Published : 25 Sep 2025, 10:06 PM
ফরিদা পারভীনের মৃত্যুর পর তার স্বামী বংশীবাদক গাজী আবদুল হাকিম ভেবেছিলেন, তিনি আর বাঁশি বাজাবেন না। পরে স্বজনদের অনুরোধে তিনি আবার বাঁশি বাজানো শুরু করেন।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে এক অনুষ্ঠানে বাঁশি বাজিয়েই ফরিদার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানালেন আবদুল হাকিম। তিনি বললেন, "ফরিদার গানের স্কুল 'অচিন পাখী' যেন বন্ধ না হয়ে যায়। অসুরের কাছে সুর যেন হেরে না যায়।"

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে 'শ্রদ্ধায় স্মরণে ফরিদা পারভীন' শিরোনামে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করে সাংস্কৃতিক ইউনিয়ন।
অনুষ্ঠানে গাজী আবদুল হাকিম বলেন, "আমি ভেবেছিলাম, আমি আর বাঁশি বাজাব না। হয়ত একা একা বাঁশি বাজাব। কিন্তু অন্য কারো সাথে আর বাঁশি বাজাব না। পরে আমার স্বজনদের অনেকে আমাকে বলেছেন, যে সুরের জন্য এত সংগ্রাম করতে হয়েছে, সেই সুরকে কেন থামাব?"
ফরিদা পারভীনকে স্মরণ করে লালন ফকিরের কালজয়ী 'সময় গেলে সাধন হবে না' গানটি বাঁশিতে শোনান গাজী আবদুল হাকিম।
তিনি বলেন, "ফরিদা পারভীন অচিন পাখি নামে যে স্কুলটি করেছেন, সেই স্কুলটি বাঁচানোর জন্য আপনারা দোয়া করবেন। এটি যেন কোনোদিন বন্ধ না হয়ে যায়।"
ঢাকার তেজকুনি পাড়ার হোন্ডার গলিতে একটি ভাড়া বাড়িতে ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশন 'অচিন পাখি সংগীত একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা পায় ১৬ বছর আগে। ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে লালনের গানের যে চর্চা হয়ে এসেছে গেল পাঁচ দশক ধরে, সেটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে তিনি এই প্রতিষ্ঠান তিলে তিলে গড়ে তোলেন।
গাজী আবদুল হাকিম বলেন, "স্কুলটি বন্ধ হয়ে অসুর যেন জয়ী না হয়। এই স্কুলটি ফরিদা পারভীনের শেষ ইচ্ছা-বাসনা ছিল। এই স্কুলে সে ছেলেমেয়েদের সুরের শিক্ষা দিত।"
"ফরিদা পারভীন সারাজীবন গানের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। সাঁইজির কালামের জন্য তাকে কত অপবাদ সহ্য করতে হয়েছে। একেবারে সাধারণ জীবনযাপন করতেন। যারা বাংলা কথা বোঝে না, তারাও ফরিদা পারভীনের গান শুনে মুগ্ধ হতেন।"

সংগীত শিল্পী ও বাউল গবেষক অরূপ রাহী বলেন, "ফরিদা পারভীন বাংলা গানের সেই ধারার মহান শিল্পী, যেই ধারা কেবল বাংলাদেশ বা ভারতবর্ষ নয়, সারা দুনিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মানুষে মানুষে ভক্তি-শ্রদ্ধার পৃথিবী কিভাবে পেতে পারি, সংগীতের সেই ধারাকে ফরিদা পারভীন সারা দুনিয়ায় বয়ে বেড়ালেন।"
পুঁজিবাদী এই কালে এখন গানও পণ্য হয়ে গেছে মন্তব্য করে অরূপ রাহী বলেন, "এখন গান টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গান তো বিক্রিযোগ্য বিষয় না। এই সময়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গানকে বয়ে নেওয়া সহজ কাজ না। ফরিদা পারভীন সেই নিষ্ঠা নিয়ে গানকে তিনি বয়ে নিয়ে গেছেন।"
অনুষ্ঠানে ফরিদা পারভীনের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় সাংস্কৃতিক ইউনিয়ন, ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টসহ বিভিন্ন সংগঠন।
অনুষ্ঠানে আয়োজক সংগঠন সাংস্কৃতিক ইউনিয়নের সভাপতি মাহাবুব খালাসী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "ফরিদা পারভীনের মত গুণী শিল্পীকে সম্মান জানাতেই আমরা এই স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি।"

আয়োজকেরা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, "যে রাষ্ট্রে প্রকাশ্যে, দিবালোকে মসজিদের মাইক ব্যবহার করে উসকানি দিয়ে ভাঙা যায় মাজার, 'অনৈসলামিক' আখ্যা দিয়ে নারায়ণগঞ্জসহ বহু জায়গায় হুমকির মুখে বন্ধ করে দেওয়া যায় লালনের মেলা, সে রাষ্ট্রে বা তার তল্পিবাহকরা কেন ফরিদা পারভীনকে স্মরণ করার উদ্যোগ নিচ্ছে না এই প্রশ্ন করাই বোকামি। তাদের বরং আদিখ্যেতা না করার জন্য ধন্যবাদ।
"এই অঞ্চলের মাটির সংস্কৃতি ধরে রাখা যাদের কাজ তারা এখন আর শুধু প্রতিবাদে না, পুনর্গঠনে থাকবে। ফরিদা পারভীনকে স্মরণ করার প্রথম বড় উদ্যোগ যে সাংস্কৃতিক ইউনিয়ন নিয়েছিল অনাগতকালের জন্য সেটাও ইতিহাস হয়ে থাকবে।"
অনুষ্ঠানে গান শোনান পাগলা বাবুল, অরূপ রাহী, ডলি মন্ডল, এলিজা পুতুল, আকাশ দেওয়ান, আবু রাশেদসহ অনেকে। যন্ত্রশিল্পী হিসেবে ছিলেন- শ্যামল আহমেদ সজল (ঢোল), মোহাম্মদ বিল্লাল (বাঁশি)।