Published : 14 May 2025, 03:40 PM
চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা চলতি মৌসুমে অর্ধেকে নামিয়ে আনতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন এবং অক্সিজেন-হাটহাজারী মহাসড়কের উন্নয়ন বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছিলেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর বলেছে, চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমে আগের তুলনায় অর্ধেকে এবং ক্রমান্বয়ে শূন্যে নামিয়ে আনতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
এসময় তিনি বলেন, “আমরা অনেক রকম তাত্ত্বিক আলোচনা করেছি, সেসব আর করতে চাই না, আমরা চাই জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকে চিরতরে বের হয়ে আসতে। কিন্তু সেটা একবারেই হবে না, তাই আমাদেরকে ক্রমান্বয়ে অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
“এ বছর যেহেতু বর্ষা মৌসুম ইতোমধ্যে এসে গেছে তাই এবার সমস্যা পুরোপুরি সমাধান সম্ভব হবে না। কিন্তু গত কয়েক মাসে সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে যে প্রচেষ্টা চালিয়েছে তাতে যদি এ বছর আশানুরূপ ফল না আসে তাহলেতো সব কিছু মনে হবে জলে গেল।”
চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক অর্জনের কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন হচ্ছে একটি প্রতীকী সমস্যা এবং খুবই জটিল সমস্যা। এই সমস্যা নিরসনের মাধ্যমে অন্য শহর ও জেলা উৎসাহিত হবে, তাই চট্টগ্রামকে এই কাজে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে হবে।
“চট্টগ্রাম শহরের যে সক্ষমতা রয়েছে অন্য অনেক অনেক শহরের সেই সক্ষমতা নেই। তাই চট্টগ্রামের সকল প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় হতে হবে এবং নাগরিক সমাজকে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে।”

জেলা প্রশাসন আয়োজিত মতবিনিময় সভায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসনসহ স্থানীয় সেবা কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্য সকল প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নানা উদ্যোগ ও অভিজ্ঞতার কথা শোনেন প্রধান উপদেষ্টা।
সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “মূলত আজ আলোচনাটা হয়েছে আমাদের সাথে জলাবদ্ধতা নিয়ে। সেখানে জলাবদ্ধতা নিয়ে অনেক কথাই উঠে এসেছে।
“মূলত উনি (প্রধান উপদেষ্টা) এটাই শুনতে চাচ্ছিলেন, আমরা এত যে কাজ করেছি, কত শতাংশ এবার জলাবদ্ধতার হাত থেকে জনগণকে মুক্তি দিতে পারব? এটা কি ২০ শতাংশ, ৩০ শতাংশ নাকি ৪০ শতাংশ, না ৫০ শতাংশ? আমি বলেছি, আমি ১০০ শতাংশ বলব না, ইনশাল্লাহ ৫০ শতাংশ।
“আপনার নেতৃত্বে, আপনার বদান্যতায় যে কাজ হয়েছে আমরা মনে করি ৫০ পারসেন্ট হলেও জনগণকে আমরা এবার জলাবদ্ধতার হাত থেকে মুক্তি দিতে পারব।”
সভায় জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তির স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে তুলে ধরে মেয়র বলেন, “স্বল্প মেয়াদের মধ্যে যে সংস্কার কাজগুলো চলছে সেই কাজগুলোকে আরও বেশি ত্বরান্বিত করা।
“মধ্যমেয়াদী যে পরিকল্পনা আমাদের আছে, আরও ২০টা খাল, যেগুলো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সংস্কার করবে। চায়না পাওয়ারের সাথে আমাদের কথা হয়েছে এবং উনিও তাতে একমত হয়েছেন যাতে সবাই মিলে সে কাজটা আমরা ত্বরান্বিত করতে পারি।”
দীর্ঘমেয়াদে জনসচেনতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা বলেছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের শ’খানেক স্কুল দিয়ে তারা শুরু করতে চান এবং পরে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাকে যুক্ত করবেন বলেছেন মেয়র।
তিনি বলেন, “চলমান প্রকল্পের ৩৬টি খাল আমাদের বুঝিয়ে দিলে ব্যবস্থাপনার জন্য বাজেট প্রয়োজন, সেটা বলেছি। পাশাপাশি চলমান যে বর্জ্য অপসারণ কাজ সেটার জন্য ৩৯৮ কোটি টাকার বাজেট ২০২২ সাল থেকে আটকে আছে। সেটার কথা প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছি যাতে যন্ত্রপাতি আমরা কিনতে পারি।”
যুক্তরাজ্যের সহায়তাভিত্তিক একটি প্রকল্প ফেব্রুয়ারিতে পাওয়ার কথা তুলে ধরে মেয়র বলেন, সেটিও প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছেন তিনি। এ প্রকল্পের মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করা হবে। এটা হলে দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী সমাধান পাবে সিটি করপোরেশন।
সভায় অক্সিজেন-হাটহাজারী মহাসড়কের যানজট এবং উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়।
হাটহাজারী-কর্ণফুলীতে দুটি হাসপাতালের পরিকল্পনা
হাটহাজারী ও কর্ণফুলী এলাকায় দুটি হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনার কথা বলেছেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম।
এছাড়া কালুরঘাট এলাকায় একটি ডেন্টাল কলেজ ও ডেন্টাল হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা থাকার কথাও বলেছেন তিনি।
মতবিনিময় সভায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর ব্যাপক চাপের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এসব পরিকল্পনার কথা বলেছেন।
উপদেষ্টা বলেন, “আমি হাসপাতালটি (চমেক) পরিদর্শন করেছি। আমি দেখেছি ধারণক্ষমতা ২২০০ কিন্তু রোগী প্রায় ৫ হাজার। ব্রেইন সার্জারির রোগীকে ফ্লোরে শুইয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়, টয়লেটের পাশেও রোগী ফ্লোরে শুয়ে চিকিৎসা নেয়।
“স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হাটহাজারী ও কর্ণফুলী এলাকায় দুটি হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। এতে করে রাঙামাটি-কাপ্তাই ওদিকের অঞ্চলের রোগীরা হাটহাজারী হাসপাতালে সেবা নিতে পারবেন এবং পটিয়া-সাতকানিয়া-চন্দনাইশ অঞ্চলের রোগীরা কর্ণফুলী হাসপাতালে সেবা নিতে পারবেন।”
তিনি বলেন, “চট্টগ্রামে কোনো ডেন্টাল কলেজ ও ডেন্টাল হাসপাতাল নেই। একটি ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণেরও পরিকল্পনা চলছে।”
সভায় উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক–ই–আজম, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এর নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ।