Published : 11 May 2026, 09:50 PM
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ঋণ চুক্তির আওতায় যেসব শর্ত জুড়ে দিচ্ছে, তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ‘উপযুক্ত’ নয় বলে মনে করছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তার ভাষ্য, জনগণের প্রতি ‘দায়বদ্ধতা’ থেকে সরকার আইএমএফের সব কথা মানতে পারবে না।
সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বৈশ্বিক অস্থিরতায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে পথরেখা’ শীর্ষক আলোচনায় কথা বলছিলেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে বেশিরভাগ উন্নয়ন সহযোগীরা একমত। তারা আমার উন্নয়ন সহযোগী। ওরা যদি আমার সঙ্গে একমত না হয়, আমি তো এগোতে পারব না।
“সব জায়গায় আমরা একমত হচ্ছি না। অনেক জায়গায় দ্বিমত হচ্ছে, আইএমএফ-এর সঙ্গে দ্বিমত হচ্ছে। কারণ আইএমএফ যে শর্ত দিচ্ছে ওটা আমার অর্থনীতির জন্য, জনগণের জন্য সুইটেবল না।”
আইএমএফ এর শর্তের বিপক্ষে সরকারের অবস্থান জারি রাখার ব্যাখ্যায় আমির খসরু বলেন, “আমরা নির্বাচিত সরকার। আমাদের জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা আছে। তাদের কথা মত আমরা তো সব করতে পারব না।
“তাই কিছু বহুপক্ষীয় সংস্থার সঙ্গে আমাদের মতপার্থক্য রয়েছে। এই মতপার্থক্য চলতে থাকবে। কিন্তু আমি আমার কোর্স কারেকশন করব ততটুকু, যতটুকু আমার ইশতেহারের সঙ্গে থাকবে। এর বাইরে গিয়ে কিছু করা সম্ভব না।”
আইএমএফের সঙ্গে করা ঋণ চুক্তির বাকি অর্থ ছাড় করা নিয়ে শঙ্কার মধ্যে গত ১৮ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, ঋণ কর্মসূচি চালিয়ে নিতে আইএমএফের ‘ইতিবাচক’ মনোভাব রয়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ডিসিতে আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “এখনও আলোচনা (অর্থ ছাড়) চলছে। আলোচনার মধ্যে যেগুলো এখনও সমাধান হয়নি, সেসব সমাধান হবে।”
এর প্রায় তিন সপ্তাহ পর এসে আইএমএফের শর্ত না মানার দিকে সরাসরি ইঙ্গিত দিলেন আমির খসরু। অথচ আগের ঋণের সঙ্গে আরো ২০০ কোটি ডলার চাইছিল বাংলাদেশ।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবেলায় এ অর্থ চাওয়া হয়। তবে এর জন্য আইএমএফ সেসব শর্ত দিয়েছে, তা চলমান ঋণ চুক্তিতে থাকা শর্তের চেয়েও কঠিন বলে খবর এসেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আর্থিক সংকট সামাল দিতে কয়েক দফা আলোচনা শেষে ২০২৩ সালের প্রথম দিকে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশ।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের জুনে ঋণের অর্থ ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে নিলে মোট ঋণের আকার ৫৫০ কোটি ডলার হয়।
এর মধ্যে পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলারের ঋণ পেয়েছে বাংলাদেশ। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। ষষ্ঠ কিস্তি ও অবশিষ্ট অর্থ ছাড়ের সময় ছিল গত বছরের ডিসেম্বর।
তখন আইএমএফ জানায়, ঋণের অবশিষ্ঠ অর্থ ছাড় করা হবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে।
সেই অর্থ ছাড়ের আগে এখন ঋণের শর্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখতে চায় আইএমএফ। তবে রাজস্ব আদায়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন হয়নি।
‘এনবিআরে আসলে কোনো সংস্কার হয়নি’
অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের নামে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দুই ভাগ করতে অধ্যাদেশ জারিসহ যেসব কাজ করে গেছে সেগুলো ‘আসলে কোনো সংস্কার হয়নি’ বলে মনে করছেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে সংস্কার জরুরি। ওই সংস্কার যেটা শুরু হয়েছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়, উনারা একটা এনবিআরের বাইফারকেশন¬–পলিসি ও এক্সিকিউশন দুই ভাগে ভাগ করার পরিপ্রেক্ষিতে যেটা করে রেখে গেছেন, একচুয়ালি ইট ইজ হাফ-বেকড। এটা আসলে কোনো রিফর্ম হয়নি।
“এটা কিন্তু কিছু না থাকলে আমাদের জন্য সুবিধা। বাট ইফ ইউ আর লেফট উইথ হাফ-বেকড, তখন কিন্তু আপনার জন্য প্রবলেমেটিক। প্রথমে এটাকে আনডু করতে হবে, তো আবার রিফর্ম করতে হবে। সো দিস ইজ হোয়াট ইট ইজ রাইট নাও, দিস ইজ হোয়্যার উই স্ট্যান্ড।"
এ সময় তিনি এনবিআর দুইভাগের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা কমিয়ে ব্যবসায়ী ও পেশাজীবিদের মাধ্যমে নীতি প্রণয়নের ইঙ্গিতও দেন।
এনবিআর দুই ভাগ করে ২০২৫ সালের মে মাসে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব নীতি নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার।
সেই অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারদের আধিপত্য ও এনবিআরের দুই ক্যাডার তথা কর ও কাস্টমস ক্যাডারদের ক্যারিয়ারের পদন্নোতি ও ক্যারিয়ার শঙ্কায় বাতিলের দাবিতে কলম বিরতিসহ নানা কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলনে নামেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের আন্দোলনের মুখে সরকার পিছু হটে।
এ নিয়ে কর্মকর্তাদের ‘ক্যাডার দ্বন্দ্বের’ মধ্যে বিএনপি সরকার এসে এ সংস্কার অধ্যাদেশ আটকে দেয়। এখন এনবিআর দুইভাগ নতুন করে করার বার্তা দিলেন অর্থমন্ত্রী।
আমির খসরু বলেন, “বাংলাদেশের প্রতিটি খাতের মানুষের চাহিদা কী, খিদে কী, সমস্যা কী–ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে একেবারে প্রত্যেকটা সমাজের আপনার তাদের বোঝাপড়া থাকতে হবে। একদিকে যেরকম জিডিপি বাড়াতে হবে, অন্যদিকে জিডিপি বাড়ানোর জন্য আমার কোন এরিয়া থেকে জিডিপি বাড়াব, এটার সুস্পষ্ট বোঝাপড়া থাকতে হবে।"
তিনি এসময় যারা কর নীতি তৈরি করবে তাদের এবং অর্থমন্ত্রীর মধ্যে কোনো আমলাতান্ত্রিক বিষয় না টানারও কথা তুলে ধরেন।