Published : 31 Jan 2026, 08:45 AM
বিমান ওড়ার প্রস্তুতির সময় হঠাৎ রানওয়েতে পাখি ছাড়াও চলে আসে কুকুর কিংবা শেয়াল; গেল বছরে এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।
রানওয়েতে বিমান ওঠানামা নির্বিঘ্ন ও ঝুঁকিমুক্ত করতে কুকুর সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিলেও বন্যপ্রাণী শেয়াল সরানো ‘সম্ভব নয়’ বলে জানিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
আবার শুধু শেয়াল-কুকুর নয়, নানা রকম সাপও রয়েছে শাহ আমানত বিমানবন্দর এলাকাতে। যদিও রানওয়েতে তাদের দেখা মেলে না। পাখির দেখা মিললেও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ‘বার্ড শুটার’।
রানওয়েতে এসব বিড়ম্বনা ঠেকাতে উড়োজাহাজ ওঠানামার আগে নিয়মিত রানওয়েতে নজর ও যাচাই করার কথা বলছেন বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা।
দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর শাহ আমানতে দিনে গড়ে ১৭টি আন্তর্জাতিক ও ৩৬টি অভ্যন্তরীণ উড়োজাহাজ চলাচল করে। বছরে যাত্রী চলাচল করে ১৬ লাখের বেশি।
কর্ণফুলী নদীর মোহনার কাছেই পতেঙ্গায় ৬৬৫ একর ভূমি নিয়ে এই বিমানবন্দর যাত্রা শুরু করে ১৯৭২ সালে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শুরু হয় ১৯৯৫ সালে।

এ বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশে খালি জমিতে রয়েছে ঘাসের জঙ্গল। সেখানেই থাকে শেয়াল, সাপ ও কুকুর।
শাহ আমানত বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রানওয়ের আশেপাশে জঙ্গল, মানে সেখানে বড় বড় ঘাস আছে। ঘাস নিয়মিত কাটা হয়। এটা বিমানবন্দরের সীমানার ভিতরেই। ওই জঙ্গলে শেয়াল আছে। রাতে আমরা ডাক শুনতে পাই।”
সাপের বিষয়ে তিনি বলেন, “এখানে নানা রকম সাপ আছে, সংখ্যাও বেশি। গত তিন বছরে এখানে যতরকম সাপ দেখেছি, পুরো জীবনেও তা দেখিনি।
“তবে সাপ রানওয়েতে আসে না। ছোট রাস্তায় বা কোয়ার্টারের আশেপাশে নিয়মিত দেখা যায়। সাপের কারণে বিমান ওঠা-নামায় কখনো কোনো সমস্যা হয় না।”
মাঝেমধ্যে রানওয়েতে চলে আসা কুকুর থাকে বিমানবন্দর এলাকায় ঘাসের জঙ্গলে। আছে নানা রকমের পাখি।
গত ১৯ নভেম্বর বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে ইউএস বাংলার একটি ফ্লাইট উড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তার আগে নিয়ম মেনে ‘অপারেশন জিপ’ রানওয়ে পরিদর্শন করে। পরিদর্শন শেষে উড্ডয়নের অনুমতিও দেওয়া হয়।
কিন্তু বিমানটি ঠিক উড়ার আগমুহূর্তে রানওয়েতে চলে আসে একটি শেয়াল। পাইলট ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমে সেই তথ্য দেন। এরপর শেয়ালটি রানওয়ে থেকে সরানো হয়। এজন্য দেরি হয়ে যায় ২৬ মিনিট।
তার আগে চলতি বছরের শুরুতে রানওয়েতে ও অ্যাপ্রোন এরিয়ায় (উড়োজাহাজ দাঁড়ানোর স্থান) কুকুরের উপদ্রব বেড়ে যায়। তখন একাধিক বিমানের পাইলট ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমে এ বিষয়ে তথ্য দেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ড়ত ২১ এপ্রিল ও ২৬ এপ্রিল দুই দফায় বিমাবন্দরের পরিচালক সিটি মেয়রকে চিঠি দিয়ে রানওয়ে থেকে কুকুর সরাতে সহযোগিতা চায়।
চট্টগ্রাম এভিয়েশনের ক্লাবের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আসিফ চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা খুবই অ্যালার্মিং, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘টেক অফ’ বা ‘ল্যান্ডিং’ এর সময় রানওয়েতে নানা রকম প্রাণী চলে আসার কারণে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

“ইতোপূর্বে কয়েকটি ঘটনায় পাইলটরা বিমানবন্দর অথরিটিকে অবহিত করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ছোট পাখির কারণে বিমান দুর্ঘটনায় যাত্রীদের জীবন এবং বিমানের ক্ষতিসহ সম্পদহানির মত ঘটনা ঘটে থাকে। শেয়াল-কুকুর বেলাতেও দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা আছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের উচিত এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।”
শাহ আমানত বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল বলেন, “কুকুর সরাতে সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিলেও খুব বেশি সাড়া মেলে না। আমরা নিজেরাই কুকুর ধরতে অভিযান করি। এজন্য জাল বানানো হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দেওয়া ওষুধ ব্যবহার করে কুকুরকে অচেতন করা হয়। তারপর সেগুলো নিয়ে নদীর অপর পাড়ে আনোয়ারায় নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।”
প্রতিটি ফ্লাইট ওঠা-নামার আগে রানওয়ে চেক করার কথা তুলে ধরে ইব্রাহীম খলিল বলেন, “১৯ নভেম্বরও চেক করা হয়েছিল। তারপর হঠাৎ করে শেয়ালটা চলে আছে। তবে শেয়াল সচরাচর জঙ্গল থেকে বের হয় না, বা রানওয়েতেও আসে না।
“রানওয়েতে নিয়মিত কুকুর দেখা গেলেও শেয়াল দেখা যাওয়ার ঘটনা সেটাই প্রথম। ওই দিনের পরে আর দেখা যায়নি।”
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্য্য বলেন, “শেয়াল বন্যপ্রাণী হিসেবে সংরক্ষিত। বিমান চলাচল নির্বিঘ্ন করতে বিমানের ওঠা-নামার আগে রানওয়ে চেক করতে হবে এবং রানওয়েতে নজরদারি বাড়াতে হবে।
“নজরদারি বাড়ালে প্রাণীদের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি হওয়ার আশঙ্কা কমবে।”
বিমান বন্দর এলাকায় পাখির আনাগোনার কথা তুলে ধরে প্রকৌশলী খলিল বলেন, “বিশ্বব্যাপী বার্ড স্ট্রাইকের বিষয়টি আছে। আমাদের এখানেও পাখি আছে। তবে শীতে পাখির সংখ্যা তুলনামূলক কম।
“আমাদের বার্ড শুটার আছে। রানওয়েতে পাখি দেখা গেলে তারা শুট করে। এ ছাড়া পাশে বিমানবাহিনীর এয়ার বেস আছে। তাদেরও বার্ড শুটার আছে। ফলে পাখির কারণে তেমন সমস্যা হয় না।”
আরও পড়ুন-