শামি-ফাইনাল

রান জোয়ারের ম্যাচে একাই ৭ উইকেট নিয়ে রেকর্ড গড়ে ভারতকে ফাইনালে তুলেছেন ভারতীয় পেসার। ম্যাচটিকে তাই সেমি-ফাইনাল না বলে অনায়াসেই বলা যায় শামি-ফাইনাল!

আরিফুল ইসলাম রনিআরিফুল ইসলাম রনিমুম্বাই থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 16 Nov 2023, 03:32 AM
Updated : 16 Nov 2023, 03:32 AM

ম্যাচ শেষ হতেই রোহিত শার্মা ছুটে গেলেন মোহাম্মদ শামির দিকে। ভারতীয় অধিনায়ক কোলে তুলে নিয়ে উঁচিয়ে ধরলেন তার পেসারকে। এই ম্যাচে রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরিতে আলোড়ন তুলেছেন ভিরাট কোহলি। স্ট্রোকের ছটা আর পেশি শক্তির জোরে বিধ্বংসী সেঞ্চুরি করেছেন শ্রেয়াস আইয়ার। কিন্তু রোহিত তো জানেন, ম্যাচের আসল নায়ক কে!

তিনি জানেন, রানের জোয়ারের এই ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন তার এই বোলার।

পিচ বদল করার খবর নিয়ে ম্যাচের আগে কত তোলপাড়! ব্যবহৃত উইকেট মন্থর হবে বলে ধারণা সবার। অথচ উইকেট দেখা গেল ব্যাটিং স্বর্গ। সেখানে শুরুতে ঝড় তুললেন রোহিত নিজে। পায়ে টান না পড়লে হয়তো সেঞ্চুরি করে ফেলতেন শুবমান গিল। কোহলি তো কাঙ্ক্ষিত মাইলফলকের দেখা পেয়েই গেলেন! নিজের নায়ককে স্বাক্ষী রেখেই তাকে ছাড়িয়ে গেলেন সেঞ্চুরির রেকর্ডে। প্রিয়তমার উড়ন্ত চু্ম্বনে সিক্ত হলেন। গোটা গ্যালারির সবাই অভিবাদন জানাল দাঁড়িয়ে। দিনটি তো তারই হওয়ার কথা।

শ্রেয়াস তো ব্যাটকে যেন মুগুর বানিয়ে ফেলেছিলেন। কিউই বোলিং দুমড়ে-মুচড়ে দিলেন। ভারতের রান চারশর কাছে। রান তাড়ায় দুর্দান্ত এক জুটি গড়লেন কেন উইলিয়ামসন ও ড্যারিল মিচেল। অবিশ্বাস্য এক জয়ের আশাও তো মিচেল জাগিয়ে রেখেছিলেন অনেকটা সময়। সব মিলিয়ে তিন সেঞ্চুরি আর ৭২৪ রানের ওয়ানডে ম্যাচ।

অথচ ম্যান অব দা ম্যাচ একজন বোলার। একাই নিয়েছেন ৭ উইকেট!

বিশ্বকাপে তো বটেই, ভারতের ওয়ানডে ইতিহাসেই ৭ উইকেট শিকারি প্রথম বোলার তিনি। বিশ্বকাপের নক আউট ম্যাচেও আগে কখনও এমন কিছু করতে পারেননি কোনো বোলার।

তবে স্রেফ এই সংখ্যা ও রেকর্ডেও ঠিক বোঝা যায় না ম্যাচে তার প্রভাব। আক্ষরিক অর্থেই ম্যাচটায় নিউ জিল্যান্ডের সম্ভাবনা পিষে ফেলে ভারতের আশা উজ্জ্বল করেছেন তিনি। বারবার।

৫ ওভারে উইকেট পড়েনি নিউ জিল্যান্ড। শামি বোলিংয়ে এলেন। প্রথম বলেই ব্রেক থ্রু। পরের ওভারে নিলেন আরেকটি উইকেট। দুই ওপেনার শেষ!

উইলিয়ামসন ও মিচেলের জুটি ভারতের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াল। দুর্ভাবনার ছাপ রোহিতের চোখেমুখে। ৩৩তম ওভারে আবার শামির হতে তুলে দিলেন বল। এবার দ্বিতীয় বলেই উইকেটে। ১৪৯ বলে ১৮১ রানের জুটির যবানিকা।

নতুন ব্যাটসম্যান এসে কিছু করবেন? শামি কেন ছাড়বেন! দুই বলেই আউট টম ল্যাথাম। দারুণ ডেলিভারিতে এলবিডব্লিউ হয়ে তিনি রিভিউ নিতেও পারলেন না।

ম্যাচ জেতার কাজ তখনই হয়ে গিয়েছিল। তবু নিউ জিল্যান্ডের নিবু নিবু আশার প্রদীপ হয়ে ছিলেন সেঞ্চুরিয়ান মিচেল। শেষ স্পেলে ফিরে তাকে ফিরিয়েই শামি পূর্ণ করলেন ৫ উইকেট।

এবারের বিশ্বকাপে তার তৃতীয় ৫ উইকেট। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এই কীর্তি নেই আর কোনো বোলারের।

দিনটি তো তার। ৫ উইকেটে থামলেই চলবে কেন! তিনি তাই ছুটে গেলেন ইতিহাস গড়ার দিকে। গড়লেন অনন্য আরও কীর্তি।

এটাকে সেমি-ফাইনাল না বলে শামি-ফাইনাল বললেও কি ভুল হবে খুব?

বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্রুততম ৫০ উইকেট শিকারি বোলার এখন তিনি। ভারতের হয়ে বিশ্বকাপে উইকেট শিকারের ফিফটি করা একমাত্র বোলার। এবারের বিশ্বকাপে ২৩ উইকেট নিয়ে তিনিই এখন সবার ওপরে।

অথচ এই বোলারকেই বিশ্বকাপের প্রথম ৪ ম্যাচে খেলায়নি ভারত। ভাবা যায়!

বিশ্বকাপের ঠিক আগেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের এক ম্যাচে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। তার পরও বিশ্বকাপের শুরুর দিকে তার জায়গা হলো ডাগ আউটে। নিচের দিকে বাড়তি ব্যাটিং সুরক্ষার ভাবনায় ভারত খেলিয়ে যাচ্ছিল শার্দুল ঠাকুরকে। তার বোলিংয়ের দুর্বলতা ঢেকে দেওয়ার বর্ম হিসেবে ছিলেন অলরাউন্ডার হার্দিক পান্ডিয়া।

আলোচনা-সমালোচনাও হচ্ছিল প্রচুর। শামির মতো স্কিলফুল বোলার কেন বাইরে! ধ্রুপদি ঘরানার বিরল পেসার তিনি, দুই দিকেই বল সুইং করানোর ক্ষমতা তার সহজাত। তার কবজির পজিশন, তার সিম পজিশন, সবকিছুই নিখুঁতের কাছাকাছি। বাউন্সার, ইয়র্কার, স্লোয়ার, স্লোয়ার-বাউন্সার, কী নেই তার বোলিংয়ে!

হ্যাঁ, আধুনিক পেসারদের মতো পেটানো শরীর নেই। পেশি নেই। খুব দীর্ঘদেহী নন। গতিও দেড়শ কিলোমিটার স্পর্শ করে না। কিন্তু বোলিংটা তো তিনি করতে জানেন! ওভারের পর ওভার বোলিং করতে পারেন। স্কিল দিয়েই তো ভয়ঙ্কর তিনি!

ভারতের টিম ম্যানেজমেন্ট তবু নিজেদের পরিকল্পনাতেই ছিল অটুট। অবশেষে সেখান থেকে তারা সরতে বাধ্য হলো পান্ডিয়ার চোটের কারণে। বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচে চোট পেয়ে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেল এই অলরাউন্ডারের। ভারতীয় ম্যানেজমেন্ট তখন একাদশে জায়গা করে দিল সুরিয়াকুমার ইয়াদাভকে। বোলিংয়ের ঘাটতিটুকু ঢাকতে তখন ডাক পড়ল শামির।

তিনি তো এটুকুর অপেক্ষাতেই ছিলেন! সুযোগ পেয়েই প্রথম ম্যাচে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ধারামশালায় নিলেন ৫ উইকেট। আর কাকে বাদ দেয় কে!

উইকেটের স্বাদ পেয়ে তখন তিনি নেশাতুর যেন। পরের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৪ উইকেট, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আবার ৫ উইকেট, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২টি।

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচটি উইকেটশূন্য কাটে। তা সুদে-আসলে পুষিয়ে দিলেন সেমি-ফাইনালে।

নামতা গুণে শিকার ধরে ৬ ম্যাচেই ২৩ উইকেট, অবিশ্বাস্য সব সংখ্যা!

সেমি-ফাইনাল জয়ের পর শামি ফিরে গেলেন তার সেই প্রথম ম্যাচে। জানালেন, নিজের শক্তির জায়গাতেই ভরসা ছিল তার।

“আমি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। খেলার সুযোগই তো পাচ্ছিলাম না। সাদা বলে এমনিতেও খুব বেশি খেলানো হচ্ছিল না আমাকে। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে (ধারামশালায়) সুযোগটি এলো।”

“একটা ব্যাপার নিয়ে আমরা কথা বলেছি, তা হলো বোলিং বৈচিত্র রাখতে হবে। স্লোয়ার, ইয়র্কার, বাউন্সার, নানাকিছু নিয়ে। তবে আমি এখনও ভরসরা রাখি নতুন বলে সামনে বল পিচ করানোয়। যতটা সম্ভব নতুন বলে উইকেট নিতে। এখানেও তা কাজে লেগেছে।”

এই যে তার এত প্রশংসা, এত স্তুতি, সব অবশ্য বদলে যেতে পারত! উইলিয়ামসন ও মিচেলের জুটি যখন ভারতকে চাপে ফেলে দিয়েছে, ভারতীয় অধিনায়ক রোহিত জুটি ভাঙার জন্য বোলিংয়ে আনেন জাসপ্রিত বুমরাহকে। সেটা কাজে লেগেই গিয়েছিল। কিন্তু মিড অনে উইলিয়ামসনের সহজ ক্যাচ ছেড়ে দেন শামি!

তার মনের ভেতর শঙ্কার চোরা স্রোত তখন বয়ে যাওয়ার কথা। মাচ হারলে আঙুল উঠবে তো তার দিকেই! মাঠের পারফরম্যান্স ভালো না হওয়ায় ধর্ম টেনে সাম্প্রদায়িক আক্রমণের শিকারও তাকে হতে হয়েছে আগে।

এবার তেমন কিছুর সুযোগ আর রাখেননি নিজেই। একটু পরই উইলিয়ামসনকে বিদায় করেছেন নিজেই। প্রায়শ্চিত্ত পর্ব শেষ করেছেন দলকে জিতিয়ে। ম্যাচের পর সেই ক্যাচ ছাড়ার ঘটনা তুলে আনলেন নিজেই।

“ক্যাচটা ছেড়ে খুব খারাপ লেগেছিল। সহজ ক্যাচ ছিল, ফেলে দেওয়া উচিত হয়নি। এরপর চেষ্টা ছিল যেন বোলিংয়ে এসে উইকেট নিতে পারি। পরিকল্পনা ছিল স্লোয়ার বল করার, ওরা তখন বড় শটের চেষ্টা করছিল। আমার তা কাজে লেগেছে।”

“একটা ভয় ছিল যে শিশির পড়লে বল গ্রিপ করা কঠিন হবে। স্কিডও করবে। স্লোয়ার হয়তো কাজ করত না তখন।”

কিন্তু শিশির খুব একটা পড়েনি এদিন। তাই কাজে লেগেছে শামির স্লোয়ার। দল পৌঁছে গেছে শিরোপার মঞ্চে। গত দুটি বিশ্বকাপে সেমি-ফাইনাল থেকে ছিটকে গিয়েছিল ভারত। দুবাই বেদনাময় বিদায়ের সঙ্গী ছিলেন শামি। এবার শেষ হাসিটুকুর জন্য তিনি মরিয়া।

“অনেক বড় সুযোগ এটি। গত দুটি বিশ্বকাপে আমরা সেমি-ফাইনালে হেরেছি। এবার সুযোগ পেয়েছি, ফাইনালে উঠেছি। আর কখনও সুযোগ আসে কি না কে জানে। এবারই কাজে লাগাতে হবে।”