Published : 12 Jun 2026, 02:33 AM
বাজেটের আকার না বাড়িয়ে বিএনপির নতুন সরকারের উপায় ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতির বিশ্লেষক পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ।
তবে এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি আছে বলেও মনে করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ‘কেমন হল বাজেট’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে মাসরুর রিয়াজ এ মন্তব্য করেন।
এদিন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন। নতুন অর্থবছরের জন্য তিনি ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছেন, যাতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
অন্তর্বর্তী সরকারের ঘটনাবহুল দেড় বছর পেরিয়ে ১২ ফ্রেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। প্রায় দুই দশক পর তারেক রহমানে নেতৃত্বে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে দলটি।
বিশ্লেষক মাসরুর রিজাজ বাজেটের নানা দিক নিয়ে আলোচনার করার সময় সরকার গঠনের পর কম সময়ের মধ্যে বাজেট দেওয়ার প্রসঙ্গও টানেন।
আলোচনার শুরুতেই মাসরুর রিয়াজ বলেন, “বাজেটের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট আছে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট হল, অনেক দিন পর একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। মাত্র তিন মাস ২০ দিনের মধ্যেই বাজেট দিতে হচ্ছে। রাজনৈতিক সরকার যখন আসে, ভোটারদের আশা-প্রত্যাশা বেড়ে যায়।”
বাজেটের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, “অত্যন্ত দুরূহ একটি ‘ইকোনমিক কন্ডিশনে’ এ বাজেট আসছে। কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আমাদের চলছে। একদিকে আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি খুবই দুর্বল এবং সেখানে মুদ্রাস্ফীতি দিন দিন বাড়ছে।
“দ্বিতীয়ত, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিগুলো—বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, রপ্তানি এবং এগুলো থেকে কর্মসংস্থান, যা উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যায়—সবকিছুই নিম্নমুখী।”
এই বিশ্লেষক বলছিলেন, “অন্য একটি বিষয় হল, অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারের যে আর্থিক সক্ষমতা, সেটিও খুব সংকুচিত। এমন একটি জায়গায় বাজেট আসছে। সুতরাং সরকারের জন্য বিষয়টি সহজ ছিল না।
“একদিকে মাত্র তিন মাস ২০ দিনের মধ্যে বাজেট দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে জনগণের প্রত্যাশা। বড় বিজয় নিয়ে সরকার এসেছে, তার সঙ্গে প্রত্যাশাও বড়। আর অন্যদিকে অর্থনীতির মহাচ্যালেঞ্জ। সে জায়গা থেকে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুসারে বাজেট বড় হওয়ারই কথা, তবে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুসারে অনুসারে বড় হওয়ার ঝুঁকি আছে, বিশেষ করে ‘ইনফ্লেশন রিস্ক’।”
মাসরুর রিয়াজের ভাষায়, “এ মুহূর্তে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, এমনিতেই উর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির প্রবণতা আছে, এটি সর্বগ্রাসী। একদিকে জনগণের কষ্ট, ব্যবসার জন্য কষ্ট, কারণ অর্থায়নের জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খরচ করতে হচ্ছে।
“অন্যদিকে বাজারে চাহিদা পড়ে গেছে। ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, দাম বেড়েছে। ব্যবসার ‘আউটপুট’ কমিয়ে রাখতে হচ্ছে।”
তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতিকে রক্ষণাত্মক রাখতে হচ্ছে, যাতে বাজারে নগদ টাকা বেশি প্রবেশ না করে। সে সঙ্গে আয়-ব্যয়ের নীতিকেও সমন্বয় করতে হয়। এই নীতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হল বাজেট।
এই বিশ্লেষকের মতে, “বাজেট যদি বিনা কারণে বা ছোট ছোট কারণে অতিমাত্রায় বেড়ে যায়, তার আকার যদি অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি পায়, তাহলে মুদ্রানীতির মাধ্যমে আমরা যে অবস্থান নিয়েছি, সেটার জন্য তা ‘কাউন্টার-প্রোডাক্টিভ’ হয়ে যায়।
“সেই জন্যই বাজেটের আকার নিয়ে কথা আসছে বা প্রশ্ন আসছে। বাজেটের আকার হয়ত কিছু বাড়াতেই হতো। এটা না বাড়িয়ে রাজনৈতিক সরকারের উপায় ছিল না। কিন্তু কত বাড়ালে ঠিক হতো, সেটা বোধহয় আলোচনা বা বিশ্লেষণের দাবিদার।”

সরকারের আসলে কী করা উচিত, এমন প্রশ্নের উত্তরে মাসরুর রিয়াজ বলেন, সরকারের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় আর্থিক শৃঙ্খলা খুবই দুর্বল অবস্থায় চলে গেছে।
“এবং এটা কিন্তু আনফরচুনেট নতুন সরকারকে এগুলো মোকাবেলা করতে হচ্ছে; এর কোনোটাই কিন্তু তাদের কারণে শুরু হয় নাই। এগুলো সবগুলোই তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এটার সিঙ্গেল কোনো সলিউশন নাই। এটার ইন্টিগ্রেটেড মানে সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। এখন সেখানে প্রায়োরোটাইজের ব্যাপার আছে। সমন্বিত ব্যবস্থায় আমি সাতটা জায়গার কথা বলি বা ছয়টা।
“তার পরও বলছি এর মধ্যে প্রায়োরিটি কোথায়? একটা হলো ম্যাক্রোতে ইনফ্লেশান কমানো এবং ফরেন রিজার্ভ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ৩০ থেকে ৩৫ থেকে ৩৮, সেই জায়গাটাই যেতে পারি। এক বছরের মধ্যে না হলেও দুই বছরের মধ্যে যাতে আমরা সিক্স পারসেন্ট গ্রোথের দিকে যেতে পারি।“
তিনি বলেন, “আমাদের হিস্টরিকাল গ্রোথ যদি দেখেন ’৯০-এর দশকের পর থেকে এভারেজ কিন্তু আমরা সাড়ে পাঁচ- ছয় পার্সেন্ট গ্রোথে ছিলাম। সেকেন্ড হলো আমার বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ ছাড়া এমপ্লয়মেন্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নাই।
“বিনিয়োগ বাড়াতে গেলে বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে আজকের বাজেটে বলা আছে কিছু জিনিস। আমাদের একচুয়াল ইমপ্লিমেন্টেশন দরকার এখন। আইনের মডার্নাইজেশন রেড টেপ আছে, যেখানে সেগুলোকে এলিমিনেট করা, রেগুলেটরি মডার্নাইজেশন।“
মাসরুর রিয়াজ বলেন, “তৃতীয়ত হলো এক্সপোর্টে বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এনার্জির জন্য তো হচ্ছেই, অনেক সেক্টরে আটু ফিফটি পার্সেন্ট আউটপুট কমে গিয়েছে এনার্জির কারণে। গ্লোবালিও এক্সপোর্ট মার্কেটে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছি। জিও পলিটিক্যাল টেনশন বাড়ছে।
“এই যে ফোর্স লেবারের জন্য ইউএসটিআর ইনভেস্টিশগেশন করে বলেছে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশ আছে; কারো জন্য ১০% কারো জন্য ১২% (শুল্ক) বাড়াবে। এগুলো তো আসলে জিও পলিটিকাল ফ্র্যাকচারের একটা রেজাল্ট। তার সাথে ট্রেড প্রটেকশন যেটা ট্রাম্প ট্যারিফ বা রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ সেটা বাড়ছে।”
তিনি বলেন, “কমপ্লায়েন্স রিকয়ারমেন্ট বাড়ছে। সেটা হলো ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন তারপর বিভিন্ন পারচেজিং ডেস্টিনেশন কান্ট্রি এবং বিভিন্ন কোম্পানি এইচএনএমের মতো। তারা বলছে, এনার্জি অ্যাপ্রিসিয়ান্সি না বাড়ালে রিসাইকেল ম্যাটেরিয়াল না বাড়ালে লেবার এবং হিউম্যান রাইটস সাপ্লাইন চেইনে যদি এনশিউর না করেন, তাহলে এক্সপোর্ট করতে পারবেন না।
“মার্কেটে অ্যাকসেস থাকবে না। সেইটা যদি আমি না করতে পারি উইথ অর উইথআউট এলডিসি, এটা হতে যাচ্ছে। আর এলডিসির জন্য তো সেটা আছে; আমরা আশা করি, দুই বা তিন বছর পেছানোর একটা ইয়ে পাব।”

পরামর্শ দিয়ে মাসরুর রিয়াজ বলেন, “এক্সপোর্টের সাসটেইনেবিলিটি আমরা চাই, সেটা ঠিক করতে হবে। এনার্জি আমরা বলেছি, সেখানে পাওয়ার অ্যাকসেস ক্যাপাসিটি আছে; কিন্তু কস্ট যেটা আমরা সাসটেইন করতে পারছি না।
“আবার পাওয়ারের যে প্রাইমারি এনার্জি, এটা গ্যাসভিত্তিক এবং তার গ্যাস ইমপোর্ট করতে হয়। ওটাও সাসটেইন করতে পারছি না। রিনিউয়েবল পাওয়ার প্রয়োজন।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রশ্ন ছিল, মুদ্রাস্ফীতির কারণে সীমিত আয়ের মানুষ ভুগছে। বাজেটে এ বোঝা কমানোর পদক্ষেপ কতটা নেওয়া হয়েছে?
জবাবে বিশ্লেষক মাসরুর রিয়াজ বলেন, “বেশ কয়েকটা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তবে আরো কয়েকটা কৌশলী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল। …ট্যাক্স-অন ইন এভারেজ আমরা দেখছি দু-এক জায়গায় বেড়েছে। বেশিরভাগ জায়গায় আমরা দেখেছি নতুন ট্যাক্স, বাট ট্যাক্সের হার বাড়ানো বার্ডেন বানানো, সেটা অ্যাভয়েড করেছে। এটা একটা ভালো দিক।
“প্রায় ৬২টি আমদানিকৃত অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের বিভিন্ন জায়গায় ডিউটি কমিয়েছে। অ্যাডভান্স ট্যাক্স আর অন্যান্য ডিউটি কমিয়েছে, যাতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা বাড়ে। এগুলো ভালো স্টেপ। কিন্তু এখানে খুবই মৌলিক কৌশল নেওয়া উচিত ছিল। তার আগে আরেকটি জিনিস করেছে, সেটি হলো সামাজিক সুরক্ষা প্রায় ১৪ শতাংশ বাড়িয়েছে। সেখানে নতুন করে ফ্যামিলি কার্ড, এগ্রিকালচার কার্ড, ফার্মার্স কার্ড—যেগুলো খুব আলোড়ন সৃষ্টি করেছে—সেগুলোর পরিধিও আরও বড় করেছে।”
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, “২,৫০০ টাকা করে দেবে, যা মুদ্রাস্ফীতির অভিঘাত থেকে বাঁচতে কিছুটা সাহায্য করবে। তবে মুদ্রাস্ফীতি যদি না কমানো যায়, তাহলে ক্যাশ দিয়ে বেশিদিন সুরক্ষা দেওয়া যাবে না, স্বস্তিও দেওয়া যাবে না।
“কারণ যা দিচ্ছেন, এখন অতিরিক্ত হলেও কয়েকদিন পর তা ইনসাফিসিয়েন্ট হয়ে যাবে, যদি মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে থাকে। সুতরাং মৌলিক কৌশল হলো মুদ্রাস্ফীতি কমানো। সেটা অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার অংশ। সে জায়গায় এবারের বাজেটে আমি কোনো কৌশল দেখছি না।”