Published : 08 Dec 2025, 08:59 PM
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামল থেকে খেলাপি ঋণের সংকট শুরু হলেও তা নিয়ে কখনও কোনো সংসদে যথাযথ আলোচনা হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান।
একই সঙ্গে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার মাধ্যম সংসদ হলেও সেখানে দুর্নীতি, সরকারের অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন বা উন্নয়ন চর্চার মত বিষয়ে সেই অর্থে কোনো আলোচনা হয়নি বলেও তুলে ধরেন তিনি।
সোমবার রাষ্ট্রায়ত্ত গবেষণা সংস্থা বিআইডিএসের বার্ষিক সম্মেলনে ‘উন্নয়ন ও গণতন্ত্র’ বিষয়ক আলোচনায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি ইতিহাসের এমন পাঠ মূল্যায়ন করেন।
‘অকার্যকর সংসদকে’ বড় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, “সংসদে যখন বাজেট অধিবেশন চলত, বিরোধী দল প্রায় সবসময়ই তা বর্জন করত। ফলে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য তাদের অর্থনৈতিক নীতিমালা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, দুর্নীতি এবং এসব বিষয়ে সংসদে কখনোই সেভাবে আলোচিত হয়নি।
“আপনারা কি কল্পনা করতে পারেন, জিয়াউর রহমানের শাসনামল থেকে বাংলাদেশে যে খেলাপি ঋণের সংকট শুরু হয়েছে এবং এত বছর ধরে চলে আসছে, তা নিয়ে সংসদে কখনোই যথাযথ আলোচনা হয়নি? এমনকি এ নিয়ে কোনো অর্থবহ বা জোরালো বিতর্কও অনুষ্ঠিত হয়নি।”
তিনি এ উদাহরণ টেনে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয় করার ক্ষেত্রে বাস্তবিক অর্থে যে সমস্যা রয়েছে তা কিছুটা আঁচ করা যাবে বলে তুলে ধরেন।
তবে খেলাপি ঋণ শুরুর সময়কার বিষয়ে বিস্তারিত আর কিছু বলেননি।
সংসদে কারা আসছেন সে বিষয়ে রেহমান সোবহান বলেন, বাংলাদেশের ‘এলিটরা’ অর্থ ও সম্পদ ব্যবহার করে ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসছেন।
“এটার মানে আপনারা এমন একটা সংসদ পাচ্ছেন যা ‘অভিজাতদের’, ‘অভিজাতদের দ্বারা’ এবং ‘অভিজাতদের জন্য’। এবং তারাই প্রকৃতপক্ষে নীতিনির্ধারণ করছে।”
এ সময় রাজনৈতিক সংস্কৃতির উদাহরণ বোঝাতে গিয়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের কথা তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “এটি মনে রাখা উচিৎ যে, ১৯৭০ সালে যারা সংসদে যাওয়ার জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, সেই সময়কার অধিকাংশ প্রার্থীই বাস ও রিকশায় চড়ে তাদের নির্বাচনি এলাকায় যেতেন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় তাদের আয় ও সম্পদের সক্ষমতা তেমনই ছিল।
“আর আজ, নিজের একটি পাজেরো গাড়ি না থাকলে কেউ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা কল্পনাও করতে পারেন না। বরং তাদের আকাঙ্ক্ষা থাকে যে, একবার নির্বাচিত হতে পারলেই সংসদ সদস্য হিসেবে বিশেষ সুবিধায় তারা অন্তত একটি শুল্কমুক্ত পাজেরো গাড়ি তো পাবেনই।”
সংসদ থেকে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার চর্চা শুরু না হওয়ার আক্ষেপ তুলে ধরে বর্ষীয়ান এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “আমাদের উন্নয়ন সংকট, সুশাসনের অভাব এবং সামগ্রিকভাবে আমরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি, তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো–এমন কোনো সংসদ আমরা পাইনি যেখানে ক্ষমতাসীন সরকারকে তাদের দুঃশাসন, নীতিমালা ও ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা সম্ভব ছিল।
“এমনকি ‘তথাকথিত গণতান্ত্রিক’ আমলেও বাজেটের ওপর যথাযথ আলোচনার মত পরিস্থিতি আমাদের ছিল না।”
বাজেটের মত বিষয়েও বিরোধী দলকে ‘বর্জন’ করতে দেখার হতাশার কথা বলেন তিনি।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পর্যটন ভবনে এ অধিবেশনে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক কেএএস মুরশিদ, পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য মঞ্জুর হোসেন ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক সুলতান হাফিজ রহমান। এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক।