১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

অর্থনীতির ওঠানামা সামলানোর নতুন পথ দেখিয়ে নোবেল

নোবেল কমিটি বলছে, অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখার জন্য আরও কার্যকর মডেল তৈরির স্বীকৃতিতে হল ও উডফোর্ডকে এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 12 Oct 2026, 04:44 PM

Updated : 12 Oct 2026, 05:48 PM

অর্থনৈতিক মন্দা ও অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধির মত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কার্যকর নীতি প্রণয়নে অবদানের জন্য অর্থনীতির নোবেল পাচ্ছেন দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ।

রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস সোমবার এ পুরস্কারের জন্য রবার্ট ই হল ও মাইকেল উডফোর্ডের নাম ঘোষণা করে।

হল যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং উডফোর্ড নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

পুরস্কারটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে সুইয়েরিস রিক্সব্যাংক পুরস্কার’। এর অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, যা প্রায় ১২ লাখ ডলারের সমান।

নোবেল কমিটি বলছে, অর্থনীতির সামষ্টিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার নীতিকে আরও কার্যকর করতে ব্যষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তিতে নতুন মডেল তৈরির জন্য হল ও উডফোর্ডকে এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। তাদের তৈরি মডেলের সাহায্যে যথাসময়ে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির পদক্ষেপ নিয়ে অর্থনীতির বড় ধরনের ওঠানামার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান জন হাসলার বলেন, “পুরস্কারজয়ীদের কাজ এমন একটি স্থিতিশীল তাত্ত্বিক ভিত্তি দিয়েছে, যার ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার অর্থনৈতিক মডেল ব্যবহার করছে। এর ফলে জ্বালানি সংকট কিংবা পরিবারের ভোগব্যয়ের আকস্মিক পরিবর্তনের মত অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে আমরা আরও ভালোভাবে প্রস্তুত।”

স্থিতিশীলতার নতুন পথ

অর্থনীতিতে কখনো মন্দা দেখা দেয়, কখনো আবার দ্রুত প্রবৃদ্ধি ঘটে। এ দুই পরিস্থিতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের জন্য দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ।

অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস প্রায় এক শতাব্দী আগে তার তত্ত্ব উপস্থাপনের পর থেকে অর্থনীতির এ ধরনের ওঠানামা সামলাতে ‘স্থিতিশীলকরণ নীতি’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

অর্থনৈতিক মন্দার সময় সুদের হার কমানো এবং সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে চাহিদা ও উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। বিপরীতে, অর্থনীতি অতিরিক্ত গতিতে চললে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে নীতি কঠোর করার প্রয়োজন হতে পারে।

তবে ১৯৭০ এর দশকে তেলের সংকটের সময় প্রচলিত কেইনসীয় মডেল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এসব মডেলের ভিত্তিতে নেওয়া নীতিগুলো সে সময় বেকারত্ব কমাতে ব্যর্থ হয়; অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে থাকে।

তখন অনেকের ধারণা হয়েছিল, অর্থনীতির ওঠানামা সামলানোর প্রচলিত নীতি উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করছে। সেই বাস্তবতায় হল ও উডফোর্ড তাদের কাজের মধ্য দিয়ে দেখান, অর্থনৈতিক মডেল নতুনভাবে নির্মাণ করে স্থিতিশীলকরণ নীতিকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়।

পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত কেন গুরুত্বপূর্ণ

আগের অনেক সামষ্টিক অর্থনৈতিক মডেল মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন ও ভোগের মত বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যকার পরিসংখ্যানভিত্তিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করত। হল ও উডফোর্ডের কাজের গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তারা এসব মডেলের ভিত্তি হিসেবে ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত এবং আচরণকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

অর্থনীতির ভাষায়, এ পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ব্যষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তি’। অসংখ্য পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের স্বার্থে যেসব সিদ্ধান্ত নেয়, সেগুলোর সম্মিলিত প্রভাব কীভাবে পুরো অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে, তা এই মডেলে গুরুত্ব পায়।

এ মডেলের পেছনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হল, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয়। পরিবার সঞ্চয় করবে, নাকি ব্যয় বাড়াবে; ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পণ্যের দাম কীভাবে নির্ধারণ করবে—এসব সিদ্ধান্ত নির্ভর করে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে তাদের প্রত্যাশা ও সংশয়ের ওপর।

সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নীতি সম্পর্কে নিজেদের পরিকল্পনা জানায়, তখন তা পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশাকে প্রভাবিত করতে পারে। এর মাধ্যমে তাদের ব্যয়, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনা এবং অর্থনীতিকে কাঙ্ক্ষিত দিকে পরিচালিত করা সম্ভব।

নোবেল কমিটির ভাষ্য, নতুন এ মডেলগুলো অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অর্থনীতিতে নোবেল

অর্থনীতিতে এ পুরস্কার প্রথম দেওয়া হয় ১৯৬৯ সালে। আলফ্রেড নোবেলের ১৮৯৫ সালের উইল অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত মূল পাঁচটি পুরস্কারের মধ্যে এটি ছিল না। সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইয়েরিস রিক্সব্যাংক ১৯৬৮ সালে এ পুরস্কার চালু করে।

এ পর্যন্ত এ পুরস্কারের বেশির ভাগ বিজয়ী যুক্তরাষ্ট্রের। নারীদের মধ্যে এ পুরস্কার পেয়েছেন মাত্র তিনজন। সর্বশেষ ২০২৩ সালে পুরস্কার পান ক্লডিয়া গোল্ডিন। যুক্তরাষ্ট্রে সময়ের সঙ্গে মজুরি ও কর্মসংস্থানে নারী-পুরুষের ব্যবধান কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, সে বিষয়ে গবেষণার জন্য তাকে পুরস্কার দেওয়া হয়।

২০২৫ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন জোয়েল মোকির, ফিলিপ আগিয়োঁ ও পিটার হাউইট। নতুন প্রযুক্তি ও উৎপাদনপদ্ধতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মান কীভাবে বাড়ে, সে বিষয়ে ‘সৃজনশীল ধ্বংস’ ধারণার ওপর কাজের স্বীকৃতিতে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।

চিকিৎসা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, সাহিত্য ও শান্তিতে এ বছরের নোবেল পুরস্কার গত সপ্তাহেই ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থনীতির পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ বছরের নোবেল ঘোষণার পর্ব শেষ হল।