Published : 03 Aug 2025, 08:16 AM
বর্হিনোঙ্গরে জাহাজের জট ছাড়াতে বন্দরের পথে চলাচল করা জাহাজের সংখ্যা কমাতে চায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, যা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন।
শিপিং এজেন্টরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে যেখানে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা বাড়াকে স্বাগত জানানো হয়, সেখানে চট্টগ্রাম বন্দর উল্টো পথে হাঁটছে।
এতে করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ‘নেতিবাচক’ প্রভাব পড়বে এবং বন্দরের ভাবমূর্তি ‘ক্ষুণ্ন হবে’ বলে মনে করছেন অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ।
গত কিছুদিন ধরেই চট্টগ্রাম বন্দরের বর্হিনোঙ্গরে জাহাজের গড় অবস্থানের সময় বাড়ছে; তাতে দীর্ঘ হচ্ছে অপেক্ষমান জাহাজের সারি। সেইসঙ্গে বন্দরের ইয়ার্ডে জমে থাকা কন্টেইনারের পরিমাণও বাড়তির দিকে।
এজন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ চলাচলকারী জাহাজগুলোর মধ্যে নূন্যতম ১৫টি কমিয়ে আনতে চায়। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের পথে ১১৮টি কন্টেইারবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি আছে।
জাহাজের সংখ্যা কমিয়ে আনতে বন্দরের পক্ষ থেকে শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।
শিপিং ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে চলাচলরত জাহাজগুলো মূলত এখান থেকে বিভিন্ন পণ্যবাহী কন্টেইনার পরিবহন করে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরগুলোতে, যেমন সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং, কলম্বো বন্দরে নিয়ে যায়। সেখান থেকে মাদার ভ্যাসেলে করে কন্টেইনারে থাকা পণ্য পরবর্তী গন্তব্যে যায়।
এ অবস্থায় বন্দরের পথে জাহাজের সংখ্যা কমিয়ে আনা হলে সেসব বন্দরে বাংলাদেশি আমদানি-রপ্তানির কন্টেইনার জট বাড়বে বলে তারা মনে করছেন।
শিপিং এজেন্টস অ্যাসেসিয়েশনের নেতাদের ভাষ্য, জট কমানোর বিষয়টি বন্দরের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। জাহাজজট ও ইয়ার্ডে পড়ে থাকা কন্টেইনারের পরিমাণ কমাতে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা না কমিয়ে অন্য উপায় বের করা উচিত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম বন্দরের এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, চলতি বছরের শুরুর দিকে বন্দরে চলাচলের জন্য মোট অনুমোদিত জাহাজ সংখ্যা ছিল ৯৬টি। তখন বর্হিনোঙ্গরে জাহাজের গড় অবস্থানকাল ছিল এক থেকে দুই দিন। অপেক্ষমান জাহাজ থাকত সাত থেকে আটটি। পরে নানা কারণে অ্যাডহক ভিত্তিতে কিছু জাহাজ চলাচলের অনুমোদন দেয়া হয়।
“এখন ১১৮টি জাহাজ চলাচলের অনুমতি রয়েছে। ফলে জাহাজ জট বেড়ে যাচ্ছে। বর্তমানে জাহাজের গড় অবস্থানকাল আগের চেয়ে বাড়ার পাশাপাশি অপেক্ষমান জাহাজের সারিও দীর্ঘ হচ্ছে।”
বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা পর্যন্ত বন্দরে বর্হিনোঙ্গরে অপেক্ষমান ছিল ২১টি কন্টেইনার জাহাজ। জাহাজের গড় অপেক্ষা সময় ছিল চার দিন থেকে ১০ দিন।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের কাছে বন্দরের পথে চলাচলরত জাহাজের সংখ্যা কমাতে সহযোগিতা চাওয়া হয়। এছাড়া ছোট জাহাজের বদলে বেশি কন্টেইনার ধারণ করা যায় তেমন জাহাজের সংখ্যা বাড়াতে উৎসাহিত করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এ নিয়ে গত ২০ জুলাই শিপিং এজেন্টদের সঙ্গে একটি সভা করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সেই সভাতেই চলাচলকারী জাহাজ ১৫টি কমাতে বলা হয়। কমিয়ে আনা জাহাজের তালিকা ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে দিতে বলা হয় তাদের। বিষয়টি তদারকির জন্য একটি কমিটিও করে দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ।
ওই সময়ের মধ্যে শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে কমিয়ে আনার জাহাজের তালিকা না দেওয়ায় বন্দরের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন মো. জহিরুল আলম একটি চিঠি দেন। সেখানে বুধবারের মধ্যে অ্যাসোসিয়েশনকে জাহাজের তালিকা দিতে বলা হলেও তারা বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তা দেয়নি।
ওই সভায় উপস্থিত বন্দরের এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে একসঙ্গে ১৬টি জাহাজ বার্থিং (ভেড়ানো) করা যায়। এর মধ্যে ১০টি জেটি কন্টেইনার জাহাজের জন্য বরাদ্দ থাকে। এ অবস্থায় বন্দরে জাহাজ চলাচল বাড়লে বর্হিনোঙ্গরে অপেক্ষার সময়ও বাড়বে।

ওই সভায় বলা হয়, বন্দরে চলাচলের জন্য অনুমোদিত জাহাজের সংখ্যা ৯৬টি থেকে বেড়ে ১১৮ হওয়ায় জাহাজজট বেড়েছে এবং তাতে করে বর্হিবিশ্বে চট্টগ্রাম বন্দরের ‘নেতিবাচক ভাবমূর্তি’ তৈরি হচ্ছে।
শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বন্দর কর্তৃপক্ষ বললেই এ পথে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে কমিয়ে দেওয়া যায় না। একটি জাহাজ পণ্য পরিবহনের জন্য তিন থেকে চার মাস আগে থেকেই চার্টার করা হয়। চাইলেও সেটি আমরা বাতিল করতে পারি না। সংশ্লিষ্ট সকলের ব্যবসার লাভ-ক্ষতি এর সঙ্গে জড়িত।”
হুট করে জাহাজের সংখ্যা কমিয়ে আনলে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “বন্দর যে উদ্যোগ নিচ্ছে, সেটি হলে জাহাজ জট কমার চেয়ে বরং আরও বাড়বে বলে মনে করি। এতে করে জাহাজ ভাড়া বাড়বে এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
সৈয়দ আরিফ জাহাজ জটের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, “চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা কমিয়ে সমাধান হবে না। মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা তো ঠিক না।”
অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বন্দরের পথে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা কমলে সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বর্হিনোঙ্গরে অপেক্ষমান জাহাজ বাড়লে এর প্রভাব শিপিং ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্টদের ওপর পড়বে, এতে বন্দরের সমস্যা হওয়ার কথা না। হঠাৎ করে জাহাজ সংখ্যা কমানোর নির্দেশনা যৌক্তিক নয়।”

তিনি বলেন, “দুই ঈদে দীর্ঘ ছুটি, কাস্টমসের দুই দফায় কলমবিরতি ও শাট ডাউন কর্মসূচি এবং কয়েকদফায় পরিবহন ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার জট তৈরি হয় এবং বর্হিনোঙ্গরে অপেক্ষমান জাহাজের সংখ্যা বেড়েছে। এসবের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পড়েছে।”
এ থেকে উত্তরণের পথ বের করা দরকার মন্তব্য করে তিনি বলেন, “জাহাজের সংখ্যা কমানো একমাত্র উপায় নয়। বিশ্বের উন্নত বন্দরগুলোতে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা কমানোর নজির নেই। বরং বেশি করে জাহাজ আসার জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়।”
শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে বৃহস্পতিবার দেওয়া এক চিঠিতে বলা হয়, বন্দরের পথে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা ১৫টি কমানো হলে মাসে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ৩০ হাজার টিইইউএস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কন্টেইনারকে একক ধরে) কমে যেতে পারে।
জাহাজ কমানোর সিদ্ধান্ত না নিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্যের স্বার্থে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে তিন মাস সময় দেওয়ার অনুরোধ করেছে অ্যাসোসিয়েশন।
এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জাহাজ সংখ্যা কমানো নয়, যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ছোট আকারের জাহাজ ও অ্যাডহক ভিত্তিতে জাহাজ চলায় কিছু সমস্যা হচ্ছে। তাই এই প্রস্তাব করা হয়েছি। সবার সাথে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”