Published : 23 Sep 2025, 03:55 PM
মাজার ও মন্দিরে হামলাকারীদের ‘অপরাধী’ অভিহিত করে তাদের কোনো ধর্মীয় পরিচয় ‘নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন।
মঙ্গলবার চট্টগ্রামের গোল পাহাড় কালী মন্দির ও শ্মশান পরিদর্শন করে কথা বলছিলেন এই উপদেষ্টা।
সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ যাতে কেউ নষ্ট করতে না পারে সে জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এ সময় আসন্ন দুর্গাপূজার উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিতে তাগিদ দেন। মণ্ডপে হামলার শঙ্কা থাকলে যে কোনো ধর্মের মানুষের সযোগিতা চাইতেও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, “কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। এটা অনেকটা পলিটিক্যালি মোটিভেটেড। মাজারেও হামলা চালায়। মন্দিরও তারা অপবিত্র করার চেষ্টা চালায়। আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। যাতে আমাদের এই সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশকে কেউ বিনষ্ট করতে না পারে।
“যারা উপাসনালয়, যে কোন ধর্মের উপাসনালয়- মাজার, ধর্মীয় স্থাপনা যারা অপবিত্র করতে চায় বা পাথর নিক্ষেপ করে, তারা অপরাধী। তাদের কোন ধর্মীয় পরিচয় নাই।”
সনাতন ধর্মের মানুষদের উদ্দেশ্যে ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, “আগামী দিনে যে দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে, মণ্ডপে মন্দিরে সিসি ক্যামরা বসান। রাতের বেলায় অনেক সময় হামলা হয়। অন্ধকারের ভেকরে ঢিল মারে। আমাদের আইশশৃঙ্খলাবাহিনী সক্রিয় রয়েছে। আজ থেকে বিভিন্ন জায়গায় গোয়েন্দারাও তৎপরতা চালাবে।
“আপনারা যদি আশঙ্কা করেন তাহলে হটলাইনে রিং করবেন। মুহূর্তের ভিতরে প্রশাসন আপনাদের পাশে এসে দাঁড়াবে। লোকাল পিপলকে আপনারা ইনভলভ করেন। আশেপাশে যে ধর্মের মানুষই থাকুক তাদের সহযোগিতা চান। তাহলে দুর্গাপূজার যে উৎসব তা উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন করতে পারবেন।”
তিনি বলেন, “কেউ যদি ধর্ম অবমাননা করে থাকে, কটূক্তি করে থাকে, ব্যঙ্গ করে থাকে। ওই ব্যক্তি নিজে এর জন্য দায়ী। সম্প্রদায় দায়ী নয়। কিন্তু আমরা অনেক সময় আইন হাতে তুলে নিই। গিয়ে ওখানে হামলা করি মামলা করি লুটপাট করি। আইন হাতে নিলে আইনের শাসন নষ্ট হয়ে যাবে।
“অপরাধের শাস্তি হবে। তার জন্য নিরাপরাধ মানুষের বাড়ি ঘর আক্রান্ত হতে পারে না। আমরা সবসময় এ ব্যাপারে সচেতন আছি। অতীতের মত এখনও আছি আগামী দিনেও আমরা মিলেমিশে থাকতে চাই। এদেশ আমাদের সবার।”
যারা সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি রাখেন তাদের ‘মানবিকতা বোধ থাকে না’ মন্তব্য করে উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, “অসাম্প্রদায়িক মানুষের ভিতরে মানবিকতা বোধ থাকে। আমি যখন কোন অভাবগ্রস্ত, অসুখী, দুঃখী মানুষ দেখি আমি তার ধর্ম পরিচয় জানতে চাই না। সে যে মানুষ এটাই আমার কাছে বড়।
“আমরা মানবতার জয়গান গাইতে চাই। ধর্ম যার যার সে পালন করবে। এদেশে আমাদের সবার। আমরা প্রত্যেকে নির্বিঘ্নে আমাদের ধর্মীয় যে চর্চা, ধর্মের যে উৎসব, ধর্মীয় যে উপাসনা এটা আমরা চালিয়ে যাব। আমরা চাই, আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্যের রোল মডেল হিসেবে দুনিয়াতে পরিচিত হোক।”
তিনি বলেন, “আমাদের প্রতিবেশী অনেক দেশ আছে। তার তুলনায় আমরা এটাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করতে চাই। কেউ যদি কোন অপরাধ করে থাকে সেই অপরাধের জন্য ব্যক্তি দায়ী হবে। সম্প্রদায় নয়।
“এই যে নানা ধর্ম নানা বর্ণ নানা জাতি, মসজিদে আজান হয়, মন্দিরে শঙ্খ ধ্বনি হয় এই বৈচিত্র তার মাঝেই আমাদের ঐক্যকে ধরে রাখতে হবে। আমাদের অন্তরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। আমি আমার ধর্ম চর্চা করব। অন্যরা যাতে নির্বিঘ্নে পালন করতে পারে সেই সুযোগও আমাকে করে দিতে হবে।”
তিনি বলেন, “মুসলমান, বৌদ্ধ, হিন্দু, খ্রিস্টান ও নৃ-জাতি গোষ্ঠীর মানুষের অধিবাস আমাদের এই বাংলায়। একটা নিরাপদ আবাসভূমি হিসেবে আমরা এদেশকে গড়ে তুলতে চাই। প্রত্যেককে তার নিজ নিজ ধর্ম একেবারে নির্বিঘ্নে পূজা পার্বণ ধর্মচচা উদযাপন করব। প্রতিটি ধর্মের অনুসারী এটা করতে পারবে। এটা আপনাদের সাংবিধানিক অধিকার।
আসন্ন দুর্গাপূজা নিয়ে সরকার সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, “নিরাপত্তার ব্যবস্থা আমরা নিশ্চিত করেছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে আমরা বৈঠক করেছি। স্বাধীন সার্বভৌম এই বাংলাদেশই আমাদের ঠিকানা। আমরা এই দেশকে ভালোবাসি। এদেশের যত অর্জন, নানা ধর্ম নানা বর্ণ নানা জাতির মানুষের অবদান আছে। আমরা কারো অবদানকে খাটো করতে চাই না।”
নিউ ইয়র্কে যাওয়ার আগে প্রধান উপদেষ্টা দুর্গাপূজার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানিয়েছে ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন।
তিনি বলেন, “উনি যাওয়ার সময় আমাকে ডেকে বলে গেছেন, আমার আসতে আসেত তো দশমী হয়ে যাবে। আমাকে বললেন, তুমি সতর্ক থাকো। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সাথে আলাপ করে যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে পূজাটা উদযাপন করতে পারে এজন্য তোমাকে রাতদিন পরিশ্রম করতে হবে।
“গতকাল কক্সবাজার গিয়েছি, আজ চট্টগ্রাম হয়ে খাগড়াছড়ি এরপর ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনে অনুষ্ঠান আছে। আপনাদের সহযোগিতা চাই। আসুন সবাই মিলে আমাদের প্রিয় এই মাতৃভূমিকে শান্তির নিবাস হিসেবে গড়ে তুলি।”
অনুষ্ঠানে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাষ্টি দীপক কুমার পালিত এবং মন্দির কমিটির নেতৃরা উপস্থিত ছিলেন।