Published : 30 Mar 2026, 04:44 PM
দীর্ঘক্ষণ ‘পানিতে ডুবে থাকায়’ মৃত্যু হয়েছে কলকাতার অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। যদিও ঘটনাস্থলের একাধিক বয়ান বলছে, দুর্ঘটনার পর খুব দ্রুত উদ্ধার করা হয়েছিল রাহুলকে।
একটি ধারাবাহিকের শুটিং করতে গিয়ে রোববার পশ্চিমবঙ্গের দিঘাসংলগ্ন তালসারি সমুদ্রসৈকতে পানিতে নেমে তলিয়ে যান রাহুল। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে, চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
কলকাতার সংবাদমাধ্যম 'দ্য ওয়াল' লিখেছে, দীঘার অদূরেই তমলুক হাসপাতালে রাহুলের মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে।
তমলুক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ 'দ্য ওয়াল'কে বলেছে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “জলে ডুবেই মৃত্যু হয়েছে অভিনেতার। তার ফুসফুসের ভেতরে অস্বাভাবিক পরিমাণে পাওয়া গিয়েছে বালি এবং নোনা জল। তার খাদ্যনালী, শ্বাসনালী, পাকস্থলীর ভেতরেও বালি ঢুকে যায়। ফুসফুস ফুলে দ্বিগুণ হয়ে যায়।
“অল্প সময় নয়, বরং দীর্ঘক্ষণ ধরে জলের তলায় ডুবে থাকলে এমন হয়।”
চিকিৎসকদের ভাষ্য, অভিনেতা পানির নিচে অন্তত ঘণ্টাখানেক ডুবে ছিলেন; পরে ভিসেরা পরীক্ষা করা হবে।
চিকিৎসকের একাংশ আরও জানিয়েছে, এই ধরনের শারীরিক অবস্থা ইঙ্গিত দেয় দুর্ঘটনার পর রাহুলকে দ্রুত উদ্ধার সম্ভব হয়নি।
রাহুলের শরীর থেকে ভিসেরা সংগ্রহ করা হয়েছে। তা পাঠানো হয়েছে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য। তার শরীরে অ্যালকোহলের উপস্থিতি ছিল কী না, সেটাও এখন পরীক্ষাধীন। যদিও প্রাথমিক রিপোর্টে সেই বিষয়ে নিশ্চিত কিছু বলা হয়নি, তবু তদন্তকারীরা কোনও সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
কলকাতার বাংলা দৈনিক ‘আনন্দবাজার’ লিখেছে, ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিংয়ের ক্যামেরার ভিডিও জব্দ করেছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, যে ক্যামেরায় রাহুলদের ধারাবাহিকের শুটিং চলছিল, সেটি তদন্তের জন্য নিয়ে নেওয়া হয়েছে। রাহুলের মৃত্যুর আগের কয়েকটি মুহূর্ত ধরা আছে সেই ক্যামেরাতেই।
ময়নাতদন্তের পরই অভিনেতার মরদেহ নিয়ে আসা হয় তার কলকাতায় বিজয়গড়ের বাড়িতে।
রাহুলের বাড়ি সংলগ্ন ‘ভোলা বসু ভবনে’ তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হবে।
রাহুলকে উদ্ধারে যা বলছে শুটিং টিম
পশ্চিমবঙ্গের দিঘাসংলগ্ন তালসারি সমুদ্রসৈকতে রোববার রাহুলের মৃত্যুর আগে-পরে কী কী ঘটেছিল তা নিয়ে কলকাতার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নানা ধরনের খবর আসছে।
রাহুলের মৃত্যু নিয়ে কথা বলেছেন পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল। তিনি ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকটি তৈরি করছেন। এই ধারাবাহিকের মূল চরিত্রে অভিনয় করছিলেন রাহুল।
রোববার তালসারিতে নাটকের শুটিং ছিল। বিকালে সমুদ্রে নামেন রাহুল। কিন্তু আচমকাই তলিয়ে যান তিনি।
সেই ঘটনা বর্ণনা করে শুভাশিস বলেন, “আমরা এখানে শনিবারও শুট করেছি। রোববার একটা শট ছিল তালসারিতে। গোড়ালি ডোবা জলে দাঁড়িয়েছিল শ্বেতা, রাহুলদা। শ্বেতা-রাহুলদা নিজেদের মধ্যে জল ছোড়াছুড়ি করছিল, লুকোচুরি খেলছিল। আমরা পিছন দিক থেকে ক্যামেরা করছিলাম। সেটা করতে করতে রাহুলদা শ্বেতার হাত ধরে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। প্রায় হাঁটু পর্যন্ত জলে পৌঁছে ও একটু ডিসব্যালান্সড হয়ে যায়।
“আমরা ঠিৎকার করে দূরে যেতে বারণ করি। ততক্ষণে জল রাহুলদার গলা পর্যন্ত উঠে এসেছে। হাবুডুবু খাওয়ার মতো অবস্থা। সব ফেলে ইউনিটের ১০-১২ জন ওর দিকে এগিয়েও যাই। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে ও তলিয়ে যেতে থাকে। সম্ভবত অনেকটা জলও খেয়ে ফেলেছিল।”
পরিচালক শুভাশিস বলেন, আশপাশে যে নৌকাগুলি থাকে সেখান থেকে দড়ি ফেলে, ইউনিটের সবাই তড়িঘড়ি ছুটে গিয়ে রাহুলকে তুলে আনেন।
তখনও রাহুলের জ্ঞান ছিল। তার পর দ্রুত দিঘা মহকুমা হাসপাতালে নিয়েও যাওয়া হয় তাকে। কিন্তু সেখানেই চিকিৎসকরা রাহুলকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
শুটিং ইউনিটের একজন কলকাতার বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার কাছে বলেছেন, তাদের সেদিনের শুটিং শেষ হয়ে গিয়েছিল।
তার পর একাই সমুদ্রের পানিতে নামেন রাহুল। তার সহ-অভিনেত্রী শ্বেতা মিশ্রও ছিলেন সেখানে। তবে তিনি সৈকতেই দাঁড়িয়েছিলেন।
ইউনিটের এক ব্যক্তি বলেন, “জলের তলায় নাকি রাহুলের পা আটকে যায় বালিতে। আর তখনই ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে। রাহুল সেই ঢেউ সামলাতে না পেরে ডুবে যেতে থাকেন। বিপদ বুঝতে পেরে শ্বেতা ‘রাহুলদা ডুবে যাচ্ছে’ বলে চিৎকার করে সবাইকে একজোট করার চেষ্টা করেন।”
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী অভিনেতা দিগন্ত বাগচীর কথায়, “হয় ও সাঁতার জানত না, বা কোনো ভাবে আটকে পড়েছিল। হঠাৎ টেকনিশিয়নরা চিৎকার করতে করতে বলেন, ‘রাহুলদা ডুবে যাচ্ছে’। যখন উদ্ধার করা হয়, তখনও বেঁচে ছিলেন রাহুল।’’
রাহুলের গাড়িরচালক বলেন, ‘‘রাহুলদা সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি বার বার বারণ করছিলাম। শোনেনি আমার কথা।’’
শুটিং ইউনিটের ম্যানেজার চন্দ্রশেখর চক্রবর্তী রাহুলকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
চন্দ্রশেখর বলেন, “ওকে গাড়িতে তোলার পর আমি সামনে উঠলাম। লাল কাপড় নাড়াতে নাড়াতে হাসপাতাল পৌঁছোই। শহরে ঢোকার পর থেকেই যানজটের জন্য দেরি হয়ে যায়। রাস্তায় যেতে যেতে রাহুলের বুকে হাত বোলাচ্ছিল আমাদেরই টেকনিশিয়ানরা। যদি বাঁচানো যায়, সেই আশায়। প্রচণ্ড হাঁপাচ্ছিল রাহুল।’
“হাসপাতালে যাওয়ার পথেই সম্ভবত হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন রাহুল। ওই ২০-২২ মিনিটের মধ্যেই মারা যান তিনি।”
আরও পড়ুন: