Published : 12 Jan 2026, 08:57 AM
পুরস্কার বিতরণী আয়োজন শেষে দুজন হেঁটে আসছিলেন মাঠের অন্য প্রান্তে। টিভিতে ম্যাচ পরবর্তী আলোচনায় থাকতে হবে দুজনকেই, এরপর সংবাদ সম্মেলনে। হেঁটে আসার পথে অনেকের ছবির আব্দার মেটাচ্ছিলেন তারা। পশতু ভাষায় কথা বলছিলেন নিজেদের সঙ্গে, কখনও খুব গুরুতর ভঙ্গিতে, কখনও আবার হেসে উঠছিলেন দুজনই। দুই সতীর্থ বা বন্ধু যেমন হয়।
তাদের সেই পরিচয়গুলোতে কোনো ভুল নেই। নোয়াখালী এক্সপ্রেসের হয়ে একসঙ্গেই খেলেছেন দুজন। দলের জয়ে ভূমিকাও রেখেছেন দুজনই। তবে তাদেরকে ঘিরে সবার এত আগ্রহের মূল কারণ তো তাদের অন্য পরিচয়। ঢাকা ক্যাপিটালসের বিপক্ষে ৪১ রানের জয়ে নোয়াখালীর নায়ক হাসান ইসাখিল, আর পার্শ্বনায়ক তার বাবা মোহাম্মাদ নাবি।
বাবা-ছেলে থেকে এই যে এখন তারা সতীর্থ, সেই পথটুকু আসলে একটি স্বপ্নযাত্রা। পরস্পরের স্বপ্নকে ধারন করে একই ঠিকানায় ছুটছেন দুজন।
স্বপ্ন ও লক্ষ্য একই হওয়ায় দুজনের সাধনাও একইরকম। সেখানে তারা গুরু-শিষ্য। শেখানো আর শেখার সেই প্রক্রিয়ায় কোনো খামতি নেই।
তারা যে ঠিক পথেই আছেন, সেই বিশ্বাসের জ্বালানি বিপিএলের এই ম্যাচটি।
ঘরোয়া ক্রিকেটে দুজন বেশ কবার খেলেছেন, জুটি গড়েছেন। দেশের বাইরের লিগে বাবা-ছেলে একসঙ্গে খেললেন এই প্রথম। নাবি তো নিয়মিতই খেলছিলেন নোয়াখালীর হয়ে, বিপিএলের তার নবম আসর এটি। ইসাখিলের বিপিএল অভিষেক হলো এই ম্যাচ দিয়ে।
এই পরিবারের জন্য গর্বের একটি মুহূর্তের জন্ম হয় ম্যাচের আগেই, যখন ১৯ বছর বয়সী ছেলের মাথায় অভিষেকের ক্যাপ তুলে দেন ৪১ বছর বয়সী বাবা।
তবে সত্যিকারের গর্ব তো পারফরম্যান্সে। সেখানেও উপলক্ষ স্মরণীয় করে রেখেছেন দুজনে মিলে। বিপিএল অভিষেকে ৬০ বলে ৯২ রানের ইনিংস খেলেছেন ইসাখিল, যা গড়ে দিয়েছে দলের জয়ের ভিত। বাবার সঙ্গে গড়েছেন ৩০ বলে ৫৩ রানের জুটি।
নাবি পরে বল হাতে উইকেট নিয়েছেন দুটি। ছেলের হাত ধরেও একটি উইকেটের পতন হয়েছে, যদি উইকেটে তার নাম লেখা থাকবে না। দুর্দান্ত সরাসরি থ্রোয়ে রান আউট করেছেন একটি।
নাবি যখন আউট হন, ম্যাচের তখনও দুই ওভার বাকি। ইসাখিল খেলছিলেন ৯২ রানে। সেঞ্চুরি ছিল নাগালেই। কিন্তু এক বল পরই তিনি অনুসরণ করলেন বাবাকে। ডাগআউটে বসে থাকা নাবির হতাশাটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল টিভি পর্দায়।

ছেলে অবশ্য সংবাদ সম্মেলনে দাবি করলেন, তিনি হতাশ হননি। নিজের সেঞ্চুরির চেয়ে দলের রান দ্রুত বাড়ানোই ছিল তার ভাবনায়।
“আমার ভাবনায় ছিল… আমি অপেক্ষা করছিলাম ছক্কার জন্য। প্রতিপক্ষকে যেন বড় লক্ষ্য দিতে পারি। শতক না পেয়ে খুব হতাশ হইনি। ছক্কা মারতে চেয়েছিলাম।”
সেই ৮ রানের হতাশা ততক্ষণে ঝেড়ে ফেলেছেন বাবাও। বরং ছেলে ৯২ রান করেছে, এটিই নাবির কাছে গর্বের উপলক্ষ।
“একসঙ্গে খেলতে পেরে সত্যিই গর্বিত। আমি ও আমার ছেলে লম্বা সময় অপেক্ষা করেছি এটির জন্য। পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে আমি ওকে তৈরি করেছি। বিপিএল অভিষেকে খুব ভালো করেছে।”
“একসঙ্গে যখন ক্রিজে ছিলাম, ওকে পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলছিলাম, পরের বলে কী হতে পারে, গতিময় হবে নাকি মন্থর, ধারণা দিচ্ছিলাম এসবের। সেভাবেই অপেক্ষা করে খেলেছে ও, সত্যিই ভালো খেলেছে।”
বিপিএল অভিষেকে ইসাখিলের এমন পারফরম্যান্স যে হুট করেই হয়ে যায়নি, বরং প্রক্রিয়ারই ফসল, সেটিও তুলে ধরেছেন নাবি।
“সত্যিই ভালো লাগছে। এই মুহূর্তটির অপেক্ষায় ছিলাম। গত দুই বছরে সে যেভাবে অনুশীলন করেছে, ঘরোয়া ক্রিকেটে পারফর্ম করেছে, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ও একদিনের ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছে, ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি শাগিজা লিগে পারফর্ম করেছে, গত বছর নেপাল প্রিমিয়ার লিগে খেলেছে…গত দুই বছরে সব মিলিয়ে ভালো পারফর্ম করেছে। আশা করি, ওকে জাতীয় দলেও দেখতে পাব।”
যেভাবে নজর কাড়ছেন ইসাখিল, জাতীয় দলে হয়তো একদিন খেলবেনও। তবে সেই দিনটি কবে? তার বাবা কি তখনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলবেন! কৌতূহল সেখানেই।
নিজেকে সেই জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জটি মূলত ছেলেরই। তিনি সেটা বোঝেনও। নিজের আর বাবার স্বপ্ন পূরণ করার তাড়নাতেই ঘাম ঝরিয়ে যাচ্ছেন নিত্য।
“এটা আমার স্বপ্ন, আমার বাবারও স্বপ্ন, জাতীয় দলে খেলা। এজন্যই কঠোর পরিশ্রম করছি, ঘরোয়া ক্রিকেটে মনোযোগ দিচ্ছি।”
বাবার মতো ছেলে অবশ্য অলরাউন্ডার নন, শুধুই টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান। সরাসরিই বললেন, ‘বোলিং আমার ভালো লাগে না। ব্যাটিং অনুশীলনে ক্লান্তি নেই…।”
ব্যাটিংয়ে বাবার সঙ্গে তার মিল দারুণ। দুজনের চেহারায় তো মিল আছেই স্বাভাবিকভাবে, উচ্চতা ও শারীরিক গড়নও প্রায় একই। হেলমেট পরা অবস্থায় একটু দূর থেকেও দুজনকে আলাদা করা কঠিন।

শট খেলার সময়ও পার্থক্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে সোজা ব্যাটে লফটেড যে শট নাবির নিজস্বতা, সেটি দারুণভাবে রপ্ত করে নিয়েছেন ইসাখিলও। এই শটে দুজনের সাদৃশ্য এত বেশি যে, বাবা-ছেলে জানার পরও কেমন অবিশ্বাস্য লাগে। এত মিল কীভাবে সম্ভব!
ইসাখিল বললেন, সেটা সহজাতভাবেই হয়ে গেছে।
“বাবাকে অনুকরণ করি না আমি, কপি করি না। কখনও ভাবিনি যে বাবার মতো খেলছি কি না। এমনিতে আমার বন্ধুরা কিংবা অনেক সাধারণ মানুষও বলে, ‘তুমি বাবাকে কপি করছো।’ আসলে আমি করি না। প্রকৃতিগতভাবেই হয়ে গেছে। আমি ওপেনার, তিনি লোয়ার অর্ডার। কিছুটা পার্থক্য আছে।”
বাবার সঙ্গে সম্পর্কের রসায়ন নিয়েও বললেন ইসাখিল। বন্ধু হিসেবেই পান বাবাকে, বাড়িতে আর দশ জন বাবার মতোই। তবে অনুশীলনে? উত্তরটা দিলেন নাবি, “অনুশীলনে আমি কঠোর…।” ছেলেও যোগ করলেন, “অনুশীলনে অনেক সময়ই বকা দেয় আমাকে।”
বাবার সঙ্গে অনুশীলন, ম্যাচ খেলা তো চলছেই। বিপিএলে এসে একটি প্রথম অভিজ্ঞতাও হয়ে গেল দুজনেরই। হাসানকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘বাবার সঙ্গে এটিই কি প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আপনার?’ পাশে বসা বাবাই আগে উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ।’ ছেলে সঙ্গে যোগ করলেন, “হ্যাঁ (এটিই প্রথম), সত্যি বলতে, আমি এই ধরনের সাক্ষাৎকারে অভ্যস্ত নই। এসব করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না, আমার ক্যারিয়ার, আমার ক্রিকেটে মনোযোগ দেই। সাক্ষাৎকার খুব একটা দেই না।”
এই দর্শনও তিনি পেয়েছেন বাবার কাছ থেকেই।
সব মিলিয়ে ইসাখিলের ক্রিকেট আর জীবন, সবকিছুতেই ছাপ বাবার।
এক পর্যায়ে ইসাখিলকে জিজ্ঞেস করা হলো, “আপনার ক্রিকেট নায়ক কে?” প্রশ্ন শুনেই পাশে বসা বাবা হেসে উঠলেন। ছেলেও উত্তর দিলেন মুহূর্তের মধ্যে।
উত্তরটা নিশ্চয়ই আপনি বুঝতেই পারছেন! কখনও কখনও কোনো প্রশ্ন করাই হয় উত্তরটা জানা থাকার পরও।