Published : 07 Oct 2025, 01:12 PM
হায়দরাবাদের অটোরিকশা চালকের ছেলে ভারতের ক্রিকেট নায়ক। মোহাম্মদ সিরাজের গল্পটা রূপকথার মতোই। সেসব নিয়ে কম বীরত্বগাঁথা রচনা হয়নি, চর্চাও হয়েছে তুমুল। তবে ক্রিকেট মাঠে ভালো দিনে যেমন তালি পেয়েছেন, খারাপ দিনে গালিও কম শুনতে হয়নি তাকে। এমনকি বাবার পরিচয়ের সঙ্গে মিলিয়ে ট্রল করা হয়েছে তাকে।
ভারতের এই সময়ের সেরা বোলারদের একজন সিরাজ। বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে তিনি পেস আক্রমণের বড় ভরসা। গত জুলাইয়ে ইংল্যান্ড সফরে চোট নিয়েও তার বিরোচিত বোলিং পারফরম্যান্সে সিরিজ ড্র করে ফেরে ভারত। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সদ্য সমাপ্ত আহমেদাবাদ টেস্টেও শিকার করেন তিনি সাত উইকেট।
তবে সবদিন তো আর সমান যায় না। ক্যারিয়ারের এখনকার ঠিকানায় আসতেও অনেক বন্ধুর পথ পেরিয়ে আসতে হয়েছে তাকে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ৩১ বছর বয়সী পেসার ফিরে গেলেন তেমনই কিছু দিনে।
“আইপিএলে যখন সবকিছু ভালোভাবে হচ্ছিল না আমার, খুব বাজেভাজে ট্রল করা হয়েছে আমাকে। ভালো খেললে সমর্থকেরা বলতেন, ‘সিরাজের মতো কেউ নেই।’ এরপরই একদিন পারফর্ম করতে না পারলে তারাই বলতেন, ‘বাপের সঙ্গে গিয়ে অটো চালাও।’ এসবের মানে কী!”
সেই সময়টায় মাহেন্দ্র সিং ধোনির পরামর্শ সিরাজকে সহায়তা করেছে মানসিক বাধা জয় করতে।
“আমার মনে আছে, ভারতীয় দলে যোগ দেওয়ার পর ধোনি আমাকে বলেছিলেন, ‘কারও কথায় কান দেওয়ার দরকার নেই। তুই ভালো করলে গোটা দুনিয়াকে পাশে পাবি, খারাপ করলে এই দুনিয়াই তোকে গালি দেবে।’ তখনই আমি অনুধাবন করেছিলাম, বাইরের প্রশংসা আমার দরকার নেই। আমার দল ও পরিবার কী ভাবছে, সেটিই আসল।”

ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে ওঠার দিনগুলিতে ফিরে গেলেন সিরাজ। যে পরিবার থেকে উঠে এসেছেন তিনি, সেখানে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখাও ছিল পাপ। বাবা দিন-রাত অটো চালাতেন, মা হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে সংসার চালাতেন। সিরাজও টেনিস বলে খ্যাপ খেলে মাঝেমধ্যে কিছু পয়সা জোগাতেন পরিবারে।
ভারতের হয়ে খেলবেন, এটা কল্পনার সীমানাতেও ছিল না সিরাজের।
“ভারতের হয়ে খেলার তো স্বপ্নও দেখিনি কখনও। টাকাপয়সা ছিল না আমাদের। টেনিস বলে খেলে মাঝেমধ্যে যা আয় করতাম, বাবা-মার হাতে তুলে দিতাম।”
সিরাজ যখন জেলা পর্যায়ে প্রথম বড় টুর্নামেন্টে খেলেন, তখনও ক্রিকেট বল হাতে নেননি। টেনিস বলেই খেলতেন। ভিজায় আনন্দ মাঠে একদিন তার ওপর দৃষ্টি পড়ে চারমিনার ক্রিকেট ক্লাবের মালিকের। তিনি সিরাজকে তার ক্লাবে নিয়ে আসেন।
তার কথাও কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করলেন সিরাজ।
“তিনি আমাকে তার ক্লাবে যোগ দিতে বললেন। আমি টাকাপয়সার সমস্যার কথা বললাম। তিনি বললেন, ‘টেনশনের কিছু নেই, আমরা সব দেব।”
সেটিই তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রথমবার ক্রিকেট বুট পায়ে ক্রিকেট বলে বোলিং করেন। দ্রুতই গতি আর আগ্রাসন দিয়ে হায়দরাবাদের ক্লাব ক্রিকেটে নাম কামিয়ে ফেলেন। আইপিএলে নেট বোলার হিসেবে বল করার সুযোগ পান। সেখানে ভিরাট কোহলি, লোকেশ রাহুলদের সামনে দারুণ বোলিং করে ভারতীয় দলের বোলিং কোচ ভারত অরুনের নজর কাড়েন।
তার পরও হায়দরাবাদের রাঞ্জি ট্রফির দলে তার সুযোগ মেলেনি। তবে ভারত অরুনের হস্তক্ষেপেই সুযোগটা পান তিনি।
“অরুন স্যার বলেছিলেন, ‘ওই ছেলেটা কোথায়?’ তিনিই আমাকে দলে জায়গা করে দেন এবং ওই বছর আমি রাঞ্জিতে সর্বোচ্চ উইকেট নেই।”
এরপরের গল্পটা অনেকেরই জানা। রাঞ্জি ট্রফিতে আলো ছড়িয়ে আইপিএলে নজর কেড়ে ভারতীয় দলে জায়গা করে নেন। এখন ৪২ টেস্ট খেলে ১৩০ উইকেট তার। ভারতের হয়ে জিতেছেন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, খেলেছেন ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে।
এখন তিনি দারুণ তৃপ্ত, “ওপরওয়ালা সহায় হয়েছেন, নিজে পরিশ্রম করেছি, বাবা-মায়ের দোয়া ছিল।”