নিউ গিনি আবাসনে আতঙ্ক, অস্ত্রধারীরা অধরা
কর্মকর্তারা বলছেন, নিউ গিনির পাশের একটি প্রস্তাবিত আবাসন প্রকল্পে যাতায়াতের জায়গা নিয়েই মূলত ঝামেলার সূত্রপাত।
রাজধানীর মানিকদীর নিউ গিনি আবাসন প্রকল্পে হামলার ঘটনার পর মামলা হলেও নিরাপত্তাকর্মী, নির্মাণশ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
আবাসন প্রকল্পে বসবাস করা একমাত্র পরিবারটিও বাসা ছেড়ে চলে গেছে। নিরাপত্তার কারণে চারটি ফটকের মধ্যে তিনটি বন্ধ রাখা হয়েছে।
হামলায় আহতদের রক্তের দাগ এখনও পড়ে আছে ভবনের ঘরে; প্রবেশপথের ফটকে
রয়েছে গুলির চিহ্ন।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার মানিকদী এলাকায় নিউ গিনি আবাসন প্রকল্পে অস্ত্রধারীদের হামলার ঘটনা ঘটে। পরে নিউ গিনি প্রপার্টিজের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া মামলা করেন।
পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এ পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে তাদের মধ্যে হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া অস্ত্রধারী কেউ আছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
মঙ্গলবার নিউ গিনি আবাসন প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, হামলার পরও সেখানে নিরাপত্তাকর্মী ও নির্মাণশ্রমিকেরা কাজ করছেন। তবে তাদের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময়ও অনেকে এড়িয়ে গেলেন নানা প্রশ্ন।
নিউ গিনি আবাসন প্রকল্পের মোট চারটি ফটক। মঙ্গলবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, শুধু এক নম্বর ফটকটি খোলা। বাকি তিনটি বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
গত শনিবার রাতে চার নম্বর ফটক দিয়ে অস্ত্রধারীরা প্রকল্পের ভেতরে ঢোকে। এই ফটকের পাশেই নির্মাণাধীন ১০ তলা একটি ভবন। ভবনটির দুই তলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।
দোতলার একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন এক চিকিৎসক দম্পতি। ঘটনার দিন তারা সেখানে না থাকলেও তাদের তিনজন স্বজন ছিলেন। হামলার শিকার হন তারাও। ঘটনার পরদিন ওই দম্পতি এসে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে চলে যান। এরপর আর ফেরেননি।
নিউ গিনি আবাসন প্রকল্পের নিরাপত্তা কর্মকর্তা লিয়াকত হোসেন বলেন, “এখানে যে পরিবার ছিল, তারা ভয়ে ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে গেছে। নিচতলায় থাকতেন ইঞ্জিনিয়ার পারভেজ। তাকে কুপিয়ে জখম করে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে গেছে।”
ইঞ্জিনিয়ার পারভেজ যে ঘরে থাকতেন, সেটি তালাবন্ধ ছিল। নিচতলায় দাঁড়িয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় বিছানা ও বালিশে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের ছোপ ছোপ দাগ।
ইসিবি চত্বর থেকে পল্লবী যাওয়ার পথে প্রধান সড়ক থেকে নেমে মিনিটখানেক হাঁটলেই সামনে পড়ে নিউ গিনি আবাসন প্রকল্পের চার নম্বর ফটক।
ভেতর থেকে বন্ধ করে রাখা টিনের ফটকটিতে গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে কোথাও আধা ফুটো, কোথাও পুরোপুরি ফুটো হয়ে গেছে।
এই ফটক লাগোয়া স্বপ্ন বিলাস টাওয়ার-৫৪ নামে আরেকটি আবাসন প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলছে। ওই প্রকল্পের প্রকৌশলী, নিরাপত্তাকর্মী ও দারোয়ানরা ফটকের সামনেই টিনের ঘর বানিয়ে থাকেন।
হামলার রাতে অস্ত্রধারীরা এসে প্রথমেই তাদের ওপর হামলা করে বলে দাবি ওই প্রকল্পের দারোয়ান মো. আলমগীরের।
নিজেকে হামলার প্রথম দিকের ভুক্তভোগী দাবি করে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আনুমানিক নয় ট্রাক মানুষ আইছিল। আমি দেখছি ১২ জনের কাছে পিস্তল। তাগো মধ্যে দুইজন আইসা আমারে পিস্তল ঠেকাইছে। জানে বাঁচতে চাইলে চুপ থাকবি। তারপর কয়, যা আছে সব দিয়া দে।”
আলমগীর বলেন, “আমার মোবাইল লইছে, জেব থাইকা টেকা লইছি। আমার সিগারেট পর্যন্ত নিয়া নিছে। আমি সিগারেট না নিতে অনুরোধ করায় হেরা কইছে, মাল খাইছি আমরা, পিনিক উঠছে তর।”
সেই রাতের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “বাকিরা গেইট বরাবর একাধারে গুলি করছে। আমার পাশের ঘরেই আমাগো ইঞ্জিনিয়ার থাকে। তারে গিয়ে মাথা, পায়ে কোপ দিছে।”
কথার একপর্যায়ে ওই প্রকৌশলীর ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানার চাদর ও জুতায় লেগে থাকা রক্তের দাগ দেখান আলমগীর।
অস্ত্রধারীদের কাউকে চিনতে পেরেছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মুখে কালা মাস্ক আর মাথায় রুমাল বান্ধা আছিলো। চিনমু কেমনে। আর আইছিলো প্রায় দুই-তিনশত মানুষ। এতো মানুষ চেনা সম্ভব না।”
এরপর নিজেই প্রশ্ন করেন, “ভাই, যারা ধরা পড়ছে তাগো মধ্যে হেরা (অস্ত্রধারী) থাকতে পারে। হেরা কী ধরা পড়ছে ভাই?”
আলমগীরের প্রশ্নের উত্তর জানতে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি, ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার এবং ক্যান্টনমেন্ট জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনারদের ফোন করা হলেও তারা ধরেননি।
তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ক্যান্টনমেন্ট থানার পরিদর্শক (অপারেশন) সুব্রত দেবনাথ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা যাদের গ্রেপ্তার করেছি, তাদের মধ্যে আমার জানা মতে অস্ত্রধারীদের কেউ নেই। আর যে ছয়জন গ্রেপ্তার হয়েছে, তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ হয়নি।
“রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে, মঞ্জুর হলে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারলে কিছু তথ্য হয়তো পাওয়া যাবে।”
নিউ গিনি প্রপার্টিজের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া ক্যান্টনমেন্ট থানায় যে মামলা করেছেন, সেখানে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে।
মামলার এজাহারে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে গুলি, মারধর, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ করা হয়েছে।
সোমবার পর্যন্ত থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলেন শাহরিয়ার মাহমুদ, মামুন, আসলাম, মুন্না ও শাহ আলম অনিক।
সোমবার রাতে মাটিকাটা এলাকা থেকে কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল গফুরের জামাতা মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। আব্দুল গফুর জামায়াতের সংসদ সদস্য।
বন্ধ সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও
নিউ গিনি আবাসন প্রকল্পের এক নম্বর ফটক দিয়ে ঢুকে সোজা সামনের দিকে এগোলে দুটি ভবন পার হয়ে টিন ও ইটের দেয়ালে তৈরি আধাপাকা একটি ঘর। আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ব্রাউনফিশের অফিস সেখানে।
মঙ্গলবার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, স্টুডিওটি একেবারে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। প্রবেশের ফটক ওয়েল্ডিং করে আটকে দেওয়া হয়েছে। বাইরে থেকে স্টুডিওর কাচের ভাঙা জানালা দেখা যায়।
কোথাও কোথাও ফাঁকা জায়গা ধূসর পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। স্টুডিওতে ঢোকা যাবে কি না, জানতে চাইলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লিয়াকত হোসেন বলেন, “এখানে ঢোকা যাবে না। কারণ সালমান মুক্তাদির এটা বন্ধ করে দিয়েছেন। তার মালিকানার জায়গা এটা। এখানে আমাদের কোনো এক্সেস নাই।”
চলাচলের রাস্তা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত
নিউ গিনি আবাসন প্রকল্পের এক নম্বর ফটক দিয়ে ঢুকে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও পার হয়ে আরও কিছুটা সামনে এগোলেই প্রকল্পটির সীমানা শেষ। এই সীমানা লাগোয়া ৩৫ কাঠা জমিতে একটি আবাসন প্রকল্প করার কথা রয়েছে, যদিও কাজ শুরু হয়নি।
নিউ গিনি প্রকল্পের একাধিক কর্মকর্তা ও তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, এই আবাসন প্রকল্পে যাতায়াতের জায়গা নিয়েই মূলত ঝামেলার সূত্রপাত। ধীরে ধীরে সেই বিরোধ বড় আকার ধারণ করেছে।
তাদের ভাষ্য, ৩৫ কাঠা জমিতে মামলার চার নম্বর আসামি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন মিলে আবাসন প্রকল্প করতে চাইছেন। তবে জায়গাটির চারপাশে যাতায়াতের মত সড়ক নেই। একমাত্র যাতায়াতের পথ নিউ গিনি আবাসন প্রকল্পের এক নম্বর ফটক দিয়ে যাওয়া সড়কটি।
ঘটনার পরদিন সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও এ ধরনের বিরোধের ইংগিত দিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, ক্যান্টনমেন্ট থানার মানিকদী এলাকায় প্রায় ৩৫ কাঠা একটি বিতর্কিত জমি নিয়ে নিউ গিনি প্রপার্টিজ নামের একটি বিল্ডার গোষ্ঠী এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধ চলছিল।
“ওই বিরোধপূর্ণ জমিতে রাতের আঁধারে একপক্ষ দখল করতে গেলে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের একটি টিনশেড স্টুডিও ভাঙচুরের শিকার হয়।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও নিউ গিনি আবাসন প্রকল্পের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়াকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা ধরেননি।
