Published : 10 Jul 2023, 07:36 PM
‘হ্যাঁ… ভালো। কোনো সমস্যা নেই’- দলের ভেতরের আবহ নিয়ে ছোট্ট করে বললেন নিক পোথাস। তামিম ইকবালের অবসর ঘিরে মাঠের বাইরে নাটকীয় ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি, মাঠের ভেতরে ব্যাটিং-বোলিংয়ে অসহায় প্রদর্শনী; সব মিলিয়ে দলের আবহাওয়া খুব একটা ফুরফুরে হওয়ার কথা নয়। তবে বাংলাদেশের সহকারী কোচের দাবি ভিন্ন। দলকে তিনি চনমনেই দেখছেন। দুটি ম্যাচ হারার যে অস্বস্তি, ক্রিকেটাররা তা পেশাদারিত্ব দিয়েই জয় করবেন বলে বিশ্বাস তার।
চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরি স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের শেষ ম্যাচে লড়বে বাংলাদেশ। এক ম্যাচ বাকি থাকতেই সিরিজ জিতে নিয়েছে সফরকারীরা। বাংলাদেশের সামনে শঙ্কা ৯ বছরের বেশি সময় পর ঘরের মাঠে হোয়াইটওয়াশড হওয়ার।
২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সবশেষ ঘরের মাঠে কোনো সিরিজের সব ম্যাচ হেরেছে বাংলাদেশ। এরপর চলতি সিরিজের আগে ১৭টি সিরিজের মধ্যে তারা জিতেছে ১৪টি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হেরে যাওয়া দুই সিরিজেই জয় একটি করে। ভারতের বিপক্ষে সিরিজে বৃষ্টিতে ভেসেছে এক ম্যাচ।
এবার আফগানিস্তানের বিপক্ষে শেষ ম্যাচেও আছে বৃষ্টির শঙ্কা। তবে এর চেয়েও বড় দুর্ভাবনার বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি। প্রথম ম্যাচে হারের পর আচমকাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত জানান তামিম ইকবাল। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করে তিনি প্রত্যাহার করেন অবসর।

সিদ্ধান্ত বদলে দেড় মাসের ছুটিতে গেছেন তামিম। তার অবর্তমানে শেষ দুই ওয়ানডেতে অধিনায়কত্ব পেয়েছেন লিটন দাস। সিরিজে তাদের দুজনের নেতৃত্বেই একটি করে ম্যাচ হেরেছে বাংলাদেশ। প্রথমটিতে ছিল ব্যাটসম্যানদের বিবর্ণ প্রদর্শনী। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে বোলাররা খারাপ করার পর ব্যাটসম্যানরাও পারেননি ঘুরে দাঁড়াতে।
বৃষ্টির কারণে তৃতীয় ম্যাচের আগের দিন অনুশীলন করতে পারেনি বাংলাদেশ। পরপর দুই দিন হোটেলবন্দী অবস্থায়ই কাটে স্বাগতিক ক্রিকেটারদের সময়। দুপুরে মাঠে এসে শুধু সংবাদ সম্মেলন করেন পোথাস।
মাঠ ও মাঠের বাইরে পরিস্থিতি যখন গুমোট, তখন দলকে উজ্জীতি করার দায়িত্ব কোচিং স্টাফের। তবে কোচদের চেষ্টার চেয়ে ক্রিকেটারদের পেশাদারিত্বের ভূমিকাই এখানে বেশি দেখছেন সহকারী কোচ।
“আমরা এখানে পেশাদার ক্রিকেটারদের ব্যাপারে কথা বলছি৷ নিজেদের কাজ সম্পর্কে তারা খুবই পেশাদার। তো আমাদের তরফ থেকে খুব বেশি অনুপ্রাণিত করতে হয় না। তারা সবসময় প্রস্তুত। এটি দারুণ সব খেলোয়াড়ের দল।”
দ্বিতীয় ম্যাচে হারের পর মেহেদী হাসান মিরাজ বলেছিলেন, একটি সিরিজ হারায়ই খারাপ দল হয়ে যাননি তারা। শেষ ওয়ানডের আগের দিন সেটিরই প্রতিধ্বনি শোনা গেল পোথাসের কণ্ঠে।
“আমরা খুব দ্রুত ভুলে যাচ্ছি, ভারত, ইংল্যান্ড (আসলে ২-১ এ হার), আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জিতেছে এই দল। এত দ্রুত ভুলে না যাই! বিশ্বমানের এই ক্রিকেটারদের আমরা শুধু দুই ম্যাচ দিয়ে মূল্যায়ন করছি। এটি নিশ্চিত করতে হবে, মূল্যায়ন করার সময় যেন লম্বা সময় বিবেচনায় নেই।”
লম্বা সময় বিবেচনায়ও তেমন ভালো নয় ব্যাটসম্যানদের পারফরম্যান্স। গত বছরের ভারত সিরিজ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ১৪ ওয়ানডেতে চল্লিশের বেশি গড়ে রান করেছেন শুধু মুশফিকুর রহিম ও তাওহিদ হৃদয়। এই সময়ে সেঞ্চুরি ছুঁতে পেরেছেন স্রেফ তিনজন- মুশফিক, মেহেদী হাসান মিরাজ, নাজমুল শান্ত।
ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক ও দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান লিটন দাস এই ১৪ ম্যাচে স্রেফ ২৫ গড়ে করেছেন ৩২৫ রান। সাকিব আল হাসান ১২ ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে ৩৪.৭৫ গড়ে করেছেন ৪১৭ রান।
চলতি সিরিজের দুই ম্যাচের অবস্থা আরও নাজুক। দুই ম্যাচে পঞ্চাশের দেখা পেয়েছেন শুধু হৃদয় ও মুশফিক। প্রথমটিতে হৃদয় করেন ৫১ রান। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে মুশফিক খেলেন ৬৯ রানের ইনিংস। বাকি কেউ দুই ম্যাচে ত্রিশ রানও ছুঁতে পারেননি।

ব্যাটসম্যানদের এই পারফরম্যান্সেও দুর্ভাবনার তেমন কিছু দেখেন না পোথাস। বরং এশিয়া কাপ ও বিশ্বকাপের আগে আফগানিস্তানের স্পিন চ্যালেঞ্জকে নিজেদের প্রস্তুতির সুযোগ হিসেবেই নিচ্ছেন সহকারী কোচ।
“পরিসংখ্যানের কথা যদি বলেন, তাহলে বিশ্বের যে কেউই বলবে যে আমরা এরকম কিছুর চেষ্টা করছি না। তাহলে বলতে পারেন, এমন ফলাফল কেন হয়েছে? তা জিজ্ঞেস করলে, আফগানিস্তানের স্পিনের আলোচনায় যেতে হয়।”
“প্রথম বল থেকেই এই মানের স্পিন মোকাবিলা করা... যারা ৬-৭ বছর ধরে বিশ্বের সব ব্যাটসম্যানের বিপক্ষে দারুণ করেছে, তাদের মোকাবিলা করা খুব খুব কঠিন। যত বেশি সময় (ক্রিজে) টিকে থাকা যায়, তত কাজ সহজ হয়। কোনো আক্রমণের বিপক্ষেই এর ব্যতিক্রম কিছু নেই। আমাদের সামনে দুইটি বড় টুর্নামেন্ট আছে। আমরা এটি (স্পিন আক্রমণের চ্যালেঞ্জ) ইতিবাচকভাবেই দেখছি।”
গুরুত্বপূর্ণ সাত নম্বর পজিশনেও ব্যাটিং ব্যর্থতার অভিন্ন চিত্র। সবশেষ ১৪ ম্যাচে সবচেয়ে বেশি ৮ বার সাত নম্বরে নেমেছেন আফিফ হোসেন। যেখানে স্রেফ ৮.১২ গড়ে তার সংগ্রহ ৬৫ রান। শেষ দিকে দ্রুত রান তোলার চাহিদাও মেটাতে পারেননি আফিফ। স্ট্রাইক রেট খুবই নাজুক; ৬৩.১০!
তাই প্রশ্ন উঠছে দলে তার অবস্থান নিয়ে। এখানে পোথাস বল ঠেলে দেন নির্বাচকদের কোর্টে। তবে কোচ হিসেবে আফিফের ব্যাটিং স্বত্ত্বায় আস্থার কথাও জানিয়ে দেন তিনি।
“আমার মতে, এটি (সাত নম্বর পজিশনের ব্যাটসম্যান) নির্বাচকদের প্রশ্ন! আফিফ কেবল দুটি ম্যাচ খেলেছে। আমরা যদি লাগাতার পরিবর্তনের মধ্যে থাকি, তাহলে ক্রিকেটাররা সবসময় চাপ অনুভব করবে৷ ক্রিকেটারদের ওপর আস্থা রাখতে হবে। সাত নম্বর পজিশনটি ভিন্ন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দলের ভারসাম্যের ওপরও নির্ভর করবে৷”
“পারফরম্যান্সের কথা বললে, বিশ্বের কোনো ব্যাটসম্যানই নির্দিষ্টসংখ্যক কোনো রান নিয়ে খুশি হবে না৷ তবে আমি কি ব্যাটসম্যান হিসেবে আফিফকে নিয়ে খুশি? শতভাগ! কারণ সে কোয়ালিটি ব্যাটসম্যান৷”
ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েই অবশ্য জাতীয় দলে ফিরেছেন আফিফ। ঘরের মাঠে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের শেষ ওয়ানডে থেকে ‘ছুটি’ পাওয়ার পর, ইংল্যান্ড সফরের দল থেকে বাদই পড়ে যান তরুণ ব্যাটসম্যান।
পরে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে মিডল-অর্ডারে ব্যাটিংয়ে নেমে ৫৫ গড় ও ১১০ স্ট্রাইক রেটে ৫৫০ রান করে জাতীয় দলে জায়গা ফিরে পান আফিফ। তবে ওই ছন্দ জাতীয় দলে দেখাতে পারছেন না তিনি। প্রথম ম্যাচে ৪ রানের পর দ্বিতীয়টি ফেরেন খালি হাতেই।
তবে ঘরোয়া ক্রিকেটের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যবধানটুকুও তুলে ধরেন পোথাস। তাই দ্রুত ফল পাওয়ার দিকে জোর না দিয়ে ধৈর্য ধরে আস্থা রাখার কথা বলেন বাংলাদেশের সহকারী কোচ।
“পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক, একটা পর্যায়ে মানিয়ে নেওয়া যায়। তবে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। মাখায়া এনটিনির মতো বোলারও শুরুর সময়ে তেমন ভালো ছিল না। তবে তার ওপর ভরসা রাখলে, সে মানিয়ে নেবে। কারণ তার মান অনেক উঁচুতে। এই ছেলেদেরও মান অনেক উঁচু। তাই তাদের ওপর আমরা আস্থা রেখেছি।”