Published : 19 Jul 2026, 08:36 PM
বাংলাদেশ তখন সহজ জয়ের পথে। পাঁচ বলে প্রয়োজন চার রান। কিন্তু ব্র্যাড ইভান্সের ফুল টসে বোল্ড হয়ে গেলেন মোসাদ্দেক হোসেন। নতুন ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিনের খায়েশ হলো ছক্কায় ম্যাচ শেষ করার। প্রথম বলেই উড়িয়ে মেরে তিনিও আউট। ধারাভাষ্যকক্ষে এড রাইন্সফোর্ডেরে চিৎকার, “ইজ দেয়ার আ টুইস্ট ইন দা টেইল?” হ্যাটট্রিক ডেলিভারিতে ফুল টস বল সোজা গিয়ে লাগল শেখ মেহেদি হাসানের প্যাডে। নিশ্চিত এলবিডব্লিউ!
কিন্তু আম্পায়ার সঙ্কেত দিলের ডেড বলের। কারণ কোনো এক ফিল্ডার মুভ করছিলেন! বড় বাঁচা বেঁচে গেল বাংলাদেশ। পরের বলটিও ফুল টস পেয়ে এক্সট্রা কাভার দিয়ে চার মেরে গর্জন করলেন মেহেদি। পরে তো বোলার ইভান্সের সঙ্গে বেশ এক চোট উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়ে গেল তার! যে ম্যাচ ছিল একদমই নিস্তরঙ্গ, বাংলাদেশ ছিল অনায়াস জয়ের পথে, শেষ সময়ে সেটিতে নাভিশ্বাস উঠে গেল বাংলাদেশের। মেহেদির ওই গর্জনে মিশে ছিল মূলত বড় এক পাথর নেমে যাওয়ার স্বস্তি।
তিন ম্যাচ টি-টোয়েন্টি সিরিজের শেষটিতে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত জিততে পারল ৪ উইকেটে। পিছিয়ে পড়েও সিরিজ জিতে নিল তারা ২-১ ব্যবধানে।
আগের সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হোয়াইটওয়াশড হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয়ের নেতৃত্বে প্রথম সিরিজ জয় এটি।
বাংলাদেশের জয়ের ভিত গড়া হয়ে যায় ম্যাচের প্রথম ভাগে। এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল, ১৬০-১৭০ রান করবে জিম্বাবুয়ে। কিন্তু শেষ দিকে দুর্দান্ত বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে তাদেরকে ১৪৩ রানেই আটকে রাখে বাংলাদেশ।
ওপেনিংয়ে ব্রায়ান ব্রেনেট করেন ৪৭, তিনে নেমে ডিওন মায়ার্স ৭৩। দলের বাকি সাত ব্যাটসম্যান আর অতিরিক্ত মিলিয়ে রান আসে ২৩!
রান তাড়ায় বাংলাদেশ ঝড়ের গতিতে ছুটতে পারেনি। তবে শেষ ওভারের আগ পর্যন্ত পুরোটই ছিল নিয়ন্ত্রণে। এক প্রান্ত আগলে রেখে দলকে জয়ের দিকে নিয়ে যান তানজিদ হাসান। শেষে ওই নাটক জমিয়ে জয় আসে দুই বল বাকি রেখে।
চার ছক্কায় ৫৮ বলে ৬৬ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে ম্যাচের সেরা তানজিদ। টানা দুটি ফিফটি করে সিরিজের সেরাও এই ওপেনার।
বাংলাদেশের ম্যাচ শুরুর ইঙ্গিত ছিল অশুভ। ম্যাচের প্রথম ওভারে তাসকিন আহমেদের বলে বেনেটের সহজ ক্যাচ ছাড়েন তানজিদ হাসান। পরের ওভারেই টাডিওয়ানাশে মারুমানিকে ফিরিয়ে প্রথম ব্রেক থ্রু এনে দেন শেখ মেহেদি হাসান।
মেহেদির পরের ওভারে বেনেটের তিন বাউন্ডারিসহ ১৫ রান এলেও, পাওয়ার প্লেতে জিম্বাবুয়ে তোলে ৪০ রান।
পরের উইকেটের জন্য অবশ্য অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হয় বাংলাদেশকে। জুটি গড়ে তোলেন বেনেট ও মায়ার্স। তবে রানের গতি খুব আদর্শ ছিল না।
৫৫ বলে ৯১ রানের জুটি ভাঙেন মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন। লো ফুল টস ডেলিভারি স্টাম্পে টেনে আনেন বেনেট (৩৮ বলে ৪৭)।
১২ ওভার শেষ মায়ার্সের রান ছিল ২৬ বলে ২৬। এরপর কিছু শট তিনি খেলেন। তবে আরেকপ্রান্তে ব্যাটসম্যানদের আসা-যাওয়া চলতে থকে।
হ্যামিল্টন মাসাকাদজার ৩১৩ ম্যাচ ছাড়িয়ে জিম্বাবুয়ের হয়ে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ডের দিনে সিকান্দার রাজা ফেরেন ৩ রানে।
আব্দুল গাফফার সাকলাইনের বল আকাশে তুলে বিদায় নেন রায়ান বার্ল। আগের ম্যাচগুলোয় বাংলাদেশকে ভোগানো ব্র্যাড ইভান্স রান আউট হন ১ রানে। ওই ওভারেই কিপারের কাছে ধরা পড়েন ক্লাইভ মাডান্ডে।

৫৩ বলে ৭৩ করে শেষ ওভারে রান আউট হন মায়ার্স।
শেষ ৫ ওভারে মাত্র ৩৪ রান তুলতে পারে জিম্বাবুয়ে।
বাংলাদেশের রান তাড়ার প্রথম পাঁচ বলেই অনেক কিছু দেখিয়ে দেন সাইফ। ইনিংসের প্রথম বলেই তেড়েফুঁড়ে মেরে ব্যাটে-বলে করতে পারেননি। পরের বলে লেগ স্টাম্পের বাইরে শর্ট বল পেয়ে মারেন বাউন্ডারি।
ওভারের চতুর্থ বলে স্কুপ করার চেষ্টায় বল লাগে তার হেলমেটে। মাঠে তাকে পরীক্ষা করে দেখেন ফিজিও। পরের বলেই বাজে শটে বিলিয়ে দেন উইকেট।
ওই উইকেটের পর বাংলাদেশের দুই ব্যাটসম্যানকে চেপে ধরেন জিম্বাবুয়ের পেসাররা। তানজিদ ও পারভেজ একটি করে ছক্কা মারলেও, পাওয়ার প্লেতে রান ওঠে মাত্র ৩০।
পাওয়ার প্লের পর একটু হাত খোলেন দুজন। সিকান্দার রাজাকে মাথার ওপর দিয়ে উড়িয়ে দেন পারভেজ। টিনোটেন্ডা মাপোসাকে ছক্কায় স্বাগত জানান তানজিদ। ওই ওভারেই দুটি চার আসে তার সঙ্গীর ব্যাট থেকে।
৫৫ রানের জুটি থামে রাজার বলে পারভেজের (২২ বলে ২৫) বিদায়ে।
বাংলাদেশকে তাতে বিপাকে পড়তে হয়নি। বরং পরের জুটিতে আরও গতিময় হয় ইনিংস। তানজিদ ও হৃদয় যোগ করেন ৪৪ বলে ৬৩ রান। দুজনের যেমন ভালো কিছু শট খেলেন, তেমনি আলগা ফিল্ডিংয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় জিম্বাবুয়েও।
হৃদয় ফেরেন ১৯ বলে ২৪ রান করে। জয়ের কাছে গিয়ে আউট হয়ে যান আগের দুই ম্যাচে দারুণ খেলা ইয়াসির আলি।
সাড়ে তিন বছর পর দেশের হয়ে টি-টোয়েন্টি খেলতে নামা মোসাদ্দেক হোসেনের সামনে সুযোগ ছিল দলের জয় নিয়ে ফেরার। কিন্তু সেই সুযোগ হেলায় হারান তিনি।
সাড়ে তিন বছর পর দেশের হয়ে টি-টোয়েন্টি খেলতে নামা মোসাদ্দেক হোসেনের সামনে সুযোগ ছিল দলের জয় নিয়ে ফেরার। কিন্তু সেই সুযোগ হেলায় হারান তিনি।
শেষ ওভারে প্রয়োজন পড়ে ছয় রানের। মন্থর ওভার রেটের কারণে একজন ফিল্ডার বৃত্তের ভেতরে বাড়তি রাখতে হয় জিম্বাবুয়েকে। প্রথম বলে সিঙ্গল নেন তানজিদ। পরের বলে লো ফুল টসে জায়গা বানিয়ে খেলার চেষ্টায় লাইন মিস করে বোল্ড মোসাদ্দেক।
নতুন ব্যাটসম্যান সাইফ উদ্দিন আগেই শাফল করে বড় শট খেলার পজিশনে চলে যান। বোলার সেটা বুঝেই বল করেন। সাইফ তবু ব্যাট চালিয়ে দেন। ধরা পড়েন মিড উইকেটে।
পরের বলে ইভান্সের হ্যাটট্রিক হয়েই যেত। তবে তিনি বল ডেলিভারি করার সামান্য আগেই ডেড বলের সঙ্কেত দিতে শুরু করেন আম্পায়ার। সেটি নিয়ে বেশ সংশয়ের তৈরি হয়। জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটাররা প্রতিবাদ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে তাদেরকে বোঝাতে পারেন আম্পায়ার।
পরের বলটি আবার ফুল টস করেন ইভান্স। এবার টাইমিং ঠিকঠাক করতে পারেন মেহেদি। শেষ ওভারের ঘটনাপ্রবাহ আরেকপ্রান্ত থেকে দেখা ছাড়া উপায় ছিল না তানজিদের। শেষ পর্যন্ত বিফলে যায়নি তার ইনিংস।
এই সফরে একমাত্র টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে হারার পর, ওয়ানডে সিরিজও হেরেছে বাংলাদেশ। টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়ে শেষটা অন্তত স্বস্তিতে হলো।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
জিম্বাবুয়ে: ২০ ওভারে ১৪৩/৭ (বেনেট ৪৭, মারুমানি ৪, মায়ার্স ৭৩, রাজা ৩, বার্ল ৭, ইভান্স ১, মাডান্ডে ০, শুমা ৪*, মাপোসা ০*; তাসকিন ৪-০-১৬-০, মেহেদি ৪-০-৩১-১, সাইফ উদ্দিন ৪-০-৩৫-২, রিশাদ ৪-০-২৮-১, সাকলাইন ৪-০-৩১-১)
বাংলাদেশ: ১৯.৪ ওভারে ১৪৪/৬ (সাইফ হাসান ৪, তানজিদ ৬৬*, পারভেজ ২২, হৃদয় ২৪, ইয়াসির ১০, মোসাদ্দেক ১, সাইফ উদ্দিন ০, শেখ মেহেদি ৪*; এনগারাভা ৪-০-২০-২, মুজারাবানি ৪-০-১৭-০, ইভান্স ৩.৪-০-২৬-২, রাজা ৪-০-৩৮-২, মাপোসা ২-০-২১-০, বার্ল ১-০-৮-০, বেনেট ১-০-১১-০)।
ফল: বাংলাদেশ ৪ উইকেটে জয়ী।
সিরিজ: তিন ম্যাচ বাংলাদেশ ২-১ ব্যবধানে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: তানজিদ হাসান।
ম্যান অব দা সিরিজ: তানজিদ হাসান।