Published : 28 Feb 2026, 11:29 AM
নিউ জিল্যান্ড যখন সেমি-ফাইনালের ছবি আঁকছে, পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা তখন হয়তো ব্যাগ গোছাতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু রোমাঞ্চের তখনও বাকি! শেষের ঝড়ে নিউ জিল্যান্ডকে হারিয়ে জিতে গেল ইংল্যান্ড আর অন্তত আর একটি দিন বিশ্বকাপে জিইয়ে থাকল পাকিস্তান। শেষের সেই পালাবদলের নায়কদের একজন রেহান আহমেদের বাড়িতে তখন নিশ্চয়ই বাড়তি আনন্দের ছটা!
তুমুল প্রতিভাবান রেহানকে মনে করা হয় ইংল্যান্ডের ভবিষ্যৎ। বিশ্বকাপ অভিষেকে ব্যাটে-বলে দলকে জিতিয়ে সেই সম্ভাবনার আলো আরও একবার ছড়িয়ে দিলেন তিনি। তবে তার বাবার বাড়তি খুশির কারণ হতে পারে ইংল্যান্ডের এই জয়ে পাকিস্তানের সম্ভাবনা টিকে থাকাও। এই পরিবারের শেকড় যে পাকিস্তানেই!
রেহানের বাবা নাইম আহমেদও ছিলেন ক্রিকেটার। কাশ্মীমের মিরপুরে বেড়ে উঠেছেন তিনি। পেস বোলিং অলরাউন্ডার ছিলেন। তবে খুব বড় কোনো অবস্থানে যেতে পারেননি। ২০০১ সালে জীবিকার তাগিদে স্ত্রীকে নিয়ে পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে। সেখানে ট্যাক্সি চালানো শুরু করেন।
এই দম্পতির প্রথম সন্তান রাহিম আহমেদের জন্ম ২০০৩ সালে। ২০০৪ সালের অগাস্টে পৃথিবীর আলোয় আসেন রেহান। আরেক ছেলে ফারহান আহমেদের জন্ম ২০০৮ সালে।
সময়ের পরিক্রমায় তিন ছেলেই বেছে নেয় ক্রিকেটের পথ। তিনজনই অলরাউন্ডার, তবে সেখানেও আছে বৈচিত্র। বড় ছেলে ফারহান বাঁহাতি পেস বোলিং অলরাউন্ডার। এখনও পর্যন্ত তিনিই একটু পিছিয়ে আছেন। নটিংহ্যামশায়ারের দ্বিতীয় একাদশে নিয়মিত খেলছেন। মূল দলে জায়গা করে নিতে পারেননি। স্বীকৃত ক্রিকেটে অভিষেক হয়নি এখনও। যদিও ছোট দুই ভাইয়ের মতে, পরিবারের সবচেয়ে প্রতিভাবান ফারহানই!

এখনও পর্যন্ত পরিবারের সবচেয়ে বিখ্যাত ও উজ্জ্বলতম সদস্য অবশ্যই রেহান। তার প্রতিভার আলো ইংলিশ ক্রিকেটে ছড়িয়ে পড়ে একদম ছোট থেকেই। ১২ বছর বয়সেই তাকে লর্ডসের নেটে নিয়ে যাওয়া হয় ইংল্যান্ড-পাকিস্তান টেস্টের আগে। ১৩ বছর বয়সেই তাকে দেখে চমৎকৃত হয়ে লেগ স্পিনের জাদুকর শেন ওয়ার্ন ভবিষদ্বাণী করেন, এই ছেলে ১৫ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলবে।
১৫ বছরে না হলেও ১৭ বছর বয়সে ঠিকই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে পা রাখেন তিনি। পরের বছরই গড়ে ফেলেন ইতিহাস। ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে টেস্ট অভিষেক হয়ে যায় ১৮ বছর বয়সে।
বাবা-মাকে আবেগের স্রোতে ভাসিয়ে ২০২২ সালে তার সেই অভিষেক টেস্ট ছিল পাকিস্তানেই। অভিষেকে ৫ উইকেট নিয়ে তিনি গড়েন রেকর্ড।
এখনও পর্যন্ত ৫ টেস্ট ও ৯ ওয়ানডে খেলেছেন। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল তার ১৩তম টি-টোয়েন্টি।
তার ছোট ভাই রাহিমও প্রতিভার ছটায় ধাঁধিয়ে দিয়েছেন অনেকের চোখ। ১৮ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার অফ স্পিনিং অলরাউন্ডার। ইংল্যান্ডের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলেছেন তিনি মাত্র ১৫ বছর বয়সেই। কাউন্টি ক্রিকেটেও শুরুটা দারুণ করেছেন তিনি।
আপাতত আলোচনার কেন্দ্রে রেহান। টানা ৫ ম্যাচ একই একাদশ খেলানোর পর শুক্রবার একাদশে পরিবর্তন আনে ইংল্যান্ড। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে জেমি ওভারটনের বদলে বেছে নেয় রেহানকে। কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের শুষ্ক ও স্পিন সহায়ক উইকেট ভাবনায় রেখেই মূলত পেস বোলিং অলরাউন্ডারের বদলে খেলানো হয় লেগ স্পিনিং অলরাউন্ডারকে। তা কাজে লেগে যায় দারুণভাবে।
এই ম্যাচ জিতলে নিউ জিল্যান্ড গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে পৌঁছে যেত সেমিতে। বিদায় নিশ্চিত হয়ে যেত পাকিস্তানের। সেটি না হওয়ার অনুঘোটকদের একজন রেহান।
বল হাতে তার শিকার ছিল গুরুত্বপূর্ণ দুটি উইকেট। বিশ্বকাপ অভিষেকে উইকেটের দেখা পান তিনি প্রথম বলেই। দ্বাদশ ওভারে আক্রমণে এসেই জুটি ভাঙেন রাচিন রাভিন্দ্রাকে ফিরিয়ে।
পরে ষোড়শ ওভার বোলিং করে রান দেন মাত্র ৭। এরপর শেষ ওভারের গুরু দায়িত্বও পান তিনি। এবার ১২ রান দিলেও আউট করেন কোল ম্যাককনকিকে।
এরপর ব্যাট হাতেও তার দিকে তাকিয়ে ছিল দল। এমনিতে তিনি জেনুইন অলরাউন্ডার। ব্যাটে-বলে দক্ষতা প্রায় সমান। ইংল্যান্ডের টি-টোয়েন্টি ব্লাস্টে ওপেন করেছেন, তিন নম্বরে খেলে থাকেন নিয়মিতই। তবে এই ম্যাচে তাকে পাঠানো হয় ৮ নম্বরে।
ক্রিজে গিয়ে প্রথম বলে রান নিতে পারেননি। এরপর ইংল্যান্ডের সামনে সমীকরণ দাঁড়ায় ৩ ওভারে ৪৩ রান। নিউ জিল্যান্ডের দিকেই সম্ভাবনা হেলে ছিল প্রবলভাবে। ম্যাচের চিত্র বদলের শুরু রেহানের হাত ধরেই।

অষ্টাদশ ওভারের প্রথম বলে সিঙ্গল নেন উইল জ্যাকস। পরের বলেই গ্লেন ফিলিপসকে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে মাথার ওপর দিয়ে ছক্কায় উড়িয়ে দেন রেহান। পরে ওই ওভারে আরও একটি ছক্কা দুটি চারে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেন জ্যাকস। পরের ওভারে আক্রমণে আসেন মিচেল স্যান্টনার। নিউ জিল্যান্ড অধিনায়কের প্রথম বলেই দারুণ এক রিভার্স সুইপে চার মেরে দেন রেহান। ওভারের শেষ বলে আবার মেরে দেন তিনি ছক্কা, যে শটে মূলত শেষ হয়ে যায় নিউ জিল্যান্ডের আশা।
ব্যাটে-বলে পারফরম্যান্সে আসরে চতুর্থবার ম্যাচ-সেরা হন জ্যাকস। তবে ২৮ রানে ২ উইকেট নিয়ে ও ৭ বলে অপরাজিত ১৯ রান করে রেহান রাখেন নিজের ছাপ।
ম্যাচের পর ব্রুক জানালেন, কন্ডিশন ভাবনায় রেখেই রেহানকে বেছে নেওয়া হয় এ দিন। তবে সেমিতে তাকে খেলানোর নিশ্চয়তা নেই।
“নেটে আমরা দেখেছি রেহ (রেহান) কী করতে পারে। সে মাঠে নেমে দারুণ খেলেছে এবং ওদের কাছ থেকে ম্যাচটি বের করে নিয়ে গেছে।”
“(সেমিতে তাকে খেলানো হবে কি না) ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। তবে শুরু থেকেই আমরা বলে আসছি, দলকেও এই বার্তা দেওয়া হয়েছে, কন্ডিশনের ওপর নির্ভর করে আমরা দল সাজাব এবং আমাদের মনে হয়েছে, ওকে খেলানোর উপযুক্ত সুযোগ আজকেই। সে অসাধারণ কাজ করেছে।”
ইংল্যান্ড সেমি-ফাইনালটি খেলবে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে। উইকেট সেখানে কখনও কখনও স্পিন সহায়ক হয় বটে। তেমন হলে রেহানের সুযোগ আসতে পারে। তবে বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে পিচ ব্যাটিং সহায়ক থাকার সম্ভাবনাই বেশি। মাঠের সীমানাও বেশি বড় নয়। এসব বাস্তবতা আবার রেহানের বিপক্ষে।