Published : 05 Dec 2025, 07:30 PM
কোনো বিশেষ দল বা আট দলের বিজয় নয়, ১৮ কোটি মানুষের আকাঙ্খার বিজয় চেয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, সে বিজয় হবে ‘কোরআনি আইনের’ মাধ্যমে।
কোরআন ও রাসুলের সুন্নাহকে আঁকড়ে থাকার দৃঢ়তা উচ্চারণ করেন তিনি বলেন, “আমরা কোনো লাল চক্ষুকে পরোয়া করব না। কোনো দাদাবাবু মানি না, কোনো বড়ভাই মানি না।”
শুক্রবার বিকালে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে জামায়াতে ইসলামীসহ আটটি দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছিলেন শফিকুর রহমান।
সংসদ নির্বাচনের আগে জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে গণভোট আয়োজনসহ পাঁচ দাবিতে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
সরকার একইদিন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সেই সিদ্ধান্তের আলোকে প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে তফসিল ঘোষণার কথা বলেছে কমিশন।
জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা কোনো বিশেষ দলের বিজয় চাচ্ছি না। আট দলের বিজয় চাচ্ছি না। আমরা বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষার বিজয় চাই। আর সেই আকাঙ্ক্ষার বিজয় হবে, কোরআনি আইনের মাধ্যমে ইনশাল্লাহ।
“এর বাইরে গিয়ে, এটা প্রমাণিত হয়ে গেছে, কোনো কিছু দিয়ে আর বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।”

চট্টগ্রামবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমরা আপনাদেরকে আহ্বান জানাব, বিজয়ের এই হুইসেলটা, বিজয়ের এই বাঁশিটা, ইসলামের প্রবেশদ্বার, ইসলামাবাদখ্যাত এই চট্টগ্রাম থেকে আপনারা বাজাবেন ইনশাল্লাহ। এই বিজয়ের বাঁশি এখান থেকে শুরু হবে আর চেরাপুঞ্জির পাহাড়ে গিয়ে ধাক্কা লাগবে ইনশাআল্লাহ। সারা বাংলাদেশ, ইনশাল্লাহ কোরআনের আলোকে আবাদ হবে।
শফিকুর রহমান বলেন, “কোরআনকে বুকে নিয়ে, রাসুলের সুন্নাহকে বুকে নিয়ে আমরা বাঁচতে চাই, মরতে চাই। আমরা কোনো লাল চক্ষুকে পরোয়া করব না। কোনো দাদাবাবু মানি না, কোনো বড়ভাই মানি না। সকলের সঙ্গে আমাদের সর্ম্পক হবে সমতা এবং পারষ্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে।”
গত বছরের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনের অবসানের পর দেশের হাল ধরে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার, যারা নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের অপেক্ষা আছে।
জামায়াতের আমির বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ ‘স্বস্তিতে’ কথা বলতে পারেনি। বাংলাদেশের মানুষের জীবনের কোনো ‘নিরাপত্তা ছিল না’। বাংলাদেশের মানুষ ‘অবিচার, নির্যাতনের শিকার হয়ে’ কোথাও সামান্য বিচার পায়নি। বাংলাদেশ দুর্নীতিতে ভেসে গিয়েছিল।
“দেশের টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছিল। এক নয়, দুই নয়, আটাইশ লক্ষ কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। তারা বাংলাদেশকে উন্নয়নের কথা বলত। তারা উন্নয়ন করেছিল নিজেদের। রাস্তাঘাট আর দালান নির্মাণ করেছিল রডের বদলে বাঁশ দিয়ে।
“একবার একটা মেয়েকে একটা ডিবেটে বলতে শুনলাম, আজ যদি কবি বেঁচে থাকতেন তিনি বলতেন-‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই, চাঁদের জায়গায় চাঁদ তো আছে বাঁশগুলা সব কই?’ সব বাঁশ উধাও হয়ে গিয়েছিল।”
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদীরা আমাদেরকে উন্নয়নের গল্প শোনাত। বলত, বাংলাদেশ এখন সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশ এখন কানাডা। হ্যাঁ, বাংলাদেশ কানাডা হয়েছে তাদের জন্য, কারণ তারা কানাডায় পালিয়ে গিয়ে বেগম পাড়া তৈরি করেছে। বাংলাদেশের টাকা ব্যাংকগুলা লুট করে, ডাকাতি করে, সিঙ্গাপুরে নিয়ে তারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে।”
আওয়ামী লীগের আমলে ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে হামলা চালিয়ে হত্যার অভিযোগ তুলে জামায়াত আমির বলেন, “এতগুলো আলেম ওলামাকে হত্যা করার পর, কুখ্যাত প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, কেউ মারা যায়নি। ওখানে লাল রঙের যে তরল পদার্থ দেখেছেন এটা মোল্লা মৌলভীরা কিছু রং ছিটিয়ে রেখেছিল।
“মানুষ খুন করার পরে আবার মানুষের রক্ত নিয়ে উপহাস। এটিই ছিল তাদের বৈশিষ্ট্য।”
এ সময় পিলখানা হত্যাকাণ্ড তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, “এরা (আওয়ামী লীগ) রক্ত হাতে করে ক্ষমতায় এসেছিল। আর রক্তাক্ত হাত নিয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছে। তারা ক্ষমতায় এসেছিল, নয় সালে ফেব্রুয়ারি মাসের ২৫ এবং ২৬ তারিখ ঢাকার পিলখানায় তৎকালীন প্যারা মিলিটারি বিডিআর এর হেডকোয়ার্টারে দুই দিনে ৫৭ জন প্রতিশ্রুতিশীল দেশপ্রেমিক চৌকস সামরিক অফিসারকে তারা হত্যা করার মাধ্যমে তাদের হত্যার অভিযান শুরু করেছিল।
‘‘আর চব্বিশের গণমিছিলে ছাত্র-তরুণ-যুবক-কৃষক-শ্রমিক-মা-বোনদের বুকে, ভাইদের বুকে, সন্তানদের বুকে গুলি চালিয়ে লাশ ফেলে দিয়ে যখন সামাল দিতে পারে নাই। তখন যারা বলেছিল, অমুকের কন্যা দেশ ছেড়ে পালায় না, তারাই তখন কি করেছিল?”

জুলাই অভ্যুত্থানে ‘খুনের কাজে’ সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবিকে ব্যবহারের চেষ্টার অভিযোগ তুলে জামায়া আমির বলেন, “দেশের একটি প্রতিষ্ঠানকেও তারা ঠিকভাবে দাঁড়াতে দেয়নি। বিচার বিভাগ ধ্বংস করেছে। নির্বাচন কমিশন ধ্বংস করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে বগলের নিচে দিয়েছে। মানবাধিকার কমিশনকে তাদের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেছে। রাষ্ট্রের একটা প্রতিষ্ঠানকেও তারা ঠিকভাবে থাকতে দেয়নি।”
ফ্যাসিবাদীরা বিদায় নিয়েছে, ফ্যাসিবাদ বিদায় নেয় নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
“আমরা পরিষ্কার বলতে চাই, ফ্যাসিবাদ কালো না লাল। কোন ফ্যাসিবাদকে আর বাংলার জমিনে বরদাশত করা হবে না ইনশাল্লাহ।”
সমাবেশে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম মনে করেন, জুলাই আন্দোলনে হাজার হাজার জীবনের বিনিময়েও মানুষ মুক্তি পায়নি।
“আগামীতে আবারও চাঁদাবাজ, জামেলদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হবে। ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে বৈষম্য থাকবে না। কেউ দশ তলায় কেউ নিচতলায় থাকবে সেটা আর হবে না।”
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটি এম আজহারুল ইসলাম বলেন, আসুন আমরা ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে চট্টগ্রামকে ইসলামের ঘাঁটি বানাই। চট্টগ্রামের মাটি ইসলামের ঘাঁটি। ৮ দলের এই শক্তি ক্ষমতায় গেলে আপনারাই দেশ শাসন করবেন। কারও দাদার শক্তিতে এ দেশ আর চলবে না।
খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমির সরওয়ার কামাল আজিজী, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটি এম আজহারুল ইসলাম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপার সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন।