওয়া যায় না।
“বাংলাদেশে লোকেশন সংকটও বড় সমস্যা। ঘুরে ফিরে একই জায়গায় শুটিং করতে হয়। আবার বড় লোকেশন বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় শুটিংয়ের অনুমতি পাওয়াও কঠিন। ফলে নির্মাতারা বিকল্প হিসেবে বিদেশে শুটিং করার কথা ভাবেন।”
সোহাগের ভাষ্য, “বিদেশে ফিল্ম সিটি বা শুটিং-ফ্রেন্ডলি স্টুডিওতে আগে থেকেই হাসপাতাল, থানা, জেলখানা বা বিভিন্ন ধরনের বাড়ির মত স্থায়ী সেট তৈরি থাকে। নির্মাতারা সেগুলো সামান্য পরিবর্তন করেই ব্যবহার করতে পারেন।
“কিন্তু বাংলাদেশে এমন অবকাঠামো নেই। নতুন করে বড় সেট বানাতে ২০ লাখ টাকা লাগবে। কিন্তু বিদেশে তৈরি সেটে শুটিং করলে যাতায়াত ও অন্যান্য খরচসহ কম টাকাতেই কাজ শেষ করা যায়, আবার সেখানে ভালো ক্রু ও প্রযুক্তি সুবিধাও পাওয়া যায়।”
‘দক্ষ টেকনিক্যাল কর্মীর’ ঘাটতির কথাও উঠে আসে এই প্রযোজকের কথায়।
“দেশে দক্ষ কর্মী আছে অল্পসংখ্যক। একসঙ্গে অনেক ইউনিট কাজ করলে সবাই সেই মানের টিম পায় না। ফলে বড় বাজেটের প্রযোজনাগুলো অনেক সময় বিদেশি ক্রু নিয়েই কাজ করতে চায়। আবার বিদেশি ক্রু আনলে যন্ত্রপাতি থাকে না। তাছাড়া বিদেশে শুটিং করলে খরচ বাড়লেও নির্মাতারা অভিজ্ঞ ও প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ কর্মীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান।”

সরকারি সহায়তা ও শুটিংবান্ধব অবকাঠামো বাড়ানো গেলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব বলে মনে করেন প্রযোজনা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরু মনে করেন, বেসরকারি উদ্যোগে আধুনিক স্টুডিও তৈরি এবং সব ধরনের প্রযুক্তিগত সুবিধা দিলে দেশের টাকা দেশেই থাকবে।
“দেশে প্রয়োজনীয় সেট বা লোকেশন না থাকায় অনেক সময় নির্মাতাদের বিদেশে যেতে হয়, এতে খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সেই অর্থ যদি দেশে বিনিয়োগ করা যেত, তাহলে এখানেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব হত।
“এক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদেরও আগ্রহী হওয়া উচিত। বিভিন্ন সংগঠন ও উদ্যোক্তারা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবলে দেশের ভেতরেই শুটিং অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।”

তবে দেশের চলচ্চিত্র বাজারের যে পরিস্থিতি, তাতে ভবিষ্যতে স্টুডিওর জন্য বেসরকারি উদ্যোগ বড় বিনিয়োগের বিষয়ে খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছেন না খসরু।
তিনি বলেন, “আমাদের চলচ্চিত্র তো ঈদকেন্দ্রিক, চলচ্চিত্র নির্মাণ না বাড়ালে কোনো খাতেই সংকট কমবে না। কেউ অনেকগুলো ফ্লোর তৈরি করল, কিন্তু সেটা ভাড়া দিতে পারল না। তাহলে তো আর আসলে লাভ হল না।
“আমাদের বছরে ৩০টা সিনেমাও হয় না। ফলে কেউ সেখানে বিনিয়োগ করলেও লসে পড়বে। চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে আসলে সামগ্রিক পরিকল্পনা দরকার। পরিকল্পনা ছাড়া এগোলে কোনো খাতেই লাভ হওয়া সম্ভব না।”
খসরু বলেন, “এখানে সেট সংকট, হল সংকট, প্রযুক্তির সংকট, কর্মীর সংকট, এত সংকটের মধ্যে প্রযোজক হিসেবে তো সব করতে পারব না।”