হালদার দুই তীরে ২৪ শতাংশ বিদেশি উদ্ভিদ, উজানে বাড়ছে লবণাক্ততা
নদীর উজানে লবণাক্ত পানির প্রভাব দেখেছেন গবেষকরা; চিহ্নিত করেছেন দূষণের ৫৭টি উৎস।
চট্টগ্রামের হালদা নদীর উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত ৮১ কিলোমিটার এলাকায় দুই তীরে ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত করেছেন গবেষকরা, যার মধ্যে ২৪৪টি প্রজাতিই বিদেশি।
নদীর উজানে লবণাক্ত পানির প্রভাব দেখেছেন গবেষকরা; চিহ্নিত করেছেন দূষণের ৫৭টি উৎস।
শনাক্ত উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে ২৩টি বিপন্ন এবং আরও ১০০টি প্রজাতি ভবিষ্যতে বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষকদের মতে, নদীতীরের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস, দূষণ ও বিদেশি উদ্ভিদের বিস্তার হালদার জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
মঙ্গলবার চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে বেসরকারি সামাজিক উন্নয়ন ও গবেষণা সংস্থা ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান অপিনিয়ন (ইকো) এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত গবেষণাটি পরিচালিত হয়। ইকো বলছে, হালদা নদীর উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত ৮১ কিলোমিটার অংশের দুই তীরের উদ্ভিদবৈচিত্র্য নিয়ে এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ জরিপ এই প্রথম।
কার্পজাতীয় মাছের ডিম সংগ্রহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হালদা নদীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে উদ্ভিদ প্রজাতির বৈচিত্র্য, বিস্তার এবং ঝুঁকি চিহ্নিত করাই ছিল গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য।
গবেষণায় নেতৃত্বদানকারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, হালদার দুই তীরে মোট ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে বড় বৃক্ষ ২১২, গুল্ম ১৩৩, লতা ১৩৩, বীরুৎ ৫২২ এবং পরজীবী উদ্ভিদ ৯ প্রজাতির।
তিনি বলেন, শনাক্ত প্রজাতির মধ্যে দুটি নগ্নবীজি, সাতটি ছত্রাক, ১৩টি মসগোত্রীয় ও ৩৫টি ফার্ণ প্রজাতি রয়েছে। স্থানীয় প্রজাতি রয়েছে ৭৬৫টি এবং বিদেশি প্রজাতি ২৪৪টি।
গবেষণায় দেখা গেছে, নাজিরহাট সেতু থেকে নারায়ণহাটের আগ পর্যন্ত নদীর দুই তীরে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো উদ্ভিদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম।
অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, “এর অন্যতম সম্ভাব্য কারণ হল নদীর উভয় তীরে কৃষিকাজ ও ফসল চাষের ব্যাপকতা, যা প্রাকৃতিক উদ্ভিদের বিস্তার ও আবাসস্থলকে সীমিত করতে পারে।”
গবেষণা তত্ত্বাবধানকারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক সভাপতি ও মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শেখ বখতিয়ার উদ্দিন বলেন, নদীর দুই পাড়ের পাহাড়ি এলাকায় বিদেশি প্রজাতির গাছ লাগানোর প্রবণতা বেড়েছে। এসব গাছ নদীতীরের স্থানীয় পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, “ওই অংশে নদীর দুই পাড়ে পাহাড়ে বিদেশি প্রজাতির অনেক গাছ লাগিয়ে ফেলেছে মানুষ। নদীতীরে যদি এ ধরনের গাছ লাগানো হয়, ওই জায়গার পরিবেশও ধ্বংস হয়, সঙ্গে সঙ্গে এই নদীর পরিবেশও ধ্বংস হয়।
“বর্ষায় অতি বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে যে পানির সংকট হয়, এর মূল কারণ উপযুক্ত জায়গায় উপযুক্ত গাছ লাগানো হয় না।”
বিদেশি উদ্ভিদ নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে দীর্ঘ সময় নিতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, “কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই আমরা যখন বিদেশি উদ্ভিদ আমাদের এখানে নিয়ে আসি, সেটা পরিবেশ বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে।”
হালদার দুই তীরে ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি, সেগুন, জারুল, মেহগনি ও মিঞ্জিরিসহ ২৪৪টি বিদেশি উদ্ভিদ প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে। এসব প্রজাতি মোট শনাক্ত উদ্ভিদের প্রায় ২৪ শতাংশ।
অধ্যাপক শেখ বখতিয়ার উদ্দিন বলেন, নদীতীরের পাহাড়ি এলাকায় এসব গাছের বাগান গড়ে উঠছে। “এসব গাছের নিচে কোনো ছোট গাছ হয় না। এতে উপরিস্তরের মাটি শক্ত হয়ে যায়। যার ফলে বৃষ্টির পানি ওই পাহাড়ের ভিতরে প্রবেশ করতে পারে না।
“বিপরীতে আমাদের দেশীয় গাছের নিচে অন্য প্রজাতির গাছও হয়। কারণ এই পরিবেশের সঙ্গে তারা হাজার হাজার বছর ধরে সম্পৃক্ত।”
নদীর দুই তীরের কিছু এলাকায় পাহাড় কেটে ও জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষাবাদ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, চাষাবাদে ব্যবহৃত সার ও কীটনাশক নদীতে গিয়ে মিশলে তা দূষণের কারণ হতে পারে।
৫১৭ প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদ
গবেষণায় হালদার দুই তীরে ৫১৭ প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদ শনাক্তের কথা বলা হয়েছে। এসব উদ্ভিদের মধ্যে কুর্চি, বচ, আপাং, সুগন্ধমূল, অর্কমূল, কালমেঘ, বেগনিয়া, বন অড়হর, হিজল, ছাতিম, আকন্দ, তুফানি লতা, হাতিশুঁড়, সোনালু ও স্বর্ণলতা উল্লেখযোগ্য।
শনাক্ত ২৩টি বিপন্ন উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে রয়েছে বাটনা, লেইস্যা গর্জন, চাউ তাল, ঈশ্বরমূল, নেরা মিলাতি, পাখা ঢেকিয়া, বনিপদ, মাইল্লা আম, পানি জাম ও চাল মুগড়া।
এ ছাড়া সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে বিপন্ন হতে পারে এমন ১০০টি প্রজাতির মধ্যে রয়েছে নীল ভুট্টা, তেজবহুল, কুর্চি পাম, নাট আলকুশি, খনা, অশোক, বরুণ ও লবঙ্গ লতা।
অধ্যাপক মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল বলেন, “লেইস্যা গর্জন ও পাখা ঢেকিয়ার মত বেশ কিছু দুর্লভ প্রজাতির উদ্ভিদের সন্ধান পাওয়া গেছে, আগে যেগুলোর চট্টগ্রাম জেলায় উপস্থিতির কোনো নির্ভরযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি।
“আগে কোনো পূর্ণাঙ্গ গবেষণা হয়নি। এবার পাওয়া ১ হাজার ২৯টি প্রজাতির মধ্যে ৭২৯টি উদ্ভিদের প্রথম রেকর্ড পাওয়া গেল। এসব উদ্ভিদের উপস্থিতি হালদাতীরের উদ্ভিদবৈচিত্র্যের সমৃদ্ধি ও বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব তুলে ধরছে।”
নদীদূষণ, দখল ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে বিপন্ন প্রজাতিসহ অন্যান্য উদ্ভিদও হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেন তিনি।
দূষণের একাধিক উৎস, উজানে লবণাক্ততার ইঙ্গিত
হালদা নদীর উৎপত্তিস্থলের কাছাকাছি এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে ছোট-বড় একাধিক জলধারা থেকে নদীতে পানি আসার প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকরা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় জলধারাটির অবস্থান খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার পাতাছড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের গরুকাটা এলাকায়।
অধ্যাপক মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল বলেন, “এতদিন নদীর উৎপত্তিস্থল হিসেবে রামগড় উপজেলার হাসুকপাড়ার উল্লেখ পাওয়া গেছে। তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে হাসুকপাড়ার জলধারাটি চিকন একটা নালার মত। কিন্তু গরুকাটার জলধারাটি অনেক বড়।
“হাসুকপাড়ার পাশাপাশি গরুকাটাকেও হালদার উৎস হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এর বাইরেও অনেক ছোট ছোট জলধারা নেমে এসেছে হালদায়।”
নদীর উজানে ম্যানগ্রোভ অঞ্চলের নির্দেশক উদ্ভিদ কেওড়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, গবেষণায় কর্ণফুলীর মোহনা মদুনাঘাট থেকে হাটহাজারীর নাঙ্গলমোড়া পর্যন্ত কেওড়াগাছের উপস্থিতি দেখা গেছে।
এ থেকে উজানের দিকে লবণাক্ত পানির প্রভাব বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, এটি নদীর স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য হুমকি।
এ ছাড়া গবেষণায় হালদার পানি দূষণের ১৩টি, বায়ুদূষণের ১০টি ও মাটিদূষণের ১১টিসহ বিভিন্ন ধরনের দূষণের ৫৭টি উৎস শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি উৎস সরাসরি নদীদূষণ করছে।
গবেষণায় সহযোগী নেতৃত্বে ছিলেন ইকোর সায়েন্টিফিক অফিসার মো. খন্দকার রাজিউর রহমান, সজীব রুদ্র, মো. আরিফ হোসাইন, মো. শহিদুল ইসলাম, টুকি মারমা ও সনাতন চন্দ্র বর্মন।
এ গবেষণার সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলসের (বিএসআরএম) হেড অব সিএসআর রুনি রহমান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
