‘কোন চিন্তা থেকে যে বলেছিলাম সেমি-ফাইনাল খেলব!’

দলের ক্রিকেটীয় সব সিদ্ধান্ত কোচ ও অধিনায়ক নিয়েছেন, এভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে জানলে বিশ্বকাপে টিম ডিরেক্টরের দায়িত্ব নিতেন না খালেদ মাহমুদ।

আরিফুল ইসলাম রনিআরিফুল ইসলাম রনিদিল্লি থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 Nov 2023, 03:05 PM
Updated : 3 Nov 2023, 03:05 PM

একের পর এক প্রশ্নবাণ ছুটে যাচ্ছিল খালেদ মাহমুদের দিকে। তিনি নানাভাবে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে উত্তর দিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করা হলো, ‘এভাবে দাদুর ভূমিকা নিতে হবে জানলে কি আপনি বিশ্বকাপে আসতেন?” বাংলাদেশের টিম ডিরেক্টর এবার উত্তরটাও দিলেন সরাসরি, “নাহ… আসতাম না।”

‘দাদুর ভূমিকা’ ব্যাপারটি ব্যাখ্যার দাবি রাখে আগে। এমনিতে খালেদ মাহমুদ যতবারই বাংলাদেশের টিম ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানে দলীয় শৃঙ্খলা এবং এই সংক্রান্ত দায়িত্বের পাশাপাশি মাঠের ক্রিকেটের নানা ব্যাপারেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন। তার দায়িত্বেরই অংশ ছিল তা। তবে এবারের বিশ্বকাপে তিনি টিম ডিরেক্টর হলেও তার দায়িত্ব খর্ব করা হয়েছে। বাংলাদেশ দল যখন পুনেতে, তখনই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে সাবেক এই অধিনায়ক নিশ্চিত করেছিলেন, এই সফরে ক্রিকেটীয় কোনো ব্যাপারে তার কোনো ভূমিকা নেই। সবকিছু কোচ-অধিনায়কই করছেন।

বিশ্বকাপের শেষ পর্যায়ে এসে বলা যায়, বাংলাদেশের অভিযান চূড়ান্ত ব্যর্থ। এখনও যদিও দুটি ম্যাচ বাকি আছে, তবু ময়না তদন্ত শুরু হয়ে গেছে। কারণ অনুসন্ধানও চলছে। প্রশ্ন উঠছে খালেদ মাহমুদের ভূমিকা নিয়েও। তিনি কি তার ভূমিকা পালন করতে পেরেছেন? বা কতটুকু পেরেছেন!

তার কাছে প্রশ্নটা করা হয়েছিল এভাবেই যে, সাধারণত কোনো পরিবারে অনেক মুরুব্বি থাকেন দাদু-নানুর মতো, যারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো ভূমিকা সাধারণত রাখতে পারেন না। তবে সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার পর তাদের কাছে এমনিতেই স্রেফ সম্মানের খাতিরে জানতে চাওয়া হয়। বাংলাদেশ দলে খালেদ মাহমুদের ভুমিকাও কি তেমনই?

দিল্লিতে শুক্রবার বাংলাদেশের টিম হোটেলে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের ভূমিকা আবারও স্পষ্ট করে দিলেন তিনি।

“বিসিবি থেকে যে ভূমিকাটা দেওয়া হয়েছে, সেটিই করার চেষ্টা করছে। এর আগে প্রতি সফরে আমার যে বাড়তি একটা দায়িত্ব থাকত যে দল নির্বাচনের অংশ থাকতাম, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা থাকত, এবার তা নেই।”

“যেহেতু আমার ভূমিকা নয় ওই জিনিসগুলো (মাঠের ক্রিকেট সম্পর্কিত নানা কিছু), সুতরাং আমি চিন্তাও করছি না ওসব নিয়ে। যদি আমার দায়িত্ব থাকত, তাহলে চিন্তা করতাম। অবশ্যই আমি দল নিয়ে চিন্তা করছি। কিন্তু আমার তো সিদ্ধান্ত গ্রহণের (ক্ষমতা) নাই। একটা জায়গায় তো আমাকে বলে দেওয়া হয়েছে যে কতটুকু পারব, কতটুকু পারব না। আগে যেভাবে ভূমিকাগুলো ছিল, আমি সেভাবে সম্পৃক্ত থাকার চেষ্টা করেছি। এখন আমার সেই ভূমিকা নেই।”

এভাবে দায়িত্ব পালন করে তিনি কতটা খুশি বা উপভোগ করছেন, সেই প্রশ্নও উঠল। এখানেও তিনি অকপটেই খুলে দিলেন মনের দুয়ার।

“খুশি বলতে… আমি তো এভাবে থাকতেই চাই না। যেহেতু আমার রক্তেই ক্রিকেট, কোচিংও করাই, এটা আমার পেশা… যদিও আমি বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচ নই এবং কোচিংয়ের কোনো ভূমিকায় আমি নেই, তারপরও টেকনিক্যাল লোক হিসেবে যে ব্যাপারগুলো… সবশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যে কাজ করেছি বা কথা বলেছি, সেসব থেকে এবার দূরেই আছি। যেহেতু আমার দায়িত্বে তা নেই, আমি চাই না দায়িত্বের বাইরে কিছু করতে, যেহেতু বোর্ড থেকে বলেছে, আমি ওটাই করতে চাই।”

 “আমি উপভোগ করছি কি না… না, অবশ্যই করছি না। একটা সফরে প্রধান হিসেবে আমি থাকব, ঘুরব, অভিভাবক হিসেবে থাকব, যেখানে শুধু শৃঙ্খলা বা অন্য কিছু নিয়ে আমার চিন্তা থাকবে, সেটা তো আমার কাজ নয়। কাজ নয় বলব না… আগেও দেখতাম এসব, তবে ক্রিকেটও দেখতাম।”

এরপরই তার কথায় ফুটে উঠল, এভাবে দায়িত্ব খর্ব করার কথা তিনি জানতে পেরেছেন বিশ্বকাপে আসার পর। তিনি তো বলেই দিলেন, আগে জানলে, “নাহ, আসতাম না।”

ক্রিকেটীয় ভূমিকা রাখার দায়িত্ব না পেয়ে অসহায়ই শোনাল এই বিসিবি পরিচালকের কণ্ঠ। বিশ্বকাপ শুরুর আগে দলকে নিয়ে যে উচ্চাশার কথা তিনি বলেছিলেন, সেটি এখন তার নিজের কাছেই অনেকটা হাস্যকর মনে হচ্ছে।

“আমি তো বিশ্বকাপে আসার আগে বলেছিলাম সেমি-ফাইনাল খেলব। এখন মাঝে-মধ্যে মনে হয়, কোন চিন্তা করে বলেছিলাম! বুঝতে পারছি না। বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে তো আজকে থেকে নয়, অনেক দিন থেকেই পড়ে আছি। আমার ছেলেদের শরীরী ভাষা, খেলার ধরন, সব কিছু দেখে একটা বিশ্বাস ছিল যে এই বিশ্বকাপে এই কন্ডিশনে বাংলাদেশ অনেক ভালো করবে। করার কথা। আশাও ছিল অনেক বেশি।”

“খারাপ লাগছে, প্রচণ্ড খারাপ লাগছে। আমরা সেমি-ফাইনাল খেলতে না পারি, ৬ বা ৭ নম্বর দল হই। কিংবা ১০ নম্বর দলও হই… কিন্তু লড়াই করার মানসিকতা একদম খুঁজে পাইনি।”

তবু এখন সব ভুলে সামনে তাকাতে চান সাবেক এই অধিনায়ক। বিশ্বকাপে দলের শেষ দুই ম্যাচে ভালো কিছু দেখতে চান মাঠের পারফরম্যান্সে।

“এই মুহূর্তে এসব না বলাই ভালো। সামনে দেখতে পারি। যেটা হয়ে গেছে, সেটা নিয়ে চিন্তা না করে…সামনে দুটি ম্যাচ আছে, খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আসলে সমালোচনা করলে অনেক কিছু নিয়েই করা যাবে। সমালোচনা থাকবেই। অনেক কথাই ঠিক হবে, অনেক কথা ভুল হবে। টানা অনেক ম্যাচ হারলে অনেক সিদ্ধান্তই ভুল হবে। এখন এসবের উর্ধ্বে উঠে কীভাবে পরের দুই ম্যাচে ভালো খেলতে পারি, সেটা ভাবতে হবে।”