Published : 03 Mar 2026, 03:05 PM
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে গলায় ছুরিকাঘাতে শ্বাসনালী কাটা অবস্থায় উদ্ধার হওয়া আট বছরের সেই মেয়েটি মারা গেছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার ভোরে মারা যায় জান্নাতুল নেসা। বাড়ির সবাই তাকে ডাকত ‘ইরা মনি’ বলে। তার বাবা মনিরুল ইসলাম পেশায় একজন টমটম চালক, বাড়ি সীতাকুণ্ডের ছোট কুমিরা মাস্টার পাড়ায়।
স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল ইরা।
বাড়ি থেকে সাত থেকে আট কিলোমিটার দূরে পাহাড় এবং সেখান থেকে আরও হাজার ফুট উপরে গহীন পাহাড়ি জঙ্গলে মেয়েটি কীভাবে গিয়েছিল, অথবা কে বা কারা তাকে সেখানে নিয়ে যায় সে হিসেব মিলাতে পারছেন না প্রতিবেশী ও স্বজনরা।
সীতাকুণ্ডের বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাহাড়ে রোববার দুপুরে পাহাড়ে সড়ক সংস্কার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা ‘গলা কাটা অবস্থায়’ ইরা মনিকে দেখতে পান। জঙ্গল থেকে পায়ে হেঁটে শিশুটি শ্রমিকদের কাছে পৌঁছেছিল।
এরপর শ্রমিকরা শিশুটিকে নিয়ে যায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখান থেকে তাকে পাঠানো হয় চট্টগ্রাম মেডিকেলে। সেখানে দুদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ইরা মনি মারা যায় বলে জানিয়েছে প্রতিবেশীরা।
সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঘটনাস্থল থেকে শিশুটির বাড়ির দূরত্ব সাত কিলোমিটারের বেশি। আমরা বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছি। এর রহস্য উদঘাটনে আমরা কাজ করছি।”
সকালে হাসপাতালে প্রতিবেশী মো. সুজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইরা মনির বাবা বারবার জ্ঞান যাচ্ছিলেন মেয়ের শোকে। তাই তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ৩৫ দিন বয়সী ছোট মেয়েকে রেখে তার মা আসতে পারেনি হাসপাতালে।”
তিনি জানান, ইরা মনিদের বাসা থেকে মিনিট কয়েকের দূরত্বে তার দাদার বাড়ি। অনেক সময়ে নিজের বাসা থেকে দাদার বাড়িতে চলে যেত ইরা। রোববার সকাল ৯টার দিকে দাদার বাড়িতে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়েছিল মেয়েটি।
“এরমধ্যে কীভাবে সে বাড়ি থেকে সাত থেকে আট কিলোমিটার দূরে সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাহাড়ে গেল সেটি কোনোভাবেই আমরা মেলাতে পারছি না। এমন কোনো ঘটনা না যে তার বাবার সাথে কারো ঝামেলা আছে বা তার বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো।”
পরিবারের সদস্যদের বরাতে সুজন বলেন, ওইদিন দুপুরে বাড়িতে গিয়ে ইরার বাবা তার স্ত্রীর কাছে মেয়ের খোঁজ করেন। তখন ইরার মা বলেন, মেয়ে দাদার বাসায় গিয়েছে। তখন তিনি তার ভাইকে ফোন করে ইরার খোঁজ জানতে চাইলে তাকে জানানো হয়, ইরা সেখানে যায়নি।
স্বজন ও প্রতিবেশীরা প্রথমে সোশাল মিডিয়ায় ইরার রক্তাক্ত ছবি দেখতে পান। তারপর তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে ইরার সন্ধান পান বলে সুজন জানিয়েছেন।
ইরার চাচাত ভাই জুনায়েদ আল হাবিব বলেন, পুলিশ ও র্যাব এসে গ্রামের ও আশেপাশের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও সংগ্রহ করে কাজ করছে।
“গতকাল (সোমবার) র্যাব ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। আমরাও সেখানে গিয়েছিলাম।”
জুনায়েদের ভাষ্য, তাদের বাড়ি থেকে বোটানিক্যাল গার্ডেনে যেতে হলে মহাসড়ক ধরে বাস কিংবা সিএনজিচালিত অটো রিকশা করে যেতে হবে।
“একটি শিশুর পক্ষে এভাবে করে সেখানে যাওয়ার কথা না। আমরাও বুঝতে পারছি না সে কীভাবে সেখানে গেল। আমাদের এলাকা থেকে মহাসড়ক ধরে অন্তত সাত কিলোমিটার গেলে বোটানিক্যাল গার্ডেনের সড়ক। মূল সড়ক থেকে অন্তত আরও দুই কিলোমিটার গেলে বোটানিক্যাল গার্ডেনের গেইট।
“এরপর মূল গেইট থেকে আরও অন্তত তিন কিলোমিটার গেলে সহস্রধারা ঝর্ণা, সেই ঝর্ণা থেকে অন্তত আরও কয়েকশ গজ গহীন জঙ্গলের ভেতর ইরাকে গলা কেটে দেওয়া হয়।”
স্কেভেটর চালকের বরাতে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি বর্ণণা করে জুনায়েদ বলেন, “পাহাড়ে সড়ক নির্মাণের জন্য স্কেভেটর দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছিল। সে স্কেভেটর চালক ইরা মনিকে হেঁটে আসতে দেখে অন্য শ্রমিকদের খবর দেয় এবং সেখান থেকে মাটি টানার ট্রাকে করে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
“গলা কাটা রক্তাক্ত অবস্থায় এক শিশুকে হেঁটে আসতে দেখে স্কেভেটর চালক প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। শিশুটি তার সামনে আসার পর সে কথা বলতে পারছিল না এবং গোঙানির মত শব্দ করছিল।”
স্কেভেটর চালক জানিয়েছেন, তখন তিনি অন্য শ্রমিকদের খবর দেয় এবং গাড়ি নিয়ে আসতে বলেন। সেই গাড়ি নিয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
জুনায়েদ বলেন, যে জায়গায় ইরাকে গলা কেটে দেওয়া হয় সেটি বোটানিক্যাল গার্ডেনের বাইরের অংশ বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।