জ্বালানি তেলের দাম একবারে এতটা বাড়ল কেন? বিকল্প ছিল?
সরকার গঠনের সাত মাসের মাথায় এ নিয়ে বিএনপি সরকার তিন দফায় দাম বাড়ালেও শুল্ক কমানোর পথে হাঁটল না কেন? – এমন প্রশ্নও উঠেছে।
নানামুখী চাপে থাকা অর্থনীতি আর সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমে সংকুচিত হয়ে যাওয়ার মধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ২০ টাকা করে বাড়াল সরকার; এখন প্রশ্ন আসছে এ মূল্যবৃদ্ধির মূলে কী?
সাধারণের ওপর বাড়তি চাপের বোঝা হয়ে দেখা দিতে যাওয়া এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আগের রাত থেকেই শুরু হয়েছে আলোচনা। সীমিত আয়ের মানুষ নতুন করে দাম বাড়ার শঙ্কা নিয়ে দিন শুরু করেছেন।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা ভাবছেন মূল্যস্ফীতির পারদ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা নিয়ে। এরমধ্যেই ঘুরে ফিরে আলোচনায় কথা উঠছে, নতুন সরকার একবারে এতটা দর না বাড়িয়ে আর কিছু কী করতে পারত?
চলতি বছর ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের কারণে পশ্চিম এশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হতে থাকলে সব ধরনের জ্বালানির দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তে থাকে। এতে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের চাপ ছিল। তবে এবার একবারে এতটা দর বাড়ানোর কারণ এটিই নাকি অন্যকিছু- সেই প্রশ্নও এসেছে আলোচনায়।
একই সঙ্গে ভর্তুকি কমাতে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের চাপ ছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তরফেও। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা এ সংস্থা আওয়ামী লীগ আমলের সময় করা আগের ঋণচুক্তি বাতিল করেছে। নতুন করে সংস্থাটি থেকে ঋণ পেতে আলোচনা শুরু করেছে বিএনপি সরকার। নতুন চুক্তির আলোচনায় আবার জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর বিষয়টি এসেছে কিনা- সেই প্রশ্নও আছে।
রোববার রাতে দেশে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোল—চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। নতুন দর অনুযায়ী খুচরায় প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ ও অকটেনের দর ধরা হয়েছে ১৬৫ টাকা।
এর আগে গত জুনে আরেক দফা বাড়ানো হয়েছিল জ্বালানি তেলের দাম। তখন ডিজেল ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রেখে কেরোসিন ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা করা হয়। পরের তিন মাস সেই দাম বহাল রাখার পর এবার একবারে বাড়ানো হয় ২০ টাকা। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলের দামও বাড়ানো হয়।
দেশের সীমিত মানুষের আয়ের সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে কৃষি ও পরিবহনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলে ভর্তুকি দিয়ে আসছে সব সরকারই। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমতে থাকলেও দাম সমন্বয় না করে বাড়তি দামে জ্বালানি তেল বিক্রি করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মুনাফা করার নজিরও আছে।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন, সরকারি চাকুরেদের দ্বিগুণ বা এরও বেশি বেতন বাড়ানোর কারণে মূল্যস্ফীতি উসকে ওঠার শঙ্কার মধ্যে এখন আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধিকে কারণ দেখিয়ে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো কতটা যৌক্তিক হল।
এমন প্রেক্ষাপটে দাম বাড়ানোর বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বিপিসির অতীতের মুনাফার দিকটি তুলে ধরে বলেন, “আপনার অবগতির জন্য বলছি, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটতো শুরু হয় ১৭ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত থেকে। বিপিসির কোষাগারে অর্থ ছিল বলেই এতদিন পর্যন্ত বিপিসি মূল্য সমন্বয় (দাম না বাড়িয়ে) না করে থাকতে পেরেছিল।
“২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা যে সে (বিপিসি) লোকসান দিতে পারল, এটা যে সে এফোর্ড করতে পারল, কোথা থেকে পারল? একটি সময়ে সে এটা লাভ করেছে কিংবা তার কোষাগারে অতিরিক্ত অর্থ ছিল বলেই এটা করতে পেরেছে।”
সরকারের দাবি, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য ও জাহাজ ভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা এখনো অব্যাহত আছে।
সরকারের তরফে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও সরকার জনস্বার্থে দেশে দাম বাড়ায়নি। ফলে মার্চ থেকে অগাস্ট সময়ে বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে, দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে লোকসান কমানোর বিষয়টি উল্লেখযোগ্য হলেও অন্য কিছু বিষয়ও সামনে এসেছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাপে ছিল সরকার। এরইমধ্যে জ্বালানি মন্ত্রণালয় ভর্তুকির জন্য টাকা চাইলে তাতে সায় মেলেনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের।
অপরদিকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন, অর্থছাড় বাড়িয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি আনা এবং ফ্যামিলি ও কৃষি কার্ডসহ নানাবিধ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অর্থ সংকুলানের চাপে রয়েছে সরকার। এরমধ্যে রাজস্ব আদায়েও নেই গতি। বরং নতুন অর্থবছরের আড়াই মাস পার হলেও প্রথম মাসের রাজস্ব আদায়ের তথ্য প্রকাশ করছে না এনবিআর।
প্রথম দুই মাসের রাজস্ব আহরণের অপ্রকাশিত তথ্য বলছে, কেবল মূল্য সংযোজন কর-মূসক বা ভ্যাট আদায় কমেছে ২২ শতাংশের মত। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের বিনিয়োগ ভাটা পরিস্থিতির মধ্যেও গত অর্থবছরের জুলাই-অগাস্টে যে ভ্যাট আদায় হয়েছিল, চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তার চেয়ে প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমেছে।
এমন বাস্তবতায় রাজস্ব আদায় বাড়াতেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোকে যুক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে সরকারের ভর্তুকি কমার পাশাপাশি প্রতি লিটার তেল বিক্রিতে বাড়তি রাজস্ব আদায়ও হবে।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরাও এমনটা বলছেন। তাদের মতে, এর ফলে রাজস্ব আদায় বাড়বে।
তবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পথে না হেঁটে জনগণের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ কমাতে তারা ‘ভ্যাট-ট্যাক্স’ সুনির্দিষ্ট করে দেওয়ার পরামর্শ দেন।
বর্তমানে জ্বালানি তেল আমদানি করা থেকে খুচরায় বিক্রি পর্যন্ত সব মিলিয়ে শুল্ক-কর ৩০ শতাংশের মত। অর্থাৎ এ পদ্ধতিতে দাম বাড়লে শুল্ক-কর আদায়ও বেড়ে যায়।
জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি মেঘনা পেট্রোলিয়াম পিএলসির চেয়ারম্যান ম. তামিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই জিনিসটা আগেও বলেছিলাম, সরকারকে বলেছিলাম যে এটা ফিক্সড করে দিলে ভালো হয়। ভ্যাট-ট্যাক্স মূল্যের সাথে না বাড়াইলে মানুষ একটু স্বস্তি পাবে।
“এখন প্রাইসের সাথে যদি ট্যাক্স-ভ্যাটও বাড়ে তাহলে নিশ্চিতভাবেই সরকারের রাজস্বতো বাড়বেই। সেটার একটা সুযোগ পাবে তারা।”
সরকার ‘ব্যবসায়ী’ ও ‘মুনাফাভোগীর’ মত আচরণ করছে অভিযোগ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরকার এ খাত থেকে প্রচুর মুনাফা করে। সরকার করপোরেট কর পায়, সরকার লভ্যাংশ খায়। আবার ওদিকে ভ্যাট নেয়, ট্যাক্স নেয়, শুল্ক নেয়। তো সরকারের একই অঙ্গে এত রূপ!
“এই রূপই হচ্ছে আমাদের মূল্যবৃদ্ধি বা তেল খাতের শোষণের বা লুণ্ঠনের অন্যতম একটি কারণ, বড় কারণ—আরও কারণ আছে।”
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেবা মুনাফামুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, “জ্বালানি সেবা দিতে যেটুকু টাকা খরচ হবে, সে শুধু সেইটুকু টাকা জনগণের কাছ থেকে নেবে।
“এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সহনীয় পর্যায়ের পর্যায়ের সে কিছু রাজস্ব আহরণ করবে। কিন্তু সে রাজস্ব আহরণ অত্যন্ত বেপরোয়া।”
কী বলছে সরকার?
নির্বাচনে জয়ী হয়ে ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠন করার পর থেকে বিএনপি সরকার ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কারণ হিসেবে তুলে ধরে সাত মাসের মধ্যে তিন দফায় দাম বাড়ায় জ্বালানি তেলের।
সরকারের তরফে এ যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানির দাম এবং জাহাজভাড়া দুইই অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার কথা তুলে ধরা হয়। বিপিসির লোকসান বাড়তে থাকায় দাম সমন্বয় করে তা সহনীয় করার পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়। এছাড়া প্রতিবেশী দেশের তুলনায় দাম কম থাকায় তেল ‘পাচারের ঝুঁকি’ তৈরি হয়েছে।
সোমবার মন্ত্রণালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দামা বাড়ানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, এটি না করা হলে সরকারের টিকা কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কম মূল্যে খাদ্য সরবরাহের মতো সরকারের ভর্তুকি দিয়ে চালানো কার্যক্রম ‘বিঘ্ন’ বা ‘স্থগিত’ হয়ে যেত।
তার ভাষ্য, “এ ধরনের সকল কার্যক্রমই আসলে বিঘ্নিত হবে, বিঘ্ন ঘটবে, ক্ষেত্রবিশেষে স্থগিত হয়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে আসলে কোনো বিকল্প সামনে না থাকবার কারণে আমাদেরকে এরকম একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়েছে।”
পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এখনও জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় ‘পাচারের ঝুঁকির’ শঙ্কার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
পাচারের কোনো ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটেছে কিনা বা সরকার এমন চেষ্টা আটকে দিয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বিভিন্ন সূত্র থেকে ঝুঁকি আমরা অনুভব করেছি এবং সেই সূত্রগুলো তো দায়িত্বশীল সূত্র বলেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।”
কর্মকর্তারা কী বলছেন?
সরকারের ভাষ্য, মার্চ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বিপিসির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বর্তমান আন্তর্জাতিক দরে ডিজেলে লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা, দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা–অর্থাৎ শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোয় বছরে লোকসান কমবে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বলে দাবি সরকারের। অর্থাৎ সমন্বয়ের পরও বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকার মত ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি অনুকূলে না আসায় জ্বালানি ও বিদ্যুতে ভর্তুকি বেড়েই চলছে; এদিকে রাজস্ব আদায়ে রয়েছে নিম্নমুখী প্রবণতা।
অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলছেন, যুদ্ধ শুরুর পর মার্চ থেকে জুন সময়ে একটা ভর্তুকির হিসাব করা হয়েছিল। তখন দেখা গেছে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারে অতিরিক্ত ৩৮ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন। চলতি অর্থবছরেও একই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, জ্বালানি মন্ত্রণালয় নতুন অর্থবছরে ২২ হাজার কোটি টাকার মত ভর্তুকির অর্থ চেয়েছিল। সেটিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সায় মেলেনি। এখন আইএমএফের পুরনো ঋণ চুক্তি চালু না থাকায় তাদের কোনো শর্ত আমলে নেওয়া হচ্ছে না। অর্থাৎ অর্থের সংকুলান না থাকাই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর মূল কারণ।
বিশ্লেষকরা কীভাবে দেখছেন?
আইএমএফের সুপারিশ ছিল জ্বালানি মূল্যের স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালুর। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানের প্রধান কারণ আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও ভোক্তা পর্যায়ে অপর্যাপ্ত মূল্য নির্ধারণ।
তবে এবারের দাম বাড়ানোকে আইএমএফের চাপ হিসেবে দেখতে চান না জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম। বলেন, “বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম অনেক বেড়ে গেছে। যদিও অপরিশোধিত তেলের দাম এখন ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসছে কিন্তু পেট্রোল, ডিজেল, অকটেন- এগুলোর দাম অনেক বেড়ে গেছে। দুইটা ভিন্ন জিনিস। মানে ক্রুড অয়েলের সরবরাহ আর ফিনিশড প্রোডাক্টের সরবরাহ দুটো পৃথক জিনিস।”
তার ভাষ্য, সরবরাহে সংকট আগেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু উন্নত দেশগুলো সবই তাদের মজুত থেকে ব্যবহার করছিল। এখন তা শেষ হয়ে আসছে। এই যুদ্ধ যদি আরও চলতে থাকলে পুরো বিশ্বই একটা চরম সংকটের মধ্যে পড়বে, যার মধ্যে জ্বালানি সংকট হবে বড়।
কল্যাণ নয়, ‘লুণ্ঠন’
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তা জনগণের কল্যাণে করার কথা থাকলেও সব সরকারই ‘লুণ্ঠনের’ দিকে গেছে বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগের কথা আবারও তুলে ধরলেন আরক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম।
তার ভাষ্য, “জ্বালানি সেবার মধ্য দিয়ে সরকার যে জনগণের কল্যাণ করে, সেইটা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরঞ্চ লুণ্ঠন করে সেটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা চাই সরকার নিজেকে লুণ্ঠনের কলঙ্ক, মুনাফাখোরের কলঙ্ক থেকে মুক্ত হোক। যদি আজকে মুক্ত হতো, তাহলে জ্বালানি তেল, বিদ্যুতের দাম, গ্যাসের দাম এই পর্যায়ে আসত না।
“এবং যে টাকা সাশ্রয় হত, সেই টাকায় বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত লাভজনক থাকত। সরকারের ভর্তুকি কমানোর জন্য কোনোভাবেই মূল্যবৃদ্ধি করতে যেতে হত না।”
আগের সরকার ও বর্তমান সরকার কীভাবে এসব সংকট তৈরি করেছে সেটির ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা যে গ্যাস উন্নয়ন তহবিল গঠন করেছি, বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল গঠন করেছি, যে জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল গঠন করেছি, সেসব তহবিলের কোনো কার্যকারিতা নেই। সেসব তহবিল অর্থহীন হয়েছে।
“তারা তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতাও আজকে সরকারকে ব্যর্থ করে দিয়েছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকে সংকটে ফেলেছে। এটাও একটা আলাদা দিকের সূচক।”
কী করা যেতে পারত?
এতটা দাম বাড়ানোর পর প্রশ্ন উঠেছে সরকার জ্বালানি তেল আমদানি, পরিশোধন ও ব্যবসার পর্যায়ে ৩০ শতাংশের মত যে শুল্ক-ভ্যাট ও কর আদায় করে তা কমাতে বা বাদ দিতে পারত কিনা।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইউক্রেইন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ডিজেল আমদানিতে এভাবে শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত দেখা গেছিল। এবারও সেই আলোচনা নতুন করে উঠেছে।
সরকার গঠনের সাত মাসের মাথায় এ নিয়ে বিএনপি সরকার তিন দফায় দাম বাড়ালেও শুল্ক কমানোর পথে হাঁটল না কেন? – এমন প্রশ্নের জবাবে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকার চালাতে রাজস্বও কিন্তু লাগবে। কর ও জিডিপি অনুপাত এখনও ৭ শতাংশের নিচে। পাশের অন্য দেশগুলোতে তা ১৫ শতাংশের ওপরে। তাহলে জ্বালানি তেলে শুল্ক-ভ্যাট বাদ দেওয়ার উপায়তো নেই।
এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, জ্বালানি তেলে ভ্যাট বা শুল্ক-কর কমানোর আলোচনা নিয়ে কোনো কথা হয়নি। এদিনের সংবাদ ব্রিফিংয়েও একই ইঙ্গিত দেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভ্যাট-শুল্ক কিছু কমিয়ে গ্রাহকদেরকে বা জনগণকে আরেকটু ‘রিলিফ দেওয়া যায় কিনা’- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “সেটা আসলে অন্য মন্ত্রণালয়ের বিষয়। সেটি যদি সুযোগ থাকে নিশ্চয়ই তারা ভাববে হয়তবা।”
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিমও রাজস্ব ছাড় না দেওয়ার পক্ষে। তবে তিনি চান নির্দিষ্ট হারে শুল্ক-কর থাকুক। যাতে দাম বৃদ্ধির প্রভাবে কর বেড়ে জনগণের ওপর আরও চাপ না বাড়ে।
তার ভাষ্য, “বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটময় পরিস্থিতিতে এখন আমাদের এলএনজি আমদানিতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, তাই এখন যদি রেভিনিউ ছাড় দেয়, সেটা ভর্তুকির পর্যায়েই পড়বে, তাই না?”
এনবিআরের ২০১৯ সালের ভ্যাট সংক্রান্ত্র এক আদেশ বলছে, পেট্রোলিয়াম পণ্যে উৎপাদন পর্যায়ের সরকারনির্ধারিত কর-উত্তর মূল্যের মধ্যে ১৫ শতাংশ মূসক অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হয়, আর ভোক্তা পর্যায়ের খুচরা মূল্যের মধ্যে ব্যবসায়ী পর্যায়ের ২ শতাংশ মূসক অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়।
নতুন প্রজ্ঞাপন ধরে হিসাব করলে ডিজেলের এক্স-রিফাইনারি কর-উত্তর মূল্য ১২৩ টাকা ৫৮ পয়সার মধ্যে উৎপাদন পর্যায়ের মূসক দাঁড়ায় প্রায় ১৬ টাকা ১২ পয়সা। এর সঙ্গে ব্যবসায়ী পর্যায়ের ২ টাকা ৬৫ পয়সা যোগ করলে লিটার প্রতি কেবল মূসক প্রায় ১৮ টাকা ৭৭ পয়সা, যা খুচরা মূল্যের প্রায় ১৪ শতাংশ।
অকটেনে এ অঙ্ক প্রায় ২২ টাকা ৭৮ পয়সা, পেট্রোলে ২২ টাকা ৫ পয়সা ও কেরোসিনে ২১ টাকা ৭৯ পয়সা।
যেহেতু মূসক মূল্যভিত্তিক, দাম বাড়লে লিটারপ্রতি রাজস্বও বাড়ে–অর্থাৎ ভর্তুকি কমার পাশাপাশি রাজস্ব আহরণেও কিছুটা সুবিধা পাচ্ছে সরকার।
এছাড়া এসব পণ্য আমদানিতে রয়েছে আমদানি শুল্ক ও অগ্রিম আয়কর। এবং সবকিছুই বাড়ে বা কমে দাম বাড়া বা কমার সঙ্গে।
ম. তামিম বলছে, সরকার এসব ক্ষেত্রে ‘স্পেসিফিক ভ্যাট-ট্যাক্স করতে পারত’।
তবে অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা না করে সরাসরি সরকারের দাম বাড়ানোর সমালোচনা করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম।
সরকার আর কী করতে পারত- এমন প্রশ্নে তার ভাষ্য, “সরকারতো মূল্যবৃদ্ধি করার জন্য না। সরকার বিইআরসিতে (বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন) নিয়ে যাবে। এবং জনগণের ওই দামে কেনাটা, জ্বালানি কেনাটা যৌক্তিক কিনা, সেটা জনগণ যাচাই-বাছাই করবে। সেই যাচাই-বাছাই করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে জনগণকে সরকার।
“সরকার এখানে নিজেকে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে—যে জনগণের অধিকার খর্ব করেছে, জনগণের জ্বালানি সুবিচার পেতে দেয়নি, দিচ্ছে না। সুতরাং সরকারের হাতে একটা বিকল্প না, একটাই সরকারের দায়িত্ব ছিল–তার মূল্যবৃদ্ধি করার দরকার হলে তাকে বিইআরসিতে যেতে হবে।”
এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, “রাষ্ট্র আইন করে মূল্যবৃদ্ধি করা বা মূল্য পরিবর্তন করা বা নিয়ন্ত্রণ করা বা নির্ধারণ করার একক এখতিয়ার বিইআরসিকে দিয়েছে। সরকার নানা অজুহাতে সেই এবং সেখানে সেই ব্যবস্থা অচল করে রেখেছে।”
এভাবে সরকার জনগণকে অধিকার বঞ্চিত করার পাশাপাশি জ্বালানি নিয়ে সুবিচার পেতে দিচ্ছে না বলে তার অভিযোগ।
