Published : 06 Apr 2025, 02:20 PM
বেঁচে থাকলে ভারতীয় বাংলা সিনেমার মহানায়িকা সুচিত্রা সেন ছুঁতেন জীবনের ৯৪তম জন্মবার্ষিকী। যদিও ‘হারানো সুর’, ‘পথে হলো দেরী’, ‘দীপ জ্বেলে যাই’, ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ অথবা হিন্দি ছবি ‘দেবদাস’ বা ‘আঁধি’র দেখা সুচিত্রাকে কখনোই ছুঁতে পারেনি বার্ধক্য, জরা বা তার প্রয়াণ অনুপস্থিতি।
রোববার সুচিত্রার জন্মবার্ষিকী পরিবারের সদস্যরা কীভাবে পালন করবেন তার আভাস দিয়েছেন মহানায়িকার নাতনি অভিনেত্রী রাইমা সেন।
কলকাতার সংবাদমাধ্যম টিভিনাইন বাংলাকে রাইমা বলেছেন, শহরের বালিগঞ্জে সুচিত্রার বাড়িটি ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা প্রদীপ জ্বালাই। বাড়িতে মিষ্টি আসে। সেই মিষ্টি সবার মধ্যে বিতরণ করা হবে বরাবরের মত।"
১৯৭৮ থেকে ২০১৪- প্রায় তিনটি যুগ ঠিক কোন কারণ বা অভিমানে এ বাংলার মেয়ে সুচিত্রা নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলেন- তা যেমন এখন পর্যন্ত অজনা থেকে গেছে, তেমনি বালিগঞ্জের বাড়িতে অন্তরাল জীবনে তিনি কি কি করতেন, সে বিষয়েও তার পরিবার কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।

মৃত্যুর পর ওই বাড়িতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়েছে কি না, তা নিয়েও ভক্তকূলের কৌতুহলের শেষ নেই।
এসব প্রশ্নের উত্তরে রাইমা বলেন, “বাড়ি বা তার ঘর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়।"
১৯৩১ সালে পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার হেমসাগর লেনে করুনাময় দাশগুপ্ত আর ইন্দিরা দাশগুপ্তের পরিবারে জন্ম হয় রমা দাশগুপ্তের। শৈশব-কৈশোরের অনেকটা সময় পাবনার আলো-হাওয়াতেই কেটেছে রমার। রমা পাবনার মহাখালী পাঠশালার পাঠ শেষ করে পা দেন পাবনা গার্লস স্কুলে; দশম শ্রেণি পর্যন্ত সেখানেই।
এরপর দেশভাগ আর দাঙ্গার শিকার হয়ে আরো অনেক হিন্দু পরিবারের মতো রমার পরিবারও পাড়ি জমায় কলকাতায়। সেটা ১৯৪৭ সালের কথা। ওই বছরেই কলকাতায় থিতু হওয়া ঢাকার আরেক সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের ছেলে দিবানাথ সেনের সঙ্গে বিয়ে হয় রমার।

শ্বশুরের আগ্রহ আর স্বামীর উৎসাহে রূপালী জগতে নাম লেখানো রমা হয়ে যান সুচিত্রা সেন।
উত্তমের সঙ্গে প্রথম সিনেমাই ‘সুপারহিট’
চলচ্চিত্রে সুচিত্রার শুরুটা হয়েছিল ১৯৫২ সালে, ‘শেষ কোথায়’ সিনেমার মধ্য দিয়ে, যদিও সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। পরের বছর উত্তম কুমারের সঙ্গে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ সিনেমাতেই ‘সুপারহিট’।
১৯৫৫ সালে বিমল রায়ের পরিচালনায় হিন্দি ‘দেবদাস’ সিনেমায় দীলিপ কুমারের বিপরীতে অভিনয়ের সুযোগ পান সুচিত্রা। ‘পার্বতী’ চরিত্রে তার অভিনয়ে বিমোহিত হয় দর্শক। এ সিনেমা তাকে এনে দেয় জাতীয় পুরস্কার।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি সুচিত্রাকে। একে একে অভিনয় করেন শাপমোচন, সাগরিকা, পথে হলো দেরি, দীপ জ্বেলে যাই, সবার উপরে, সাত পাকে বাঁধা, দত্তা, গৃহদাহ, রাজলক্ষ্মী-শ্রীকান্তর মতো দর্শকপ্রিয় সব ছবিতে।
ক্যারিয়ারের মধ্যগগণে এসে ‘আঁধি’ সিনেমায় রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান সুচিত্রা।
ততোদিনে রোমান্টিক নায়িকা হিসেবে সুচিত্রা সেন বাঙালি দর্শকের হৃদয়ের মনিকোঠায় ঠাঁই করে নিয়েছেন। কিন্তু পলিটিক্যাল-রোমান্টিক সিনেমা 'আঁধি'তেও সুচিত্রা ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। মূলত ছবির কাহিনী গড়ে উঠেছিল বিহারের রাজনীতিক তারকেশ্বরী সিনহার জীবনী অবলম্বনে। কিন্তু সুচিত্রা সেন পর্দায় হাজির হয়েছিলেন ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ‘স্টাইল’ নিয়ে। চলচ্চিত্রটির কয়েকটি দৃশ্য নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে মুক্তি দেওয়ার ২০ সপ্তাহ পরে 'নিষিদ্ধ' হয় আঁধি।

‘সাত পাকে বাঁধা’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ১৯৬৩ সালে ‘মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভালে’ সেরা অভিনেত্রীর সম্মান পান সুচিত্রা। ভারতীয় কোনো অভিনেত্রীর জন্য সেটিই ছিল বড় মাপের প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
তিনি ভারত সরকারের পদ্মশ্রী পুরস্কার পান ১৯৭২ সালে; ২০১২ সালে পান পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ পুরস্কার বঙ্গবিভূষণ।
দুই যুগের অভিনয় জীবনে বাংলা ও হিন্দি মিলিয়ে ৬০টির বেশি সিনেমায় অভিনয় করেন সুচিত্রা।

চলচ্চিত্রে অধিকাংশ সময়ই সুচিত্রার সহঅভিনেতা ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমার। উত্তম-সুচিত্রা জুটি ছাড়া সে সময় কোনো ছবি ‘হিট’ হবে, এটা ভাবা নির্মাতাদের জন্য কঠিন হত।
সব শেষ ১৯৭৮ সালে ‘প্রণয় পাশা’ ছবিতে অভিনয় করেন। এরপর আকস্মিকভাবেই চলে যান লোকচক্ষুর অন্তরালে।
এরপর প্রথম তিনি আড়াল ছেড়ে বাইরে আসেন মহানায়ক উত্তমকুমারের মৃত্যুর পর। মাঝরাত পর্যন্ত বসে ছিলেন তার মরদেহের পাশে। সুচিত্রা শেষ জনসম্মুখে আসেন ১৯৮৯ সালে, তার গুরু ভরত মহারাজের মৃত্যুর পর।
২০০৫ সালে সুচিত্রাকে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হলেও ভারতের রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কার নিতে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দিল্লি যেতে রাজি হননি তিনি।
অভিনয় জীবনের পুরোটা সময় জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা মানুষটি ছিলেন তার নিজের এবং পরের দুটি প্রজন্মের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। তার অন্তরালের জীবন নিয়েও কৌতূহলের অন্ত ছিল না।
কিন্তু নিজের পারিবারিক ও অন্তরালের জীবন নিয়ে কঠোর গোপনীয়তা মেনে চলেছেন সুচিত্রা। শুধু তিনিই নন, তার মেয়ে চিত্রনায়িকা মুনমুন সেন, হালের নায়িকা দুই নাতনি রিয়া ও রাইমা সেনও কখনো মুখ খোলেননি।
একান্ত ব্যক্তিগত চিকিৎসক, হাসপাতালের নার্স, পত্রিকার সাংবাদিক কেউ তার অন্তরালে থাকা নিয়ে বাড়াবাড়ি করেননি কখনো।
স্বেচ্ছা নির্বাসনের বেশিরভাগ সময়ই তার কাটত রামকৃষ্ণ মিশনের সেবায়।
এরপর সরকারের পরিচয়পত্র তৈরির সময় ছবি তোলার জন্য কেন্দ্রে আসেন সুচিত্রা সেন। কিন্তু সে কাজটিও খুব গোপনে সেরে চলে যান তিনি।
একবার কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা সুচিত্রার অন্তরালের ছবি ছাপালে বিষয়টি আদালতে গড়ায়।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে তার কক্ষটিও ছিল কঠোর গোপনীয়তার ঘেরাটোপের মধ্যে।

সুচিত্রার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানও ছিল গোপনীয়তায় ঘেরা। সাংবাদিক বা সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সেখানে ছিল না। কেবল নিকট আত্মীয়, টালিগঞ্জের চলচ্চিত্রজগতের কয়েকজন তারকা এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতার উপস্থিতিতেই শেষ হয় আনুষ্ঠানিকতা। দূর থেকে ছবি তুলেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় আলোকচিত্রীদের।