“আমরা দেখছি কোথায় কী হল। ইপিবি নিজস্ব পদ্ধতিতে কীভাবে সরাসরি রপ্তানি তথ্য মিল-কারখানা থেকে সংগ্রহ করতে পারে, তা নিয়ে ভাবছি,” বলেন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী।
Published : 07 Jul 2024, 08:33 AM
পণ্য রপ্তানি ও রপ্তানি আয়ের মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য সমন্বয়ের পর তা উসকে দিয়েছে নানান আলোচনা; বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আসলে কত সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বড় ধরনের সমন্বয়ের পর নতুন হিসাবে প্রকৃত রপ্তানি আয়ের অঙ্ক কমেছে দেশের। এতে করে কতটুকু সমন্বয় হল এবং সমন্বয় শেষে প্রকৃত রপ্তানি আয় কত দাঁড়াচ্ছে তা এখনও প্রকাশ করেনি কোনো সংস্থা। এ নিয়ে নতুন কোনো তথ্যও দেওয়া হচ্ছে না। কবে তা জানা যাবে সেটিও কেউ বলছেন না।
বাংলাদেশের প্রকৃত রপ্তানি আসলে কত, এ প্রশ্নে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল আলম টিটু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ব্যাংক সমন্বয় করেছে, তারাই বলবে।’’
দেশের রপ্তানির তথ্য প্রকাশ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। এ প্রতিষ্ঠানের তথ্যকে উৎস হিসেবে দেখিয়ে রপ্তানি আয়ের তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ করে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত বৃহস্পতিবার সদ্য সমাপ্ত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল দেশের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের (বিওপি-ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) তথ্য প্রকাশ করলে রপ্তানির তথে বড় সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে আসে। এতে লেনদেনের চলতি হিসাব ও আর্থিক হিসাবের তথ্য উল্টে যায়।
রপ্তানি অনুযায়ী দেশে অর্থ আসছে না এমন বিতর্কের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিওপি প্রতিবেদনে বলা হয়, জাহাজীকরণ করা রপ্তানি পণ্যের তথ্য সংশোধনের পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) স্বীকৃত বিপিএম৬ পদ্ধতিতে স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রি ও সিএমটি (কাটিং, মেকিং অ্যান্ড ট্রিমিং) হিসাব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতেই প্রকৃত রপ্তানি কমে যাওয়ায় চলতি হিসাব, সার্বিক ভারসাম্য ও আর্থিক হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে বড় পরিবর্তন আসে।
বর্তমানে ইপিবির দেওয়া রপ্তানি তথ্য অনুযায়ী, দেশে রপ্তানি আয় কম আসছে ১৪ বিলিয়ন ডলারের মত।
নতুন হিসাবের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখপাত্র সাইফুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক মানে হিসাব শুরু করায় রপ্তানি আয় কমে আসার যে বিতর্ক দেখা দিয়েছিল তা অবসানের পাশাপাশি রপ্তানি ও রপ্তানি আয়ের মধ্যে থাকা ব্যবধান কমে আসবে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ব্যাংক রপ্তানি আয়ের তথ্য সংরক্ষণ করে। এখন থেকে দেশের বাইরে প্রকৃত রপ্তানি কত হল শুধু তাই ধরবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর বিপরীতে রপ্তানি আয় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
‘‘নতুন পদ্ধতিতে রপ্তানি ও আয়ের মধ্যে থাকা ব্যবধান কমে আসবে।’’
ব্যবধান কত
সবশেষ গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১০ মাসে ইপিবি’র তথ্য অনুযায়ী রপ্তানি হয় ৪৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে এ সময়ে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৩৩ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি ও আয়ে ব্যবধান ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলার।
হিসাবের এমন ব্যবধান নিয়ে ইপিবির দেওয়া রপ্তানি তথ্যে এর আগেও ২০০৮-০৯ অর্থবছর আপত্তি জানিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন এক নির্বাহী পরিচালকের নেতৃত্বে একটি কমিটিও করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
সেই কমিটির সুপারিশ ছিল, প্রকৃত রপ্তানির তথ্য হিসাব করে রপ্তানি আয় নির্ধারণ করার। কিন্তু পরে তা বাস্তবায়ন হয়নি।
সেই থেকে ধীরে ধীরে রপ্তানি ও আয়ের ব্যবধান বেড়েছে। পণ্য রপ্তানির পর আয় দেশে আনতে ১৮০ দিন সময় পান উদ্যোক্তারা। তাতে কিছু অর্থ বিদেশে থাকার তথ্য থাকে হিসাব-নিকাশে। এর পরিমাণ সাধারণত ৪-৫ বিলয়ন ডলার হয়।
তবে গত কয়েক বছর থেকে ব্যবধান বড় হলে রপ্তানির পরিমাণ এবং রপ্তানিকারকদের দেশে অর্থ না আসার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা। রপ্তানির আড়ালে অর্থপাচার নিয়ে যেমন আলোচনা সমালোচনা হয় তেমনি বাংলাদেশ ব্যাংক বারবার তাগাদা দিলেও ডলার সংকটের সময় উদ্যোক্তারা কেন রপ্তানি আয় দেশে আনছেন না তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বারবার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী রপ্তানি আয় দেশে আসে
>> ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫০ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার।
>> ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫২ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার।
>> ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪০ দশমিক ৬৩ বিলয়ন ডলার।
এ তিন অর্থবছরে ইপিবির তথ্য অনুযায়ী রপ্তানি হয়
>> ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬৩ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার।
>> ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬০ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার।
>> ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৮ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার।
এ দুই হিসাবের পার্থক্য
>> ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলার।
>> সদ্য সমাপ্ত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল সময়ে (১০ মাসে) এ পার্থক্য ১৪ বিলিয়ন ডলার।
আয় কম এসেছে সবচেয়ে বেশি পোশাক খাতে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে এ সময়ে মোট রপ্তানি আয়ে ৮৩ শতাংশ ভূমিকা রাখা তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় দেশে আসে
>> ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৬ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার।
>> ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩৬ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার।
>> ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৮ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার।
ইপিবির হিসাবে এ সময়ে রপ্তানি হয়েছে
>> ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪৬ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার।
>> ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪২ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার।
>> ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবির তথ্যে ব্যবধান
>> ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১০ বিলিয়ন ডলার।
>> ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার।
>> ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার।
যেভাবে হিসাব করছে বাংলাদেশ ব্যাংক
দেশের সীমান্ত পার হয়ে স্থল, জল ও আকাশপথে যে পণ্য ও সেবা বিদেশে যাবে সেই পরিমাণকে প্রকৃত রপ্তানি ধরবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর বিপরীতে চুক্তি অনুযায়ী যে অর্থ আসার কথা তাই রপ্তানি আয় হিসেবে গণ্য করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে রপ্তানি আদেশের পর দেশের অভ্যন্তরে বৈদেশিক মুদ্রায় কোনো লেনদেন হলেও তা চূড়ান্ত রপ্তানি হিসাবে যোগ হবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত সাইফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘দেশের বাইরে প্রকৃত রপ্তানি কত হচ্ছে তা ধরবে বাংলাদেশ ব্যাংক। তা ধরে রপ্তানি আয় দেশে আসছে কি না, দেখবে বাংলাদেশ ব্যাংক।’’
যেভাবে রপ্তানির হিসাব হচ্ছে
তৈরি পোশাক খাতসহ বিভিন্ন খাতের নমুনা (স্যাম্পল) বিদেশে পাঠানো হয়। পাঠানোর সময়ে তাতে শুল্ক দেওয়ায় এটিকেও রপ্তানি দেখাচ্ছে ইপিবি।
তৃতীয় কোনো দেশে রপ্তানির জন্য অর্থাৎ যে পণ্য দেশের অভ্যন্তরে ব্যবহৃত হবে না শুধু বন্দর হয়ে অন্য কোনো দেশে চলে যাবে-এমন পণ্যও রপ্তানি হিসাবে যোগ হচ্ছে।
অন্যদিকে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের জন্য সুতা ও কাপড় তৈরি করে বস্ত্র কারখানাগুলো। এসবের কাঁচামাল হিসেবে তুাঁ আমদানি করা হয়। শুধু রপ্তানিমুখী শিল্পে সরবরাহ করায় তারা ক্রেতাদের থেকে বিদেশি মুদ্রায় বিক্রয় মূল্য নেয়। বৈদেশিক মুদ্রায় (স্থানীয় এলসি) দেশের অভ্যন্তরে এমন লেনদেন হওয়ায় এটিকে প্রচ্ছন্ন রপ্তানি (ডিম এক্সপোর্ট) ধরা হয়। এটি রপ্তানি প্রণোদনা পাওয়ায় ইপিবি মোট রপ্তানিতে এ তথ্য যোগ করছে।
বিষয়টি ব্যখ্যা করে নাম প্রকাশ না করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, কোনো রপ্তানিকারক বিদেশ থেকে ১০০ ডলারের পণ্য রপ্তানির আদেশ (এলসি) পেলেন। তিনি এর বিপরীতে ৫০ ডলারের কাচাঁমাল নিলেন অভ্যন্তরীণ কোনো কোম্পানি থেকে। দেশি এ কোম্পানি কাঁচামাল আমদানি ও তাতে মূল্য সংযোজন করে রপ্তানিকারক কোম্পানির কাছে বিক্রি করলেন। যেহেতু কাঁচামাল আমদানি করতে হয় তাই পুরো অর্থ সরবরাহকারী কোম্পানি বিদেশি মুদ্রায় নিলেন, এটিই ডিম এক্সপোর্ট।
রপ্তানিকারক কিন্তু পণ্য রপ্তানির পরে ১০০ ডলারই পাবেন বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে। এর চেয়ে বেশি অর্থ দেশে আসবে না। রপ্তানিকারক দেশে আসা ১০০ ডলারের মধ্যে থেকেই কাঁচামাল সরবরাহকারীকে ৫০ ডলার পরিশোধ করবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এ পদ্ধতিতেই হিসাব করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অর্থনীতির বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ‘ডাবল কাউন্টিং’ বা দুই বার গণনা হওয়ায় বেড়ে যাচ্ছে রপ্তানির পরিমাণ। ডাবল কাউন্টিং হচ্ছে স্যাম্পল, তৃতীয় দেশে যাওয়া পণ্য, ডিম এক্সপোর্ট, সীমান্ত পার হওয়া চূড়ান্ত রপ্তানি, রপ্তানির জন্য আসা পণ্য ব্যবহৃত না হলে পুনরায় ফেরত পাঠানোর তথ্য যোগ হওয়ার কারণে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র বলছেন, এ হিসাব পদ্ধতিতে শুধু মূল রপ্তানি আদেশ (মাস্টার এলসি) এর বিপরীতে সীমান্ত পার হওয়া রপ্তানিকে প্রকৃত রপ্তানি ধরবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর বিপরীতে যে আয় আসবে সেটিই হবে রপ্তানি আয়।
তিনি বলছেন, ‘‘এ হিসাব পদ্ধতিতে রপ্তানি ও আয়ের ব্যবধান কমে আসবে। এখনকার পরিস্থিতিতে প্রতি বছরে তা এক বিলিয়ন ডলারের মত হবে, বা তার আশপাশেই থাকবে।’’
ইপিবির তথ্যে হেরফের নেই: বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী
বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল আলম টিটু বলেন, রপ্তানি তথ্য-উপাত্ত এনবিআর প্রতি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবিতে পাঠায়। এর প্রেক্ষিতে রপ্তানির জাহাজীকরণের তথ্য ইপিবি প্রকাশ করে।
‘‘ইপিবির তথ্যে কোনো হেরফের নেই। ইপিবি সরাসরি কোনো রপ্তানির তথ্য সংগ্রহ করে না। এনবিআর থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তা উপস্থাপন করে।’’
তথ্যে গড়মিলে বড় সমন্বয় করার প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের যেটা করা উচিত ছিল, প্রাইমারিভাবে তথ্য সংগ্রহ করা বা এনবিআর থেকে তথ্য নিয়ে প্রেজেন্টেশনের (উপস্থাপনের) আগে ডিউ-ডিলিজেন্স ঠিক করে দেওয়া।’’
ডাবল কাউন্টিংসহ বাকি বিষয়গুলোতে নজর রাখা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা দেখছি কোথায় কী হল। ইপিবি নিজস্ব পদ্ধতিতে কীভাবে সরাসরি রপ্তানি তথ্য মিল-কারখানা থেকে সংগ্রহ করতে পারে, তা নিয়ে ভাবছি।’’