Published : 09 Jun 2026, 12:37 AM
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের বার্তা দেওয়ার যে বাজেট সাজানোর আভাস মিলছে বিএনপি সরকারের তরফে তাতে বাস্তবায়নযোগ্য ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ দেখতে চান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
বর্তমান সংকটময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যয় ও আয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে অর্থ ব্যবহারে অগ্রাধিকার ঠিক করার মুন্সিয়ানা দেখানোর তাগিদও দিয়েছেন তিনি।
শিশুদের টিকা, ওষুধ, পরীক্ষাগারের সরঞ্জাম সংগ্রহ, বইয়ের খরচ, চলাচলের অনুপযোগী সড়ক মেরামতে সাশ্রয়ী হওয়ার সুযোগ না থাকাকে এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক এই প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, “আমার যে নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যয়গুলো আছে, যেগুলো সরকারি সেবা অব্যাহত রাখার জন্য খুবই প্রয়োজন, সেখানে যাতে বরাদ্দটা ঠিকমত পৌঁছায় এবং খরচটা ভালোভাবে হয়। তারপরে আপনি নতুন প্রকল্প, বড় প্রকল্প, ছোট প্রকল্প সেদিকে যেতে পারেন।”
আসন্ন বাজেট নিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইনসাইড আউট আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন জাহিদ হোসেন।
এ আলোচনা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেইসবুক পেইজে সম্প্রচার করা হয়।
দুই দশক পরে আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করতে যেয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার যে প্রতিশ্রুতির ডালি সাজাচ্ছে তাতে সংকটের উত্তরণের দিশা কতটা থাকবে সেই আলোচনা এখন চলছে।

মূল্যস্ফীতি ও সামষ্ঠিক অর্থনীতির চাপের মধ্যে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও বিভিন্ন সামাজিক ভাতা বাড়ানোর কথা বলছে সরকার। এসব পরিকল্পনাকে ‘অত্যন্ত সময়োপযোগী’ হিসেবে বর্ণনা করলেও এর প্রাপ্তি ও বণ্টন নিয়ে সংশয়ের কথাও প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, “এটাকে স্বাগত জানাতে হবে যে বর্তমানের প্রেক্ষাপটে এটার প্রয়োজন আছে, কিন্তু যেটা দেওয়ার কথা–সহায়তা, দরিদ্র মানুষের কাছে, নন-পুওর কিন্তু ভালনারেবল পরিবারগুলোর কাছে, সেখানে পৌঁছাতে পারবে কিনা—সেটা এখনো দেখার বিষয়।”
বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর জন্য প্রায় ১০০টিরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প সচল রয়েছে। তার মতে, এসব প্রকল্পের ‘অতীত পারফরম্যান্স একেবারেই সন্তোষজনক নয়’ এবং এক টাকা দিতে গিয়ে দেড় টাকা খরচ হওয়ার মত ব্যবস্থাপনার সমস্যা রয়েছে।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে পেশ হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট। দুই দশক আগে বাজেটের আকার যেখানে ছিল প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা, সেখানে এবার তা ৯ লাখ কোটি টাকার বিশাল অঙ্ক ছাড়াতে যাচ্ছে বলে আভাস মিলেছে।

এ বিশাল বাজেট দেশের বর্তমান সংকটময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন জাহিদ হোসেন।
“বিশাল বাজেট যেটা বার্তা দিচ্ছে সেটা হলো যে আমরা নির্বাচনে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। অনেক ধরনের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা খাত, অবকাঠামো–এখানে আমরা সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নের কথা বলেছি। এবং সেটা যেহেতু এটা তাদের প্রথম বাজেট, এই বড় আকারের বাজেট নির্ধারণ করে আমরা প্রতিশ্রুতি পালন করার পথে হাঁটা শুরু করেছি–সেরকম একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
“প্রশ্নটা হলো যে এত বড় আকার বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য হবে কিনা? এইটার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন, সেই অর্থটা পাওয়া যাবে কিনা? আর সেইটা যদি না করতে পারেন, তাহলে প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন বাজেটে থাকলেও ‘বাস্তবে কিন্তু সেইটা দেখা যাবে না’।”
‘৪ বছর ধরে ক্রয়ক্ষমতা কমার চাপে মানুষ’
দেশের মানুষ গত চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির চাপে ভুগছে। উচ্চ সুদের হার চালু রেখে কিছুটা মূল্যস্ফীতি কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা খুব একটা কাজে লাগেনি। আবারও মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে দুশ্চিন্তা তৈরি করছে।
এর মাধ্যমে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এ পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার কোনোটিই সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর সুফল দিতে পারেনি।

এ বিষয়ে জাহিদ হোসেন বলেন, বাজার পরিস্থিতি উন্নত না হওয়ার পেছনে কিছু বাহ্যিক ও কিছু অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তহীনতা এবং প্রয়োগের অস্থিরতা কাজ করেছে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনীতি সম্প্রতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার কারণে পণ্যমূল্য বেড়েছে। যে কারণে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বাজারের পরিস্থিতি গত চার বছর ধরেই–যদি মূল্যস্ফীতি দিয়ে আমরা বিচার করি–সেখানে কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। বরং মানুষ ক্রয়ক্ষমতা কমার চাপে গত চার বছর ধরেই ভুগছে।
“এটার মানে বিস্তারিত বিশ্লেষণ না করলেও এটুকু বলা যায়, যে এই পর্যন্ত যে সমস্ত উদ্যোগ আমরা দেখেছি বাজার পরিস্থিতিকে উন্নত করার জন্য, সেগুলো থেকে তেমন কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।”
এর মধ্যে বাজেটের অন্যতম বড় মাথাব্যথার কারণ হতে যাচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি সমন্বয়।
এ বিষয়ে জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রোগ্রাম সক্রিয় না থাকায় এটি মূলত সরকারের একটি ‘অভ্যন্তরীণ উভয় সংকটের ফল’। মূল্য অপরিবর্তিত রাখলে ‘ভর্তুকির বোঝা’ সরকারের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
এ খাতে চলতি বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা বর্তমানে ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর প্রভাবের বিষয়ে তিনি বলেন, ১ টাকা ২৫ পয়সা প্রতি কিলোওয়াট আওয়ারে বাড়ানোর যে প্রস্তাব রয়েছে তাতে মূল্যস্ফীতি এখন যা আছে সেটির থেকে শুধু এ কারণে আগামী এক বছরের মধ্যে ১ শতাংশের কাছাকাছি বাড়তে পারে। এইটা তো একটা অতিরিক্ত চাপ সবার উপরেই তৈরি করছে।
বর্তমানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের আশেপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে।
এর ‘বিকল্প না’ থাকার দাবি করে তিনি বলেন, কারণ ভর্তুকির বোঝা বাড়লে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো বকেয়া বিলের কারণে ‘ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল’ সংগ্রহ করতে পারবে না, যা লোডশেডিং বাড়িয়ে উৎপাদন কমিয়ে দেবে এবং চূড়ান্তভাবে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আরও বাড়াবে।

বাজেট অর্থায়নের সংকট
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির আওতায় যেসব সংস্কারের শর্ত ছিল তা পূরণ না হওয়ায় বাকি কিস্তি পাচ্ছে না বাংলাদেশ। প্রায় ১৮০ থেকে ১৮৫ কোটি ডলারের কিস্তি মিলছে না। চলমান কর্মসূচি বাদ দিয়ে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার কথা বলেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
জাহিদ হোসেনের মতে, আইএমএফের কর্মসূচি স্থগিত থাকার নেতিবাচক প্রভাব অন্যান্য দাতা সংস্থার ওপরও পড়ে।

বিশ্ব ব্যাংক বা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবির) মতো বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলো থেকে যখন বাজেট সহায়তা চাওয়া হয়, তখন আইএমএফের অর্থছাড় বন্ধ থাকলে তাদের ব্যবস্থাপনা পর্ষদ থেকে আপত্তি ওঠে। এর ফলে প্রকল্প সহায়তা সচল থাকলেও বড় অঙ্কের বাজেট সহায়তা আটকে যাওয়ার জটিলতা তৈরি হয়, যা নতুন বাজেটের আকারকে সংকুচিত করতে বাধ্য করতে পারে বলে তার ভাষ্য।
নয় লাখ কোটি টাকার ওপরে বাজেটের আকার করার যে পরিকল্পনা কষছে সরকার, তাতে ছয় লাখ কোটি টাকার ওপরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য থাকবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। কর আদায়কারী সংস্থাটি চলতি অর্থবছরের যে হারে রাজস্ব আদায় করছে তাতে আগামী অর্থবছরে ৪৫-৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন হবে।
অতীতের কোনো সময়ে এ ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখেনি এনবিআর; সে হিসাবে উচ্চাভিলাসী বাজেট বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণ ও অর্থায়নের চাপ থাকবে বিএনপি সরকারের ওপর।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জাহিদ হোসেন এত বড় বাজেটের বাস্তবায়নযোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন প্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তার মতে, এই মুহূর্তে অর্থনীতির সম্প্রসারণের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতি যেখানে আছে, সেখানে টিকে থাকা এবং একে সচল রাখা।
“আপনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানে যদি দাঁড়িয়ে থাকতেই আপনার কষ্ট হয়, তাহলে তো আর দৌড়ানোর প্রশ্ন আসে না। কাজেই আগে নিশ্চিত করতে হবে যে যেই চাপ বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে তৈরি হয়েছে এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক যেই দুর্বলতাগুলি আছে... ৩০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়ে গেছে, কিন্তু সেখানে কোনো উৎপাদন হচ্ছে না গ্যাসের অভাবে।
“তো এইসব ক্ষেত্রে তো আর নতুন বিনিয়োগ করে আপনার কোনো লাভ হচ্ছে না। যেটা করেছি সেটাই তো ফাংশনাল না।”
বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো অত্যাবশ্যক বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এখানে একটা ধারণা আছে যে আমরা যদি ব্যক্তি কিছু নিয়ে আসি, যাদের বিদেশে তারা অনেক বড় বড় ইনভেস্টিং কোম্পানির সাথে কাজ করেছেন, তাদের যোগাযোগ আছে, তারা আসলেই তাদের পরিচয়ের কারণে দেশে কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ চলে আসবে–এইটা কিন্তু সম্পূর্ণ একটা ভুল ধারণা।
“কারণ ব্যক্তির চেহারা বা ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব দেখে বিনিয়োগকারীরা আসে না, বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ পরিবেশের ভিত্তিতেই বিনিয়োগ করতে আসে।”

বিনিয়োগ বাড়াতে মূলত তিনটি বিষয়ে জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব, নীতির পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় কমানোর কথা বলেন তিনি। বিশেষ করে বন্দরে কন্টেইনার দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং বিভিন্ন কমপ্লায়েন্সের ক্ষেত্রে হয়রানি দূর করা জরুরি।
দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাত গুটি কয়েক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা অলিগার্কির হাতে জিম্মি থাকা প্রসঙ্গে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক এই প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, অলিগার্কদের সম্পূর্ণ নির্মূল করা ‘অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে’।
‘শুধু আমাদের দেশে অলিগার্কি নয়, অলিগার্কি অনেক দেশেই আছে’ তুলে ধরে তিনি বলেন, “কারণ এরা বড় বড় উদ্যোক্তা, বড় বড় ব্যবসা বিভিন্ন খাতে করেন। কিন্তু শুধু সরকারি সুবিধা নেওয়ার জন্য প্রভাব খাটিয়ে কম খরচে ঋণ নিলাম আবার ঋণ ফেরত দিলাম না, তারপর ওটা বারবার রিশিডিউলিং করতে থাকলাম, বিভিন্ন ধরনের কর সুবিধা নিলাম—এই যে সুবিধা নেয়ার জন্য যে ব্যবসা, ওখান থেকে ওই বিজনেস মডেলটাকে চেঞ্জ করে এটাকে উৎপাদনমুখী করা, এটাকে বিনিয়োগমুখী করা—এইটাই হচ্ছে চ্যালেঞ্জ।
“এখন এখানে যারা ধরেন অলরেডি প্রমাণিত যে ও তারা ওই পথে হাঁটবেন না, তাদেরকে যদি আমরা ফিরে আসার পথগুলো খুলে দেই, তাহলে এখান থেকে বেরিয়ে আসাটা খুবই কষ্টকর হবে। মানে ওই চক্রের মধ্যেই আমরা ঘুরতে থাকব।”
বাংলাদেশ ব্যাংক বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য সম্প্রতি পুনরায় ঋণের বিশেষ সুবিধা বা রিশিডিউলিংয়ের যে ব্যবস্থা করে দিয়েছে, তা দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি নেতিবাচক বার্তা বলে তিনি মনে করেন।
জাহিদ হোসেন বলেন, “এই ঋণ খেলাপির যে একটা সংস্কৃতি বাংলাদেশে হয়ে গেছে, এইটা ভাঙার কথা আমরা অনেকদিন ধরেই বলে আসছি। কিন্তু এই ধরনের আবার যখন নতুন কিছু সুবিধা পুনরায় দেওয়া হয়, তখন তো যেই বার্তাটা দেয় যে আমি যা বলছি আর আমি যা করছি তার মধ্যে কোনো যোগাযোগ নাই।
“কাজেই এইটা ওই সংস্কৃতিকে আরও রিইনফোর্স করবে, এখান থেকে বেরিয়ে আসা তো দূরের কথা।”
‘বর্তমান সংকটটি মূলত সরবরাহভিত্তিক’
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পলিসি রেট বা নীতি নির্ধারণী সুদের হার ১০ শতাংশে ধরে রেখেছে।
জাহিদ হোসেনের মতে, এই সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে যাওয়া থেকে হয়তো ঠেকিয়ে রেখেছে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সুদের হার কমানোর কোনো সুযোগ নেই। তবে এটিই মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য যথেষ্ট নয়, কারণ বর্তমান সংকটটি মূলত সরবরাহভিত্তিক।

তার ভাষ্য, “প্রশ্নটা হলো যে যেখানে আপনার সরবরাহ সংকট, সেখানে সেইটাকে যদি আমরা এড্রেস করতে না পারি, এখন ধরেন গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার হচ্ছে না, যার কারণে সরবরাহ যেটা দেওয়া সম্ভব সেটা আমরা দিতে পারছি না। ওইটা যদি আমরা সমাধান করতে পারতাম, তাহলে সেটা মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক হত।
“চাঁদাবাজির কারণে উৎপাদন থেকে বাজারে পৌঁছাতে যেই দামে উৎপাদকরা বিক্রি করছেন আর যেই দামে ভোক্তারা কিনছেন তার মধ্যে একটা বড় পার্থক্য তৈরি হয়। তো সেখানে যদি আমরা আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতিকে উন্নত করতে পারতাম যার ফলে চাঁদাবাজিটা বন্ধ হতো, তাহলে ওই অতিরিক্ত মূল্যটা ভোক্তাদের দিতে হত না। সেটাও মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক হত।”
অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা কোথায়?
চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দায়িত্ব পালন করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের কার্যক্রমও মূল্যায়ন করেছেন জাহিদ হোসেন।
তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ‘সম্পূর্ণ ভঙুর অর্থনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো’ পেয়েছিল। তারা চলে যাওয়ার সময় অন্তত বৈদেশিক বাণিজ্যে স্থায়িত্ব, স্থিতিশীল মুদ্রা বিনিময় হার ও স্বস্তিদায়ক রিজার্ভ রেখে গেছে।
“তাদের ম্যান্ডেটও তো ছিল যে একটা নির্বাচন করে দেওয়া, রাজনৈতিক সংস্কার উদ্যোগটা নেওয়া এবং বিচার–যা হয়েছে অতীতের অন্যায়–সেগুলো বিচারের ব্যবস্থা করা। এইটাই তো তাদের মূল ম্যান্ডেট ছিল।
“সেই দিক থেকে এইসব কিছু আমলে নিয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় খুব বেশি মনোযোগ দেয়ার সময় কি তারা পেয়েছিলেন? কারণ আমি তো দেখেছি প্রায় ৬৫০ টার বেশি আন্দোলনই হয়েছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও থেকে একটা আল্টিমেটাম আসতো। তবে এগুলো সব বলার পরেও এটুকু বলতে হবে যে কিছু ক্ষেত্রে এখন আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি–আপনি বলছেন সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কোথায় ছিল–এইটা তো আমি বলব স্বাস্থ্যখাতে।”

তিনি বলেন, “আজকে যে হামের কারণে এতগুলো বাচ্চার জীবন চলে গেছে, আমাদের কিন্তু টিকাদানের কর্মসূচিটা আন্তর্জাতিকভাবে একটা খুবই সুনাম ছিল, যে টিকা কর্মসূচিগুলো বাংলাদেশে সময়মতো বাচ্চাদের কাছে পৌঁছে যায়। কী কারণে এইটা গত বছর হতে পারল না, এটা এখনো আমরা ঠিক সুনির্দিষ্টভাবে জানি না।
“তবে আমার মনে আমার মতে স্বাস্থ্যখাতের এই যে হামের যে ব্যর্থতা এখন আমরা ভুগছি, এইটা কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটা ‘বড় ব্যর্থতা’।”
বর্তমান সরকারের ১০০ দিন পূর্তি ও ইরান যুদ্ধের প্রভাব প্রসঙ্গে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে যতটুকু এগোনোর কথা ছিল ততটুকু না এগোনো যৌক্তিক হতে পারে, কিন্তু পিছু হটাকে বৈশ্বিক পরিস্থিতি দিয়ে জাস্টিফাই করা যাবে না।
ব্যাংকিং খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য আনা ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স’-এ শেষ মুহূর্তে নতুন ধারা যোগ করে বিতর্কিত মালিকদের সুবিধা দেওয়ার যে পথ তৈরি করা হয়েছে, কিংবা এনবিআর পৃথকীকরণের উদ্যোগ থেকে যেভাবে পিছু হটা হয়েছে–তা ‘হতাশাজনক’।
বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ ‘রাজস্ব আহরণ’
আসন্ন বাজেটে সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে এনবিআর ও নন-এনবিআর এর মাধ্যমে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা।
জাহিদ হোসেনের মতে, দেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত কখনো সাড়ে চার লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়নি, তাই এক বছরের মধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব।
“একটা বলে তো খুব বেশি হলে ছক্কা মারা যায়, তার বেশি তো রান করা যায় না। ওটা যদি নো বল হয় তাহলে হয়তো আপনি সাত রান করতে পারবেন—এর বেশি তো করতে পারবেন না। কাজেই যতই ভালো করেন না কেন, ৬ লক্ষ ৯৫ হাজার কোটি টাকায় ওঠা এক বছরের মধ্যে–এটা ‘অসম্ভব’।”
এই অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রার কারণে যদি ব্যয়ের বাজেট অপরিবর্তিত থাকে, তবে ঘাটতি অনেক বেড়ে যাবে। এর ফলে সুদের হার আরও বাড়বে, মুদ্রা বিনিময় হার এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়বে বলে তার ভাষ্য।
এক্ষেত্রে সরকারের করণীয় বিষয়ে তিনি বলেন, “কাজেই এখানে একটা বাস্তবায়নযোগ্য বাজেটের আকার যদি না হয়, তাহলে কিন্তু অন্যান্য চ্যালেঞ্জের কথা বলে আর লাভ হচ্ছে না। আর দ্বিতীয় হচ্ছে যে যেই বরাদ্দটা আমরা করছি বাজেটে, এইটা যেন নিত্য প্রয়োজনীয় যে ব্যয়গুলি আছে এগুলো যেন অবহেলিত না হয়।“