Published : 20 Jul 2026, 09:16 AM
তিতাসের আওতাধীন এলাকায় দৈনিক প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও গত কয়েক দিনে সরবরাহ নেমেছে ১৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে। আর এই ঘাটতির কারণে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের সব এলাকাতেই কমেছে গ্যাসের চাপ।
এর সঙ্গে পুরোনো ও ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনের ছিদ্র দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকে ঢাকার কিছু এলাকায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, পানি সরানো এবং গ্যাসের সরবরাহ না বাড়া পর্যন্ত তা বলতে পারছে না তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি।
রাজধানীর পশ্চিম ধানমন্ডির জাফরাবাদ এলাকার বাসিন্দা রাগিব হাছান গালিব জানান, গত কয়েক মাস ধরেই তাদের বাসায় সকাল ৯টার পর থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত গ্যাসের চাপ থাকে না। ফলে পরিবারের সদস্যদের ভোরেই রান্না শেষ করতে হয়।
তা না হলে বিদ্যুচ্চালিত চুলার ওপর নির্ভর করতে হয়। অধিকাংশ দিন দুপুরের খাবার রান্না করে রাখতে হয় সকালে।
গালিব বলেন, “বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। বাসা থেকে জানতে চায়, গ্যাস নাই কেন, কোনো উত্তর দিতে পারি না।”
মোহাম্মদিয়া হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা আখিরা ইসলাম জানালেন তাদের বাসায় গ্যাসের সংকট গত ১৫ দিন ধরে প্রকট হয়েছে। দিনের বেলায় চুলা জ্বলে না; সন্ধ্যার পর চাপ কিছুটা বাড়লে রাতে রান্না করতে হয়।
“কি যে কষ্টে আছি! চুলা জ্বলে না। সন্ধ্যার পর থেকে গ্যাস একটু বাড়ে, রাতে রাতে রান্না করে কোনোমতে বেঁচে আছি,” বলেন তিনি।
তিতাসের পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান রোববার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তাদের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় দুই হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে গত দুই দিনে বরাদ্দ দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমেছে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম পাওয়া যাচ্ছে।
গ্যাসের এই ঘাটতির কারণে শুধু ঢাকা নয়, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জেও স্বল্পচাপের জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে জানান সাইদুল হাসান।
তিনি বলেন, “সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থায় ঢাকার অবস্থান শেষের দিকে হওয়ায় রাজধানীতে সংকট তুলনামূলক বেশি। এর ওপর টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে পুরোনো পাইপের অচিহ্নিত ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকে বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছে।”
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সাইদুল হাসান বলেন, “গ্যাসের চাপ কম থাকলে পাইপের বাইরের পানি ছিদ্র দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। চাপ স্বাভাবিক থাকলে এমনটি হওয়ার সুযোগ কম। দৃশ্যমান ছিদ্রগুলো শনাক্ত করে তিতাসের কর্মীরা মেরামত করছেন; তবে মাটির অনেক নিচে থাকা ছিদ্র খুঁজে বের করতে সময় লাগছে।”
তিতাসের এই কর্মকর্তা বলেন, গ্যাসের সরবরাহ বাড়লে পাইপলাইনের চাপও বাড়বে। পাশাপাশি বৃষ্টি কমলে লাইনে ঢোকা পানি সরিয়ে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে।
তবে কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো সময়সীমা বলতে পারেননি। তার ভাষায়, “গ্যাসের বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়টি তিতাসের হাতে নেই।”
ঢাকার মোহাম্মদপুর বেশ কিছু এলাকায় গত দশদিন ধরে গ্যাস নেই। একই অবস্থা মিরপুরসহ ঢাকার কয়েকটি এলাকায়। বাসিন্দারা কয়েক দিন ধরে গ্যাস না থাকা বা চাপ খুব কম থাকার অভিযোগ করছিলেন। রান্নার জন্য অনেকে বিদ্যুচ্চালিত চুলা ব্যবহার করছেন, কেউ কেউ বাইরে থেকে খাবার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
তিতাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানির কেন্দ্রীয় জরুরি গ্যাস নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে ৮ হাজার ৩৫৩টি অভিযোগ আসে। এর মধ্যে গ্যাস লিকেজের অভিযোগ ছিল ৪ হাজার ৯০০টি। গ্যাস না থাকার অভিযোগ ছিল ২ হাজার ২৭৪টি এবং কম চাপের অভিযোগ ছিল ২৫২টি।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের হাইড্রোকার্বন ইউনিটের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর ছয়টি বিতরণ কোম্পানির কেনা গ্যাসের প্রায় ৫৬ শতাংশ পেয়েছিল তিতাস। কোম্পানিটি এক বছরে ১৫ হাজার ১৫৩ দশমিক ৫২ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস কিনেছিল।

বার্ষিক ওই পরিমাণকে দৈনিক হিসাবে রূপান্তর করলে তিতাসের গড় সরবরাহ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৪৬৬ মিলিয়ন বা ১৪৬ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। বর্তমান চাহিদার তুলনায় এই গড় সরবরাহও ৫০ কোটি ঘনফুটের বেশি পিছিয়ে আছে।
তিতাস কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকার বিতরণ নেটওয়ার্কের বড় অংশ কয়েক দশকের পুরোনো। বিভিন্ন সেবা সংস্থার রাস্তা খোঁড়া ও অবকাঠামো নির্মাণের সময়ও অনেক জায়গায় গ্যাসের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর সংশ্লিষ্ট পাইপ স্থায়ীভাবে তুলে বা বন্ধ না করাও পানি ঢোকার একটি কারণ। বর্ষায় পরিত্যক্ত এসব পাইপ দিয়ে পানি সচল বিতরণ লাইনে চলে যেতে পারে। পানি বের না করা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয় না।
গত জানুয়ারিতে আমিনবাজারে তুরাগ নদের তলদেশে থাকা তিতাসের বিতরণ লাইন একটি পণ্যবাহী নৌযানের নোঙরের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মেরামতের সময় লাইনে পানি ঢুকে মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ধানমণ্ডি, আদাবর ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দিন গ্যাসের স্বল্পচাপের সমস্যা ছিল।
পুরোনো ও ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইন বদলে ঢাকার নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রকল্পটি আপাতত এগোচ্ছে না। সাইদুল হাসান বলেন, ঢাকার পুরোনো নেটওয়ার্কের একটি বড় অংশ বদলাতে তিতাস প্রকল্প নিয়েছিল। তবে সরকার প্রকল্পটি আপাতত স্থগিত রেখেছে।
ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে প্রায় ২ হাজার ৭৮১ কিলোমিটার নতুন বিতরণ লাইন বসানো এবং প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার বিদ্যমান নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের প্রস্তাব দিয়েছিল তিতাস। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৮ হাজার ১৬১ কোটি টাকা।
এর আওতায় পুরোনো লাইন বদলের পাশাপাশি জিআইএস ম্যাপিং ও স্বয়ংক্রিয় তদারকির স্কাডা ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। তবে ব্যয়, অর্থায়ন ও প্রকল্পের আর্থিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পরিকল্পনা কমিশন প্রস্তাবটি সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠায়।