Published : 12 Jan 2026, 05:25 PM
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত প্রকল্প না পাওয়ায় এবং সরকারের ধীরে চলা নীতিতে বাস্তবায়ন গতি মন্থর হওয়ায় চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বড় অঙ্কের কাটছাঁট করা হয়েছে।
অর্থবছরের অর্ধেকের মাথায় এসে টাকার অঙ্কে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৩ দশমিক ০৪ শতাংশ।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতায় এসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত জুনে তার একমাত্র বাজেট দেয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া উন্নয়ন নীতিতে কাটছাঁট করে চলতি অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এডিপি নির্ধারণ করা হয়। জানুয়ারিতে এসে কাটছাঁটের পর সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়াল ২ লাখ কোটি টাকায়।
সবচেয়ে বড় কোপ পড়েছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বরাদ্দে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ কমেছে ৭৩ শতাংশ; আর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় কমেছে ৫৫ শতাংশ।
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় সংশোধিত এডিপি (আরএডিপি) অনুমোদন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
পরে ব্রিফিংয়ে এসে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, "এমনিতেই মূল এডিপি যেটা ছিল, সেটাকেই কম ধরা হয়েছিল। অনেক বছরের মধ্যে মূল এডিপি তার আগের বছরের চেয়ে কম ছিল ২০২৩-২৪ সালে। সেখানেও বাস্তবায়ন হার কম ছিল বলে আমরা এ বছরের মূল এডিপি ধরেছিলাম ২ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা।”
তিনি বলেন, "এখন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে যে চাহিদা এসেছে, সেই চাহিদা পূরণ করার পরও কিছু বাকি রয়ে গেছে, তাই না? আসলে রাজনৈতিক সরকারের আমলে যেমন অসংখ্য প্রকল্পের ভিড় থাকে, আমাদের সময়ে প্রকল্প বরং চেয়ে চেয়ে আনতে হয়। প্রকল্পের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
“সেক্ষেত্রে আমরা প্রকল্পগুলো, যেগুলো একদমই গ্রহণযোগ্য না, সেগুলো বাদ দিয়ে বাকি প্রকল্পগুলো সব গ্রহণ করার পরও কিছু থোক বরাদ্দ রয়ে গেছে এবং সেগুলো মিলিয়ে আমাদের এখন যে... ২ লাখ আরএডিপি ২ লাখ কোটি টাকায়।"
২০২৪-২৫ অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৮১ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। তার চেয়ে ৩৫ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা কমিয়ে চলতি অর্থবছরের বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয় ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা।
উন্নয়ন ব্যয় কামানোর মধ্যে শুধু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) খাতেই চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে কমেছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। আর সংশোধিত এডিপির চেয়ে কমেছে ১৪ হাজার কোটি টাকা।
বিদায়ী অর্থবছরে এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। সংশোধন করে তা ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়।
চলতি অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এখন সংশোধনে তা ৩০ হাজার কোটি টাকা কমে ২ লাখ কোটি টাকা।
আর স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান বা কর্পোরেশনের প্রকল্প ধরে এর আকার দাঁড়ায় ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাঁচ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে টাকার অঙ্কে ১ লাখ ২১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৬০ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
পরিবহন ও যোগাযোগ; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি; গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধাবলী; শিক্ষা ও স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নে রয়েছে এ বরাদ্দ।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, “খাতওয়ারিভাবে একদম পুরো আমরা বলতে চাই না, কারণ এগুলো পরে যখন বাজেট ঘোষণা হবে, তখন বলা হবে। তবে আমি এমনিতে দেখছি, আমার নিজের জানার জন্যই আমি দেখছিলাম যে কিছু কিছু মন্ত্রণালয় যারা সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পায়, সেগুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ যেমন। এটা যা এডিপিতে মূল বরাদ্দ ছিল তা থেকে তো কমানো হয়নি বরং তার থেকেও কিছু বাড়ানো হয়েছে।
“…মহাসড়ক আর সড়ক যেগুলোর রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজ-এর সেগুলো আবার জমি অধিগ্রহণ এসব কিছু আছে এসবের কারণে তারা মূল বরাদ্দ থেকে বেশ কমানো হয়েছে। অন্য বিদ্যুৎ বিভাগ সামান্য, যা ১৫ শতাংশ, ওরকমই কমানো হয়েছে; বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কমাতে হয়নি, আগের মতই আছে।”
আবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১১ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ কমিয়ে ৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা খাতের ১৩ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ ৬ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে বলে জানান উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “এগুলোই উল্লেখযোগ্য ছিল; মানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেশি কমেছে এই রিভাইজড বাজেটে। আর স্থানীয় সরকার আর পল্লী উন্নয়নে রিভাইজড বাজেটে বরাদ্দ থেকেও অরিজিনাল বরাদ্দ থেকেও বেশি বেড়েছে।”
বরাদ্দ কমল মেট্রোরেল প্রকল্পেও
উপদেষ্টা বলেন, মেট্রো রেলের এমআরটি-৬ প্রকল্পের মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের বরাদ্দও ‘২-৩ হাজার কোটি টাকা’ কমানো হয়েছে।
“কেন প্রকল্পগুলো আগে এত বেশি থাকে, এবং দেখলেই কেন কমানো যায়, আমি জানি না।”
তিনি বলেন, মেট্রোরেলের অন্যান্য লাইন করার ক্ষেত্রে বিদেশি ঋণ সহায়তা নিশ্চিত হলেও পরের সরকার যাতে এসব বিষয় বিবেচনা করে, সেজন্য মতামত দিয়ে রাখা হয়েছে।
“এখন এই সবগুলো লাইন একত্রে শুরু করলে সারা ঢাকাতে যে কাটাছেঁড়া করতে হবে, আন্ডারগ্রাউন্ডে সব ইউটিলিটি বদলাতে হয়, তারপরে উপরে সব আটকাতে হয়, এখান থেকে ওখান থেকে এটা করতে হয়—এই এক মেট্রোরেল করার সময় তো দেখা গেছে।
“আমার মতামত যেটা লিখে রেখেছি, আগামী সরকার সেটা বিবেচনা করবে, সেটা হল, ঢাকা শহরে কতগুলো মেট্রোরেল আসলে প্রয়োজন হবে? এগুলো কখন কোনটা শুরু করা হবে? এবং যেগুলো চালু হয়েছে বা এখন তৈরি হচ্ছে, সেগুলোতে আমাদের অভিজ্ঞতা কী? এগুলো একটু মূল্যায়ন না করে হঠাৎ করে একত্রে সব প্রকল্প শুরু করে দেওয়া খুব সমীচীন ব্যাপার না।”
‘রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় মন্দা’
দেশে বিনিয়োগে খরা ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণ হিসেবে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ‘রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে’ চিহ্নিত করেছেন।
তিনি বলেন, “এডিপির আকার ছোট হয়েছে বলেই যে অর্থনীতির যে মন্দাভাব একটু দেখা যাচ্ছে, সেটা যে শুধু এই কারণেই তা না, অর্থনীতির মন্দাভাব দেখা যাচ্ছে যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে, যে কারণে বিনিয়োগ হচ্ছে না। বিনিয়োগ যদি হত, তাহলে এই এডিপি ছোট হলেও কোনো অসুবিধা হত না। বিনিয়োগ বাড়লে এমনিতেই অনেক কর্মসংস্থান বাড়তে পারত।
“একমাত্র আমাদের যেটা সুবিধা হয়েছে, আগের থেকে এখন অনেক বেশি রেমিটেন্স বিদেশ থেকে আসছে।… এই রেমিটেন্সগুলো সবই যায় গ্রামে…।”
তবে যেসব জায়গায় রেমিটেন্স যাচ্ছে, সেখানে দোকানপাট, বাড়িঘর তৈরি হলেও দারিদ্র্য যে সেই অর্থে কমে না, সে কথাও উপদেষ্টা বলেন।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণের যে সুদ হার, তাকে বিনিয়োগে ‘সবচেয়ে বড় বাধা’ হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।
‘অনানুষ্ঠানিক’ অর্থনৈতিক ক্যাডার
আগের মত অর্থনৈতিক ক্যাডার না থাকায় এখন অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়ন বিষয়ক পদায়নে জনপ্রশাসনের যে কোনো কর্মকর্তারা নিয়োগ পাচ্ছেন। এর পরিবর্তে যাদের অর্থনীতি, পরিসংখ্যান, প্রকল্প, উন্নয়ন বিষয়ক ডিপ্লোমা, মাস্টার্স বা পিইচডি থাকবে, তাদেরকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা সেল ও প্রকল্প পরিচালক পদে দায়িত্ব দেওয়ার বিধান সোমবারের সভায় পাস হয়েছে বলে জানান পরিকল্পনা উপদেষ্টা।
প্রকল্পের গুণগত মান এবং ঠিক সময়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ঠিক করা ‘একটি বড় সমস্যা’ মন্তব্য করে উপদেষ্টা বলেন, সেজন্য একটি ‘পিডি পুল’ করা হয়েছে। যখনই কোনো নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে, ওই পুল থেকে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে।
“এটাকে ক্যাডার বলবা না, এটাকে অনানুষ্ঠানিক ক্যাডার—একটা চিহ্ন দিয়ে রাখা, যাতে করে পিডি পুল এবং এই অর্থনৈতিক বিষয়ক পদগুলোতে তাদেরকে পাওয়া যায়।
“এটা আমি এতদিন ধরে এটা নিয়ে চিন্তা করছিলাম। কিন্তু এটা পাস করতে হলে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পাস করতে হয়, সেজন্য আজকের ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলের মাধ্যমে পাস করা হল; কাজেই এটা বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে।”