Published : 10 May 2026, 07:20 PM
সকাল থেকেই মিরপুরে ছিল রোদ আর মেঘের লুকোচুরি। কখনও তীব্র আলো, কখনও কালো মেঘের ছায়া। দুপুরে তো তুমুল বৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল ভেসে যাবে চরাচর। সেই বৃষ্টিও শেষ হলো এক সময়। আবার খেলা শুরু হওয়ার পর রোদ-মেঘের খেলাও চলল। প্রকৃতির এই নানা রঙের মাঝেও মেহেদী হাসান মিরাজ দিনজুড়ে রইলেন একই রূপে। ধ্রুপদ অফ স্পিনের প্রদর্শনীতে তিনি ম্যাচে ফেরালেন বাংলাদেশকে।
মিরপুর টেস্টের তৃতীয় দিনে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের লিড নেওয়ার মূল নায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। ১০২ রান দিয়ে এই অফ স্পিনার শিকার করেছেন ৫ উইকেট।
রান দেওয়ার সেঞ্চুরি দেখে সংশয়ের চোখে তাকানোর কিছু নেই। বোলিং করেছেন তিনি ৩৮ ওভার! ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন ২.৬৮। উইকেট যেমন তার সবচেয়ে বেশি, তেমনি সবচেয়ে কিপটেও তিনিই।
অথচ দলের মূল ভরসা ছিল পেস আক্রমণ। এমনকি দ্বিতীয় দিনে পেসারদের এলোমেলো বোলিংয়ের পর দিন শেষে সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেছিলেন, পেসারদের হাত ধরেই ম্যাচে ফিরতে হবে দলকে। কিন্তু মিরাজ তো হাত বাড়িয়েই ছিলেন!
হতাশাময় দ্বিতীয় দিনে পাকিস্তানের ১ উইকেটে ১৭৯ রানে একমাত্র উইকেটটি নিয়েছিলেন তিনিই। তৃতীয় দিনে দল লড়াইয়ের রসদ পায় তাসকিন আহমেদের সকালের স্পেলে। সেঞ্চুরিয়ান আজান আওয়াইস ও পাকিস্তান অধিনায়ক শান মাসুদকে ফেরান তিনি।

বাঁহাতি ব্যাটসম্যানে ভরা ব্যাটিং লাইন আপে এরপর হানা দেন মিরাজ। মিডল অর্ডারের স্তম্ভ সাউদ শাকিল ফেরেন শূন্য রানে। অভিষেকে আব্দুল্লাহ ফাজালের লড়াই থামে ৬০ রানে।
সালমান আলি আগা ও মোহাম্মাদ রিজওয়ানের জুটি আবার অনেকটা সময় হতাশায় রাখে বাংলাদেশকে। এই দুজনের বিদায়ের পর আবার দুই বাঁহাতি নোমান আলি ও শাহিন শাহ আফ্রিদিকে ফিরিয়ে মিরাজ পূর্ণ করেন ৫ উইকেট।
৫৭ টেস্টের ক্যারিয়ারে ইনিংসে ৫ উইকেট নিলেন তিনি ১৪ বার। বাংলাদেশ তার ওপরে আছেন কেবল তাইজুল ইসলাম (৫৮ টেস্টে ১৭ বার) ও সাকিব আল হাসান (৭১ টেস্টে ১৯ বার)।
মিরপুরের উইকেটে সবুজাভ অবস্থা অনেকটাই মুছে যায় তৃতীয় দিনে। তবে স্পিনারদের সহায়তা খুব একটা ছিল না। মাঝেমধ্যে দু-একটি ডেলিভারি বাড়াত লাফিয়েছে, টার্ন মিলেছে হালকা। কিন্তু স্পিন বান্ধব ততটা ছিল না।
তার পরও কীভাবে সফল হলেন, দিনের খেলা শেষে জানালেন মিরাজ।
“উইকেটটা অনেক ভালো ছিল। ওরা কিন্তু শুরুর দিকে অনেক ভালো ব্যাটিং করেছে। জুটিও হয়েছে। তবে আমরা ভালো জায়গায় বল করার চেষ্টা করেছি। আগের দিন ওরা খুব ভালো ব্যাটিং করেছে এবং আমাদের মানসিকতা ছিল এরকম যে, যেহেতু আমরা ভালো করতে পারিনি ও অনেক রান দিয়ে দিয়েছি, কীভাবে সেই রান আটকাতে পারি। এভাবেই আমাদের মনোযোগ ছিল।”
“ওরকম বেশি স্পিন হচ্ছিল না (উইকেটে)। আমি চেষ্টা করেছি ভালো জায়গায় বল করার জন্য। বাড়তি কিছু সুবিধাও পেয়েছি পেয়েছি। সব বল যে স্পিন করেছে, এরকম নয়। কিছু কিছু বল স্পিন করেছে। ওইটা হয়তো ব্যাটসম্যানের মনে সংশয় তৈরি করেছে। এর জন্য হয়তো উইকেট পেতে আরও সহজ হয়ে গিয়েছে।”
সকালে এক প্রান্তে মিরাজ, আরেক প্রান্তে নাহিদ রানাকে দিয়ে বোলিং শুরু করেছিল বাংলাদেশ। তবে নাহিদ ভালো করতে না পারায় দ্রুতই তাসকিনকে আনা হয়। দুই প্রান্তে তখন জমে ওঠে তাদের বোলিং জুটি। সেভাবেই মিলেছে সাফল্য।
“আমরা যেটা করেছি, আমি এবং তাসকিন প্রান্ত থেকে খুব ভালো বোলিং করেছি এবং পার্টনারশিপ বোলিং করেছি। এর জন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং সেজন্য ওরা ভুল করেছে। টেস্ট ক্রিকেট এমন ক্রিকেট যে, যতক্ষণ ভালো জায়গায় বল করবেন এবং ব্যাটসম্যানকে রান না করতে দেবেন, সুযোগ তৈরি হবেই।”
“আমি এবং তাসকিন এভাবেই চেষ্টা করেছি। আমি প্রান্তে আঁটসাঁট বোলিং করার চেষ্টা করেছি। তাসকিন উইকেট পেয়েছে। আবার তাসকিন আঁটসাঁট বোলিং করেছে, আমি উইকেট পেয়েছি। জুটি অনেক ভালো ছিল আমাদের বোলিংয়ের।”
ওই সময় ২০ রানের মধ্যে ৪ উইকেট তুলে নেয় বাংলাদেশ।
এরপর সালমান ও রিজওয়ান শতরানের জুটি গড়লেও পরে ৩৭ রানের মধ্যে শেষ ৫ উইকেট তুলে নিয়ে ২৭ রানের লিড নেয় বাংলাদেশ। সেখানে নিজেদেরই কৃতিত্ব দেখছেন মিরাজ।
“জুটি গড়া ক্রিকেটেরই অংশ। জুটি হতেই পারে। আমার কাছে মনে হয়, ওই সময়টা আমরা যেভাবে ওদেরকে চাপে রেখেছিলাম, সুযোগও চলে এসেছিল। আমরা আউট করতে পারিনি।”
“তবে আমার কাছে মনে হয় যে আমরা খুব ভালো কামব্যাক করেছি এবং সবাই ভালো জায়গায় বল করেছে, এমনকি দুটি সেশনের পরে আমরা যে যেভাবে আজকে ডমিনেট করেছি, এটা অবশ্যই বোলারদের কৃতিত্ব দিতে হবে।”