ফাইনালের সেরাদের গল্প

আরেকটি ট্রফির লড়াইয়ের আগে পেছনে ফিরে দেখে নেওয়া যাক আগের সাত আসরের শেষের নায়কের কীর্তি।

মাজহারুল ইসলামবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 12 Nov 2022, 05:16 AM
Updated : 12 Nov 2022, 05:16 AM

ভরপুর রোমাঞ্চ আর নানা নাটকীয়তা তো ছিলই, সঙ্গে অবিশ্বাস্য সব ফল এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে করে তুলেছে ‘অঘটনের আসর’। প্রাথমিক পর্ব, সুপার টুয়েলভ এবং সেমি-ফাইনালের কঠিন সব বাধা পেরিয়ে ফাইনালের মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে পাকিস্তান ও ইংল্যান্ড।

শিরোপা হাসি হাসবে কারা? কে হবে ফাইনালের মধ্যমণি? এমন সব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সমর্থকদের মনে। আলোচনার টেবিলে নিশ্চয় ঝড় তুলছে নানা তথ্য-উপাত্ত।

সব জল্পনা-কল্পনার হিসেব মিলবে আগামী রোববার। মেলবোর্নের সবুজ আঙিনায় দুপুর ২টায় শুরু হবে শ্রেষ্টত্বের লড়াই।

আরেকটি ট্রফির লড়াইয়ের আগে পেছনে ফিরে আগের সাত আসরের ফাইনালের দিকে নজর দেওয়া যাক। কার আলোয় আলোকিত হয়েছিল শ্রেষ্টত্বের লড়াই? কে জিতেছিলেন ফাইনাল সেরার পুরস্কার।

২০০৭ বিশ্বকাপ: ইরফান পাঠান

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম ফাইনাল, মুখোমুখি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তান - একজন খেলোয়াড়ের কাছে নিজেকে চেনাতে এর চেয়ে বড় মঞ্চ আর কী হতে পারে!

জোহানেসবার্গের ওই ম্যাচে দুই দলে ছিল না তারকার অভাব। তাদের মাঝে সেরাদের সেরা হওয়ার সম্ভাবনা যার ছিল সবচেয়ে কম, সেই ইরফান পাঠানই শেষ পর্যন্ত ব্যবধান গড়ে দেন।

প্রথমে ব্যাট করে পাকিস্তানকে ১৫৮ রানের লক্ষ্য দিয়ে বল হাতে শুরু থেকেই চেপে ধরেছিল ভারত। তবে বিস্ময়করভাবে ইরফানকে অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি আক্রমণে আনেন পঞ্চম বোলার হিসেবে।

ততক্ষণে ৬৫ রানে চার উইকেট হারিয়ে কাঁপছে পাকিস্তান। তবে জুটিতে ছিলেন টুর্নামেন্ট জুড়ে দলটির ব্যাটিং স্তম্ভ হয়ে ওঠা শোয়েব মালিক ও মিসবাহ উল হক। সেমি-ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে রান তাড়ায় প্রায় একই পরিস্থিতি থেকে ম্যাচ বের করে এনেছিলেন তারা। ১৬৬ রানের লক্ষ্যে ৪৬ রানে ৪ উইকেট পড়ার পর এই দুজনের অপরাজিত জুটিতেই জিতেছিল পাকিস্তান।

ফাইনালে অবশ্য মালিক শুরুটা করেছিলেন ধীরলয়ে। তবে তার ও মিসবাহর জুটি জমে গেলে বিপদ হতে পারত ভারতের। দ্বাদশ ওভারে পরপর দুই বলে দুই উইকেট নিয়ে দলকে চালকের আসনে বসান ইরফান।

প্রথমে ফেরান ১৭ বলে ৮ রান করা মালিককে। এরপর শাহিদ আফ্রিদিকে।

অল্প সময়ে আফ্রিদির ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য সবার জানা। মিসবাহ একপ্রান্তে থাকলেও পাকিস্তানের আশার বেলুন অনেকটাই চুপসে যায় যখন প্রথম বলেই ছক্কায় ওড়াতে গিয়ে আউট হয়ে যান আফ্রিদি। ইরফানের গর্জন আর ভারত দলের উল্লাসই বলে দিচ্ছিল উইকেটটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাদের জন্য।

দ্রুত রান তুলে মিসবাহকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন পেসার ইয়াসির আরাফাত। নিজের শেষ ওভারের শেষ বলে ১১ বলে ১৫ রান করা ইয়াসিরকেও বোল্ড করে দেন ইরফান। উইকেটটি ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ ছিল ওই ওভারে তিনি দিয়েছিলেন মাত্র ৫ রান। তার বোলিং ফিগারটাও ছিল দুর্দান্ত, ৪-০-১৬-৩! 

এরপরও অবশ্য ফাইনালের নায়ক প্রায় হয়েই যাচ্ছিলেন মিসবাহ। কিন্তু নাটকীয় শেষ ওভার আর মিসবাহর ‘মোমেন্ট অব ম্যাডনেসে’ ৩ বল বাকি থাকতে ১৫২ রানে অলআউট হয়ে যায় পাকিস্তান।

এত বছর পর ফিরে তাকালে ঘটনাবহুল ওই ফাইনালে সবার আগে হয়ত মনে পড়বে গৌতম গম্ভীরের দুর্দান্ত ফিফটি, রান তাড়ায় ইমরান নাজিরের ঝড়ো ইনিংস বা মিসবাহর নায়ক থেকে খলনায়ক হয়ে যাওয়া বিখ্যাত স্কুপ শটের কথা। তবে আড়ালে থাকা ইরফানের ওই জাদুকরী স্পেলটাই শেষ পর্যন্ত নির্ণায়ক ছিল জয় ও হারের মাঝে।

২০০৯ বিশ্বকাপ: শাহিদ আফ্রিদি

আগের আসরে টুর্নামেন্ট সেরা হয়েছিলেন শাহিদ আফ্রিদি। তবে আক্ষেপ ছিল দলকে শিরোপা না এনে দিতে পারার। ফাইনালে তিনি গোল্ডেন ডাক না মারলে হয়ত চিত্রটা ভিন্ন হতেও পারত। সেই হতাশা ঢাকতে পরেরবার মোক্ষম সময়েই নিজেকে মেলেন ধরেন তিনি।

২০০৯ আসরে দেখা যায় ভিন্ন এক আফ্রিদিকে। সেবার দলে তার ভূমিকা ছিল আলাদা। মিডল অর্ডারের পিঞ্চ হিটার থেকে এবার তাকে ওপরে উঠিয়ে আনা হয়। আর দারুণ কার্যকরী লেগ স্পেন তো আছেই।

টপ ফেভারিট হিসেবে বিবেচনায় ছিল না সেই পাকিস্তান দলটি। কিন্তু আরও একবার নিজেদের ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ তকমার যথার্থতা প্রমাণ করে এগিয়ে যেতে থাকে তারা। সেমি-ফাইনালে রোমাঞ্চকর ম্যাচে তারা দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারায় ৫ রানে। তিনে নেমে ৩৪ বলে ৫১ রান করার পর ১৬ রানে ২ উইকেট নিয়ে আফ্রিদি হন ম্যাচ সেরা।

ফাইনালেও সেই ফর্ম ধরে রাখেন সাবেক অধিনায়ক। 

শ্রীলঙ্কার দেওয়া ১৩৯ রানের লক্ষ্য খুব বড় না হলেও ফাইনালের স্নায়ুচাপের ব্যাপারটা তো ছিল। আর লাসিথ মালিঙ্গা, মুত্তিয়া মুরালিধরন, অজন্তা মেন্ডিসদের নিয়ে গড়া প্রতিপক্ষের শক্তিশালী বোলিং লাইনআপ তো ছিলই। তবে আফ্রিদি যেদিন স্বরুপে থাকেন, সেদিন আসলে প্রতিপক্ষের কিছু করার থাকে সামান্যই।

আফ্রিদি ক্রিজে যান ৪৮ রানের ওপেনিং জুটি ভাঙ্গার পর। আগের ফাইনালের ভুল আর করেননি আফ্রিদি। শুরু থেকেই মেরে খেলার পরিবর্তে সাবধানী তবে কার্যকর ব্যাটিং করেন তিনি। প্রতিপক্ষের মূল বোলারদের ওপর চড়াও না হয়ে বেছে নেন ওই সময়ের উদীয়মান বাঁহাতি পেসার ইসুরু উদানাকে। ৪ ওভারে ৪৪ দেন রান তিনি।

আফ্রিদি সুযোগ বুঝে আক্রমণ করেন মুরালিধরন ও মেন্ডিসকেও। শেষ পর্যন্ত দুটি করে চার-ছক্কায় ৪০ বলে ৫২ রানে অপরাজিত থেকে দলকে জেতান আফ্রিদি। ৯ বল বাকি থাকতে ৮ উইকেটের জয় নিশ্চিতের পর হেলমেট খুলে দুই হাত প্রসারিত করে যেন বলছিলেন, ‘এবার পেরেছি আমি!’

২০১০ বিশ্বকাপ: ক্রেগ কিসওয়েটার

সীমিত ওভারের ক্রিকেটে একটা সময় বেশ সম্ভাবনাময় বিবেচনা করা হতো ইংল্যান্ডের ক্রেগ কিসওয়েটারকে। ৪০ ওয়ানডে ও ২৫ টি-টোয়েন্টিতে যদিও বলার মতো খুব বেশি কিছু করতে পারেননি তিনি। তবে সবচেয়ে বড় মঞ্চে যা করেছেন, সেটাই তাকে লম্বা সময় ধরে মনে রাখার জন্য যথেষ্ট।

দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর ফাইনালে প্রথমে ব্যাট করে ডেভিড হাসির ফিফটি ও ক্যামেরন হোয়াইটের ক্যামিওতে ৬ উইকেটে ১৪৭ রানের সংগ্রহ গড়ে অস্ট্রেলিয়া। রান তাড়ায় ইংল্যান্ডের অনভিজ্ঞ ব্যাটিং লাইনআপে মূল ভরসা ছিলেন কেভিন পিটারসেন। আসরে দারুণ ধারাবাহিক তো ছিলেনই, পাশাপাশি উদ্ভাবনী শট খেলায় ভীষণ পারদর্শী পিটারসেনের সঙ্গে অন্যদের তফাৎটা ছিল বেশ।

ফাইনালেও চমৎকার খেলেন পিটারসেন। তিনে নেমে করেন ঝড়ো ৪৭ রান, ৩১ বলে। তবে ওই বিশ্বকাপ দিয়েই আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে পা রাখা তরুণ কিসওয়েটারের ইনিংসটিই মূলত শেষ করে দেয় অস্ট্রেলিয়ার নুন্যতম লড়াই করার সম্ভবনা।

পিটারসেন হাত খুলে খেলছিলেন, আর অন্য প্রান্তে নীরব ঘাতকের মতো ফিফটি তুলে নেন কিসওয়েটার। ম্যাচ অবশ্য শেষ করে আসতে পারেননি তিনি। তবে সাতটি চার ও দুইটা ছক্কায় সাজানো তার ৪৯ বলে ৬৩ রানের ইনিংস নিশ্চিত করে দেয় ইংলিশদের অনায়াস জয়। শেষ পর্যন্ত তারা জেতে ৮ উইকেট ও ৩ ওভার হাতে রেখেই!

পিটারসেন জ্বলে উঠেছেন, এমন দিনেও কিসওয়েটারের ম্যাচ সেরা হওয়াই বলে দেয় কতটা বিশেষ ছিল তার ইনিংসটি।

২০১২ বিশ্বকাপ:  মারলন স্যামুয়েলস

দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ। সঙ্গে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশেলে দল গড়া শ্রীলঙ্কা দারুণ খেলে ফাইনালে জায়গা করে নেয়। ফাইনালেও ফেভারিট ধরা হচ্ছিল তাদেরকে।

প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ; তাদের খেলোয়াড়রা তখনও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ফেরিওয়ালা হয়ে ওঠেনি। তবে ২০ ওভারের ক্রিকেটের সেরা সব তারকা ছিল দলটিতে। ফাইনালের মঞ্চে ক্রিস গেইল, ডোয়াইন ব্রাভো, কাইরন পোলার্ডদের ছাপিয়ে বাজিমাত করেন এমন একজন, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে যার ব্যাটিং নিয়ে তেমন কোনো আলোচনাই ছিল না। মারলন স্যামুয়েলস।

টসে জিতে ব্যাট করতে নেমে ক্যারিবিয়ানরা যেন রান করতেই ভুলে গিয়েছিল। প্রথম বাউন্ডারি আসে চতুর্থ ওভারে, স্যামুয়েলসের ব্যাট থেকে। প্রথম ৩ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান ছিল স্রেফ ২! স্বভাববিরুদ্ধ দৃষ্টিকটু এক ইনিংস (১৬ বলে ৩) খেলে গেইল দলকে চাপে ফেলে দেন আরও।

এরপর ব্রাভোকে সঙ্গে নিয়ে ধীরে ধীরে পাল্টা আক্রমণের সূচনা করেন স্যামুয়েলস। টার্গেট করেন মালিঙ্গাকে, যিনি কিনা ওই সময়ে এই সংস্করণে রীতিমত ত্রাস। প্রথম ওভারে চার রান দেওয়া মালিঙ্গার করা ইনিংসের ত্রয়োদশ ওভারে তিনটি ছক্কা হাঁকান স্যামুয়েলস। ওভার থেকে আসে ২১ রান। 

তবে এরপর খুব দ্রুতই ব্রাভো, পোলার্ড, আন্দ্রে রাসেলদের হারিয়ে চাপে পড়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ১৭তম ওভারে আবারও মালিঙ্গাকে পেয়ে তার ওপর দিয়ে ঝড় বইয়ে দেন স্যামুয়েলস। ওই ওভারে দুটি ছক্কার সঙ্গে একটি চার মারেন তিনি, সঙ্গে তিনটি সিঙ্গেলসে আসে ১৯ রান।

শেষ পর্যন্ত স্যামুয়েলসের ৫৫ বলে ৭৮ রানের ইনিংসটির ইতি টানেন জীবন মেন্ডিস। স্যামুয়েলসের ইনিংসে চার ছিল ৪টি, ছক্কা ৬টি।

শেষ ওভারটা তুলনামূলক ভদ্রস্থ হলেও স্যামুয়েলসের বেদম প্রহারের শিকার মালিঙ্গার দিনটা কাটে ভুলে যাওয়ার মতো, ৪-০-৫৪-০! ৬ উইকেট হারিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দাঁড় করায় ১৩৭ রানের ফাইটিং স্কোর।

এই ধরনের ম্যাচে মোমেন্টাম খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রচন্ড চাপের মুখে স্যামুয়েলসের ওই ইনিংস আর দলের সেরা বোলারের ওপর অমন তাণ্ডবের প্রভাবেই কিনা, শুরুটা ভালো হলেও হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ে শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং। মাহেলা জয়াবর্ধনে আর কুমার সাঙ্গাকারা ছাড়া দুই অঙ্কের ঘরে যেতে পারেন কেবল পেসার নুয়ান কুলাসেকারা। কোনো লড়াই-ই করতে পারেনি লঙ্কানরা, গুটিয়ে যায় ১০১ রানে।

স্যামুয়েলসের সেই ইনিংসটি অনেকের কাছেই আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সর্বকালের সেরা ইনিংসগুলোরএকটি। স্পিন সহায়ক উইকেট, মাঠভর্তি স্বাগতিক দর্শক এবং প্রচন্ড চাপের মুখে ব্যাটসম্যানশিপের যে অনন্য নজির সেদিন দেখিয়েছিলেন তিনি, তাও মালিঙ্গার মাপের একজন বোলারকে টার্গেট করে, তাতে স্যামুয়েলসের ওই ইনিংসই সেরা কিনা, তা নিয়ে আলোচনা হওয়াটা খুব বাড়াবাড়ি কিছু নয়।

২০১৪ বিশ্বকাপ: কুমার সাঙ্গাকারা

২০০৭ ও ২০১১ ওয়ানডে বিশ্বকাপ, মাঝে ২০০৯ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ- বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ফাইনাল মানেই যেন শ্রীলঙ্কার জন্য হয়ে উঠেছিল তীরে এসে তরী ডোবার গল্প।

দ্বীপ দেশটির হতাশা তো বটেই, ক্রিকেট ইতিহাসের দুই কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান সাঙ্গাকারা ও জয়াবর্ধনে বিশ্বকাপ জেতা ছাড়াই ক্যারিয়ার শেষ করবেন, এটা মেনে নেওয়া কষ্টকর ছিল সমর্থকদের জন্যও। অবশেষে তাদের অধরা স্বপ্ন পূরণ হয় বাংলাদেশের মাটিতে, ২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে।

ফাইনালের আগে পরিষ্কার ফেভারিট না হলেও ভারত কিছুটা হলেও এগিয়ে ছিল ম্যান অব দা টুর্নামেন্ট বিরাট কোহলির দুর্দান্ত ফর্মের কারণে। ফাইনালেও ধারাবাহিকতা ধরে রেখে ৫৮ বলে ৭৭ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। তবে অন্যদের ব্যর্থতায় ২০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে মাত্র ১৩০ রান করতে পারে ভারত।

লাসিথ মালিঙ্গা ও নুয়ান কুলাসেকারার নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে শেষের দিকে ঝড় তুলতে ব্যর্থ হন যুবরাজ সিং ও মহেন্দ্র সিং ধোনি।

মিরপুরের স্লো উইকেট, ভারতের স্পিন শক্তিমত্তা ও ফাইনালে রান তাড়ার চাপের বিবেচনায় ১৩১ রানের লক্ষ্যও ছিল চ্যালেঞ্জিং। শুরুতেই কুসল পেরেরাকে হারানোর পর ১৬ বলে ১৮ রান করে ফিরে যান তিলকারত্নে দিলশানও। ৫.৫ ওভারে ২ উইকেটে লঙ্কানদের সংগ্রহ তখন ৪১।

এরপর ক্রিজে জয়াবর্ধনের সঙ্গী হন সাঙ্গাকারা। শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট ইতিহাসের অসংখ্য জয়ের কারিগর এই জুটির ওপর অনেকটাই নির্ভর করছিল ম্যাচের ভাগ্য। তবে খুব বেশিদূর যেতে পারেননি তারা। ২৪ রানে আউট হন জয়াবর্ধনে। লাহিরু থিরিমান্নেও দ্রুত ফিরলে চাপে পড়ে যায় শ্রীলঙ্কা।

তবে লক্ষ্যে অবিচল থেকে একপ্রান্ত আগলে রাখেন সাঙ্গাকারা। দেখেশুনে খেলে হিসেবী ব্যাটিংয়ে দলকে পথে রাখেন তিনি। এতে অন্য প্রান্তে চাপমুক্ত হয়ে হাত খুলে ব্যাটিং করাটা সহজ হয়ে যায় থিসারা পেরেরার জন্য। তার ১৪ বলে ২৩ রানের ক্যামিও ইনিংসে ১৩ বল বাকি থাকতেই জিতে যায় শ্রীলঙ্কা।

জয়ের মঞ্চ তৈরি করে দেওয়া সাঙ্গাকারা শেষ পর্যন্ত ৩৫ বলে ৬টি চার ও এক ছক্কায় অপরাজিত থাকেন ৫২ রানে। বিশ্ব জয়ের আনন্দে ওই ম্যাচ দিয়েই আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে বিদায় নেন জয়াবর্ধনে ও সাঙ্গাকারা।

ক্যারিয়ারে দলের অনেক সাফল্যের কারিগর সাঙ্গাকারা বিদায়বেলায়ও জয়ের নায়ক।

২০১৬ বিশ্বকাপ: মারলন স্যামুয়েলস

টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে সেরা ইনিংসগুলো খেলার জন্য যেন বিশ্বকাপের ফাইনালকে বেছে নেওয়ার পণ করেছিলেন মারলন স্যামুয়েলস।

২০১২ আসরের ফাইনালে ওই ইনিংসের পর আন্তর্জাতিক ও ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি খেললেও সেভাবে আলোচনায় আসেনি তার কোনো ইনিংস। এরপর আবার আরেকটি বিশ্বকাপের ফাইনাল দিয়েই শুরু হয় স্যামুয়েলস বন্দনা।

ভারতে অনুষ্ঠেয় ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি উক্তি ছিল সাবেক ওয়েস্ট ইন্ডিজ পেসার ও বর্তমানে ধারাভাষ্যকার ইয়ান বিশপের। ‘রিমেম্বার দা নেইম’ - রান তাড়ায় ইনিংসের শেষ ওভারে কার্লোস ব্র্যাথওয়েটের তাণ্ডবের পর এমনটা বলেছিলেন বিশপ।

স্যামুয়েলসের ক্ষেত্রেও কথাটা হয়তো যথার্থই হতো।

ইংল্যান্ডের ছুড়ে দেওয়া ১৫৬ রানের লক্ষ্যে নামা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে শুরুতেই চমকে দেন জো রুট। তার নিরীহ অফ স্পিনে বড় শট খেলতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনেন জনসন চার্লস ও ক্রিস গেইল। রানের খাতা খোলার আগেই বিদায় নেন লেন্ডল সিমন্স। ১১ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে তখন ভীষণ চাপের মুখে ক্যারিবিয়ানরা। জয়ের সম্ভাবনায় আরও আত্নবিশ্বাসী হয়ে ওঠে ইংল্যান্ড। 

তবে ক্রিজে যে ছিলেন স্যামুয়েলস! ডোয়াইন ব্রাভোকে নিয়ে প্রথমে গড়েন সাবধানী জুটি। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হাত খুলে খেলতে শুরু করেন স্যামুয়েলস। তবে ষোড়শ ওভারে ১০৭ রানে ষষ্ঠ উইকেট পড়ার পর আবার চাপ ফিরে আসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ শিবিরে।

সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ভিত গড়ে দেন স্যামুয়েলস। তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন অলরাউন্ডার ব্র্যাথওয়েট। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ব্র্যাথওয়েট সব আলো কেড়ে নেন; বেন স্টোকসের করা ২০তম ওভারের প্রথম চার বলে চার ছক্কা হাঁকিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন। সামুয়েলস অপরাজিত থাকেন ৬৬ বলে ৮৫ রানে, চার ৯টি, ছক্কা ২টি।

২০২১ বিশ্বকাপ: মিচেল মার্শ

গত কয়েক বছরে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সবচেয়ে উন্নতি করা খেলোয়াড়দের সংক্ষিপ্ত তালিকা করলে সেখানে শীর্ষেই থাকবে অস্ট্রেলিয়া অলরাউন্ডার মিচেল মার্শের নাম।

সব সংস্করণে আগে থেকেই বেশ কার্যকর ছিলেন তিনি। তবে ২০ ওভারের ক্রিকেটে নতুন ভূমিকায় টপ অর্ডারে ব্যাটিংয়ের কারণে বিশ্বকাপের আগে আলোচনায় উঠে আসেন মার্শ। সেরা তারকাদের অনেকের অনুপস্থিতিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও বাংলাদেশ সফরে তিন নম্বরে ব্যাট করে খেলেন দারুণ কিছু ইনিংস।

দুবাই ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপের পূর্ণ শক্তির দলেও তিন নম্বর স্থান ধরে রাখেন মার্শ। দলের আস্থার প্রতিদান দেওয়ার জন্য তিনি বেছে নেন সবচেয়ে বড় মঞ্চ, ফাইনাল।

প্রথমে ব্যাট করে অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনের ৮৫ রানের ইনিংসে ভর করে ৪ উইকেটে ১৭২ রান করে নিউ জিল্যান্ড। বল হাতে ১ ওভারে ১১ রান দেন মার্শ।

তবে তার মূল কাজটা বাকি ছিল ব্যাট হাতে। ৫ রানে অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ ফিরে গেলে ক্রিজে আসেন মার্শ। ডেভিড ওয়ার্নারের সঙ্গে গড়ে তোলেন ৯২ রানের জুটি, যা ম্যাচ থেকে অনেকটাই ছিটকে দেয় নিউ জিল্যান্ডকে। ফিফটি করে ওয়ার্নার ফিরে গেলেও মার্শের ব্যাটে ম্যাচের লাগাম ছিল অস্ট্রেলিয়ার হাতেই। শেষ পর্যন্ত ৫০ বলে ৭৭ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি, ইনিংসে ৬টি চারের পাশাপাশি ছক্কা হাঁকান চারটি।

শেষের দিকে ২৮ রানের ক্যামিওতে রান তাড়ায় অস্ট্রেলিয়ার কাজটা সহজ করে দেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। তবে কিউইদের শক্তিশালী বোলিং লাইনআপের বিপক্ষে এক প্রান্ত আগলে খেলা মার্শের ইনিংসটিই মূলত পার্থক্য গড়ে দেয় দুই দলের মধ্যে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক