বৃষ্টি নেই, নদীতে শৈবাল, বন্দরনগরে পানির জন্য হাহাকার

প্রয়োজনীয় পানি না পাওয়ায় গরমে নগরবাসীর ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিন কাজ। পানি কিনতে খরচ হচ্ছে বাড়তি টাকা।

মিঠুন চৌধুরী, চট্টগ্রাম ব্যুরোবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 April 2023, 05:11 PM
Updated : 18 April 2023, 05:11 PM

তীব্র গরমে অতিষ্ঠ নগর জীবনে চট্টগ্রামবাসীর ভোগান্তি আরও বাড়িয়েছে পানির সংকট। বৃষ্টি না থাকায় কর্ণফুলী নদীতে জমেছে শৈবাল, যা বাধাগ্রস্ত করছে ওয়াসার পানি পরিশোধনের কাজ।

ফলে চাহিদার ‍তুলনায় ১০-১২ কোটি লিটার পর্যন্ত পানি কম পরিশোধন করতে পারছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। রেশনিং করে নগরীর একেক এলাকায় একেক দিন পানি দিচ্ছে সংস্থাটি।

প্রয়োজনীয় পানি না পাওয়ায় গরমে নগরবাসীর ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিন কাজ। পানি কিনতে খরচ হচ্ছে বাড়তি টাকা।

স্থির পানিতে বাড়ছে শৈবাল

কর্ণফুলী নদীতে জোয়ারের সময় সাগর থেকে যে পানি আসে, তা লবণাক্ত। কাপ্তাই বাঁধ থেকে ছাড়া পানি তীব্র গতিতে এসে বিপরীতমুখী জোয়ারের সেই লবণাক্ত পানির প্রবাহকে বাধা দেয়। ফলে হালদায় লবণ পানি কম ঢোকে। কাপ্তাই থেকে আসা পানি হালদাতেও প্রবেশ করে।

কিন্তু টানা গরম আর বৃষ্টিহীনতায় কাপ্তাই হ্রদের পানিতেও টান পড়েছে। বাঁধ থেকে পানি কম ছাড়ায় তা সাগরের লোনা পানির স্রোতকে বাধা দিতে পারছে না। ফলে হালদায় সাগরের নোনা পানি ঢুকছে অন্য সময়ের চেয়ে বেশি।

মূলত শুষ্ক মৌসুমে (নভেম্বর-মার্চ) কাপ্তাই বাঁধ থেকে পর্যাপ্ত পানি ছাড়া না হলে হালদায় লবণাক্ততা বাড়ে। এবার মার্চের শুরু থেকে কাপ্তাই হ্রদের উজানে পানি কমতে শুরু করে। গরম বাড়ার সাথে উজানে পানি আরও কমে যায়, যা শৈবালের বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।

সেই শৈবাল কাপ্তাই লেক হয়ে এখন কর্ণফুলীতে ঠাঁই গেড়েছে। শৈবালের কারণেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানি পরিশোধন।

সোমবার পত্রিকায় জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসা জানিয়েছে, কাপ্তাই লেক ও কর্ণফুলীর উপনদী হতে (সাম্প্রতিককালে বৃষ্টি না হওয়ায়) প্রচুর পরিমাণে Algae (শৈবাল) যুক্ত পানি কর্ণফুলী নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে।

জানতে চাইলে ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কাপ্তাই লেকে পানি কম থাকায় সেখানকার পানি অনেকটা স্ট্যাগনেন্ট (অচল) হয়ে পড়েছে। এতে শৈবালের পরিমাণ বেড়েছে। সেই শৈবাল কাপ্তাই লেক ও উপনদী বেয়ে কর্ণফুলীতে চলে এসেছে।

“কর্ণফুলীতে আমাদের শেখ হাসিনা-১ ও শেখ হাসিনা-২ পানি শোধনাগারের জন্য নদী থেকে যে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে, তাতে শৈবালের পরিমাণ গত কয়দিন এত বেশি যে তা ফিল্টার ব্লক করে ফেলছে। রাসায়নিক ব্যবহার করে শৈবাল কমানোর চেষ্টা করছি।”

এ দুটি পানি শোধনাগারের প্রতিটি থেকে দিনে ১৪ কোটি লিটার করে মোট ২৮ কোটি লিটার পরিশোধন ক্ষমতার বিপরীতে মঙ্গলবার শোধন করা হয়েছে ২৩ কোটি লিটার।

প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বলেন, “কাপ্তাই লেক থেকে পানি না আসায় হালদায় লবণাক্ততাও খুব বেশি। বুধবার হালদার মোহনা অংশে লবণাক্ততা ছিল ৩০০০ মিলিগ্রাম/লিটার, যেখানে অনুমোদিত মাত্রা ৬০০ মিলিগ্রাম/লিটার।

“তাই মোহরা পানি শোধনাগার ফেইজ-১ থেকে ৯ কোটি লিটার শোধনক্ষমতার বিপরীতে আজ পরিশোধন করা হয়েছে ৬ কোটি লিটার।”

হালদা-কর্ণফুলীর সংযোগস্থলের ছয় কিলোমিটার উজানে মদুনাঘাটের শেখ রাসেল পানি শোধনাগারের জন্যও দৈনিক ৯ কোটি লিটার পানি লাগে। এই কেন্দ্রে পরিশোধন স্বাভাবিক আছে বলে জানান ওয়াসার কর্মকর্তারা।

চার কেন্দ্র ও গভীর নলকূপ মিলিয়ে ওয়াসার পরিশোধন ক্ষমতা দিনে ৫০ কোটি লিটার। নগরীতে পানির দৈনিক চাহিদাও প্রায় কাছাকাছি।

মঙ্গলবার ৩৮ কোটি লিটার পানি পরিশোধন করতে পেরেছে ওয়াসা। ঘাটতি ১২ কোটি লিটারের। এর আগে সোমবার ঘাটতি ছিল ১৩ কোটি লিটারের মত। তার আগে শনিবার ঘাটতি ছিল ১৪ কোটি লিটারের বেশি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক রাসেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তাপমাত্রা বেশি থাকলে এবং স্লো মুভিং ওয়াটারে নীলাভ সবুজ শৈবালের বৃদ্ধি হয় দ্রুত। এখন দুটোই একসাথে হয়েছে।

“শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাইয়ের উজানে পানির প্রবাহ প্রায় স্থির। যদিও জোয়ারের সময় কিছু পানি নদীতে প্রবেশ করে কিন্তু উজানের দিকে যেতে যেতে প্রবাহ কমে যায়। কাপ্তাই বাঁধ থেকে পানি ছাড়া কমে যাওয়া কাপ্তাই লেকে এই শৈবাল বেড়েছে। গরমে পানির তাপমাত্রা বাড়ায় দ্রুত বিস্তার হয়েছে।”

গরম আরও বাড়তে থাকলে আরও সংকট বাড়তে পারে জানিয়ে ড. ওমর ফারুক রাসেল বলেন, “বৃষ্টি না হলে নদীর পানি আরও কমবে। তখন সাগরের পানি বেশি পরিমাণে কর্ণফুলী ও হালদায় প্রবেশ করবে। সাগরের পানির সাথে লোনা পানির শৈবালও নদীতে ঢুকে পড়তে পারে।

“এখন যে শৈবাল আছে নদীতে সেগুলো মিঠা পানির। এর একটা গন্ধ আছে। তবে এর চেয়ে লোনা পানির শৈবালের গন্ধ আরও তীব্র।”

পানি সংকটে জনজীবনে দুর্ভোগ

নগরীর ধনিয়ালাপাড়ার বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই রমজান মাসে প্রয়োজন মত পানি পাই না। কখন পানি আসবে সেটাও জানি না। কোনদিন আসে সকালে, আবার কোনদিন আসে রাতে। খুব কষ্টে আছি।

“আবার যে পানি আসে তা দুর্গন্ধ আর লবণ ভাব। এটা আগে ছিল না। গরমে এমনিতে ঘরের ছেলে-বুড়োরা অতিষ্ট হয়ে আছে। তার উপর পানির যন্ত্রণা।”

Also Read: তাপদাহের মধ্যে পানি-বিদ্যুতের সংকট, ভোগান্তি চট্টগ্রামে

Also Read: পানি কমেছে কাপ্তাইয়ে, লবণ বাড়ছে হালদায়, সংকটে চট্টগ্রাম ওয়াসা

সপ্তাহখানেক ধরে নগরীর গোসাইলডাঙ্গা, আগ্রাবাদ, দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর, রহমতগঞ্জ, লালখান বাজার, দেওয়ানহাট, ও আর নিজাম রোড, ষোলশহর, কদমতলি, বিশ্বকলোনি, মুরাদপুর, বাকলিয়া, চকবাজার, বিশ্বকলোনি, ছোটপুলসহ বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।

ভোর থেকে রাস্তার পাশে থাকা পানির কলে স্থানীয়রা কলসি ও বালতি লাইনে বসিয়ে রাখেন পানি কখন আসবে সে আশায়।

নগরীর রহমতগঞ্জ এলাকার গৃহিনী আয়েশা আক্তার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সকালে ২০-৩০ মিনিটের জন্য পানি আসে। ওই সময়ের মধ্যে কি নিজে গোসল করব, নাকি বাচ্চাকে গোসল করাব, না ঘরের জিনিসপত্র ধুবো। কোনোটাই ঠিকমত হয় না। পানির অভাবে একেকদিন রান্নাও আটকে যায়।”

নগরীর আসকার দিঘীর পাড় এলাকার বাসিন্দা লক্ষ্মী চৌধুরী জানান, গত এক সপ্তাহের মধ্যে ৩ দিন ওয়াসার পানি পেয়েছেন তারা। কেনা পানিতে রান্না করেছেন কোনো রকমে।

“কিন্তু বাকি কাজ? কখন নিয়মিত পানি দেবে তাও জানি না। এমন গরমে পানি না পাওয়ার কষ্ট বলে বোঝাতে পারব না।”

রেশনিং ভরসা, বৃষ্টির অপেক্ষা

চাহিদার তুলনায় কম পানি পরিশোধন করায় রেশনিং করে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানি সরবরাহ করছে ওয়াসা।

ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম জানান, “আজ লালখান বাজার এবং ও আর নিজাম রোডসহ সংলগ্ন এলাকায় পানি সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। আগামীকাল ধনিয়ালাপাড়া, কদমতলি, দেওয়ানহাট, ষোলশহর এসব এলাকায় বাড়ানো হবে।

“শৈবালের পরিমাণ রাসায়নিক ব্যবহারসহ নানা উপায়ে কমানোর চেষ্টা হচ্ছে। আজ গত কয়েকদিনের তুলনায় কিছুটা কমানো সম্ভব হয়েছে। পরিশোধন বাড়লে সরবরাহ এলাকাভিত্তিক বাড়ানো হবে।”

মাকসুদ আলম বলেন, “আসলে পুরো বিষয়টি প্রাকৃতিক। এরকম শৈবালের প্রাদুর্ভাব আগে কখনো হয়নি। আমরাও খুব প্রেসারে আছি। বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।”