Published : 20 Jun 2025, 02:41 PM
বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের তিন উপদেষ্টা নিয়ে দেশের ক্রিকেটে চলছে আলোড়ন। বিসিবি বৃহস্পতিবার রাতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সাখাওয়াত হোসেনকে ক্রিকেট টুরিজম উপদেষ্টা, ব্যারিস্টার শেখ মাহাদি হাসানকে আইনি উপদেষ্টা ও সৈয়দ আবিদ হোসেন সামিকে ক্রিকেট উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই ঘোষণার পর থেকেই গঠনতন্ত্র লঙ্ঘনের অভিযোগে চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।
বিসিবির গঠনতন্ত্রের চতুর্থ অধ্যায়ে অনুচ্ছেদ ১৮-তে বলা হয়েছে, “ক্রিকেট বোর্ডে সভাপতি দেশের খ্যাতনামা ক্রিকেটার/ক্রিকেট সংগঠকদের মধ্য হইতে সর্বোচ্চ পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করিতে পারিবেন। ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি এই উপদেষ্টা কমিটির সদস্যদের নিকট হইতে প্রয়োজনে উপদেশ ও পরামর্শ গ্রহণ করিবেন।” কিন্তু এবার নিয়োগ পাওয়া উপদেষ্টা কমিটির কেউই খ্যাতনামা ক্রিকেটার বা ক্রিকেট সংগঠক নয়। এই উপদেষ্টা কমিটিকে তাই অবৈধ বলছেন অনেকে।
এসব অভিযোগ, উপদেষ্টা কমিটির প্রয়োজনীয়তা, তাদের কাজের ধরন ও পরিধি এসব নিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা তুলে ধরলেন বিসিবি সভাপতি।
আপনি এসেছেন খুব অল্প সময়ের জন্য, নিজের কাজের পরিকল্পনাও আপনার পরিষ্কার। তার পরও উপদেষ্টা কমিটির প্রয়োজন কেন হলো?
আমিনুল ইসলাম বুলবুল: আমি কাজের যে চার্টার তৈরি করেছি, ওটা ধরে এগোতে কঠিন সময় যাচ্ছে। কাজগুলি মসৃণ করার জন্য উপদেষ্টা প্রয়োজন মনে হয়েছে। ফারুক ভাই যখন ছিলেন (বিসিবি সভাপতির দায়িত্বে), উনারও তিনজন উপদেষ্টা ছিলেন। উনি সেটা পাবলিক করেননি। আমি করলাম এই কারণে যে, লোকে জানুক।
বিশেষ করে, লিগ্যাল উপদেষ্টা যিনি, ব্যারিস্টার মাহাদি, উনাকে আমার লাগবে। চলার পথে যত আইনি সহায়তা প্রয়োজন, উনি আমাকে তা করবেন। আইনগত অনেক কিছু আমি জানি না, আমার দক্ষতা নেই এখানে। উনার পরামর্শ আমার লাগবে।
উপদেষ্টাদের কোনো পারিশ্রমিক নেই। ডে টু ডে অফিস নেই। তাদের কাছে পরামর্শ চাইতে গেলে তারা পরামর্শ দেবেন। তারা নিজেদের থেকে কোনো কিছু বলতে আসবেন না।
বাকি দুজন? বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারা কতটা জরুরি?
আমিনুল: ক্রিকেট বোর্ড কিন্তু শুধু জাতীয় দল কেন্দ্রিক নয়। এটা প্রচুর বৈদিশিক মুদ্রা আয় করে, নানাভাবে অনেক আয় করে, দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে। যুব উন্নয়নেও ভূমিকা রাখে। আরও অনেক ব্যাপার আছে। অস্ট্রেলিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজে দেখেছি, ক্রিকেট পর্যটনের জন্য তাদের উইং আছে আলাদা। কীভাবে তারা বিদেশের মানুষদের আকৃষ্ট করবে, ক্রিকেটের মাধ্যমে দেশের বাইরে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে, পর্যটক নিয়ে আসা, এসব তাদের কাজ। যে দেশগুলো বাংলাদেশে সিরিজ খেলতে আসবে, সঙ্গে তারা যেন কিছু ক্রিকেট পর্যটকও আনতে পারে, সেই লক্ষ্যে একজন টুরিজম এক্সপার্ট আমরা নিয়েছি। এখানে সরাসরি মাঠের ক্রিকেটের ব্যাপার নেই।
লিগ্যাল উপদেষ্টা ও টুরিজম উপদেষ্টা তাই ক্রিকেটের বাইরে অন্যান্য ব্যাপারগুলি দেখবেন।

ক্রিকেট পর্যটনে টুরিজম উপদেষ্টার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কেমন?
আমিনুল: বাংলাদেশের টুরিজম ও হোটেল ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি এখন নাম্বার ওয়ান। তিনি শেরাটন হোটেল, ওয়েস্টিন হোটেলসহ আরও দুটি হোটেলের প্রধান নির্বাহী। এই সেক্টরে তার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অনেক। আমাদের কক্সবাজার ভেন্যু, সিলেট ভেন্যু, এছাড়াও ঢাকায় যখন খেলা হয়, দ্বিপাক্ষিক সিরিজের পাশাপাশি ২০২৭ সালে মেয়েদের অনূধর্ব-১৯ বিশ্বকাপ আছে এখানে, সেবছর এশিয়া কাপ আছে, ২০৩১ ওয়ানডে বিশ্বকাপ আছে, এই ধরনের সব ইভেন্ট ধরে যেন তাকে আমরা কাজে লাগাতে পারি। তার অভিজ্ঞতা অবিশ্বাস্য এই সেক্টরে।
তার মানে, এই উপদেষ্টারা কি দীর্ঘমেয়াদে কাজ করবেন? তিন-চার মাস পর বিসিবি নির্বাচন শেষে আপনি সভাপতি না থাকলেও তারা থাকবেন?
আমিনুল: নাহ, আমি যতদিন আছি, ততদিন তারা থাকবেন। পরেরটা তো তখনকার সভাপতি দেখবেন। আমার সঙ্গে কাজটা শুরু করে দেখিয়ে দেবেন তারা।
তাহলে এই তিন-চার মাসে টুরিজম উপদেষ্টা কতটা কী করতে পারবেন বা কতটা জরুরি ছিল, এই প্রশ্ন তো থাকছে! ক্রিকেট উপদেষ্টার কাজ কেমন হবে?
আমিনুল: সামির যে অন্তর্ভুক্তি… দেখুন, ক্রিকেটে এখন অনেক ব্যাপার চলে এসেছে। ডিজিটালাইজেশন বলুন, স্ট্রিমিং বলুন, সামাজিক মাধ্যম সামলানো, এরপর আমরা যেহেতু তৃণমূলে যাচ্ছি, তাদেকে আমরা কীভাবে সম্পৃক্ত করব, করার পর তাদেরকে কীভাবে গড়ে তুলব, এজন্য আমাদের সাপোর্ট দরকার। তাকে আমরা ওই কাজগুলিতে ব্যবহার করব।
ডিজিটালাইজেশন তো এই সময়ে একদমই মৌলিক ব্যাপার। বিসিবির মিডিয়া বিভাগ কি যথেষ্ট নয়? তাছাড়া তিনি তো ডিজিটাল মিডিয়া উপদেষ্টা নন, সামগ্রিক ক্রিকেটেরই উপদেষ্টা। সেই অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা তার কতটা আছে?
আমিনুল: আপনারা জেনে খুশি হবেন যে, বিসিবির যে নতুন ‘অর্গানাইজেশন চার্ট’ আমরা তৈরি করছি, সেখানে আরও কিছু নতুন জায়গা যোগ হচ্ছে। আইসিসিতে যখন ছিলাম, দেখেছি যে ফিন ব্র্যাডশ নামে একজন আছেন, যিনি ডিজিটাল হেড। আমাদের মিডিয়াতেও এখানে অনেক কাজ করার আছে। এখন তো মিডিয়া বিভাগের প্রধান আছেন মিঠু ভাই (ইফতখার রহমান), আর রাবিদ ভাই আছেন (সিনিয়র মিডিয়া ম্যানেজার), তারা রেগুলার মিডিয়া সামলানোর ব্যাপারে এক্সপার্ট এবং ভালোভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
এখানে আমরা পরিসর আরও বাড়িয়ে ডিজিটালাইজেশন করতে চাই, হেড অব ডিজিটাল, হেড অব টেকনিক্যাল ও আস্তে আস্তে ওই জায়গুলো তৈরি করতে চাই। সেখানে সামিকে কাজে লাগতে পারে।
আপাতত তৃণমূলে যে কাজ আমরা করছি, টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার ২৫ বছর উপলক্ষে আয়োজন আমরা ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দিচ্ছি, এটাকে বিকেন্দ্রীকরণের লঞ্চপ্যাড হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছি। সেখানে ছোট ছোট যে কাজ আছে, ভবিষ্যতের ক্রিকেটার যারা আছেন, তাদেরকে কানেক্ট করার জন্য একটা মাধ্যম লাগবে। এই মুহূর্তে সামিকে আমরা এই কাজটায় ব্যবহার করব।
ফারুক আহমেদের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ উঠেছিল যে, মাত্র ১২-১৪ মাসের জন্য দায়িত্বে এসে তিনি নিজের কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করতে পারেননি। অতি জরুরি কাজের চেয়ে অন্য অনেক দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। আপনার সময় আরও কম। দায়িত্ব নিয়ে আপনি বলেছিলেন, ‘কুইক টি-টোয়েন্টি ইনিংস’ খেলতে চান। এখন উপদেষ্টা কমিটি নিয়োগকে কেন অগ্রাধিকার দিলেন? কেন এটা এত জরুরি?
আমিনুল: দেখুন, যেহেতু আমি ক্রিকেট খেলেছি দীর্ঘদিন, এরপর ২০ বছর কাজ করেছি প্রফেশানালি এই সেক্টরে, ক্রিকেটের যে জায়গাগুলি, একদম কোর ক্রিকেট, যেমন কোচ তৈরি করা, আম্পায়ার তৈরি করা, হাই পারফরম্যান্স পাথওয়ে ঠিক করে দেওয়া, কোচদের সঠিক জায়গায় নিয়ে যাওয়া, কোচদের স্পেশালিস্ট প্রোগ্রামগুলো, এগুলো করতে চাই আমি।
কাজের যে চার্ট আমি করেছি, যেটাকে ‘ট্রিপল সেঞ্চুরি’ নাম দিয়েছি, এটার মধ্যে আছে ১০০ ভাগ ট্রাস্ট, ১০০ ভাগ পারফরম্যান্স ও ১০০ ভাগ প্রোগ্রাম। এই কাজগুলি করার জন্য আমরা যে চারটা বড় বড় উদ্যোগ হাতে নিয়েছি, এগুলোর মধ্যে এক নম্বর হচ্ছে ইন্টেগ্রিটি বাড়ানো। ইন্টেগ্রিটি ও এডুকেশন বাড়ানো যে কত গুরুত্বপূর্ণ, আপনারা জানেন যে তরুণ ক্রিকেটারদের বা আরও অনেক ক্রিকেটারদের বিপিএল থেকে শুরু করে অনেক বদনাম আছে, এটাকে আমরা কীভাবে আরও ভালো করতে পারি ও সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারি এবং ভুলটা যেন না করে, ক্রিকেটার ও বোর্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাইকে এডুকেট করা, এটাকে গুরুত্ব দিচ্ছি আমরা।
দুই নম্বরে যেটা করছি, হাই পারফরম্যান্স ফর এভরিওয়ান। শুধু জাতীয় দল নয়, আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা আছেন, আমি নিজেও, সবার কাজ যেন ‘হাই পারফরম্যান্স’ হয় সবসময়। কোনো আজেবাজে কাজ নয়।
তিন নম্বরে আছে, সারা দেশকে একসঙ্গে কানেক্ট করব বিকেন্দ্রীকরণের জন্য। সেজন্য আমরা নানা পরিকল্পনা করছি। চারটা গ্রেটার প্রিমিয়ার লিগ বা চারটা গ্রেটার লিগ, অনূর্ধ্ব-১৯ ও তাদের নিচের বয়সের ছেলেদের চার দিনের ম্যাচের ক্রিকেট, এরকম নানা পরিকল্পনা আছে।
চার নম্বরেও আছে ক্রিকেট বোর্ডকে একটি আন্তর্জাতিক মানের সংগঠনে পরিণত করা।
আমি যে কুইক টি-টোয়েন্টি ইনিংসের কথা বলেছিলাম, এজন্য মনে হয়েছে এই চারটি প্রোগ্রাম আমরা শুরু করব। হয়তো শেষ করার সময় আমি পাব না। তবে ট্রিপল সেঞ্চুরি প্রোগ্রামের আওতায় এই চারটি কাজ শুরু করতে চাই।
আমি জানি, এসব শুরু করতে গেলে প্রচুর সমস্যা ও ঝামেলা আসবে। সেসব ট্যাকল দেওয়ার জন্য লিগ্যাল দিকটা সামলানো আমার খুবই দরকার। এজন্য এই উপদেষ্টাকেও আমার লাগবে।
বাকি যে দুজন আছে, তাদের পরামর্শ প্রয়োজন মনে করলে নেব, প্রয়োজন মনে না হলে নেব না।
তবে একটা কথা বলতে চাই, আমার এই চার্টার আমি দাঁড় করিয়ে দিয়ে যাব। এখানে কাজ করতে এসেছি। যদি কাজ করতে না পারি, সময় নষ্ট করব না।

কিন্তু সেই কমিটি গঠনে বোর্ডের গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করা হয়েছে পরিষ্কারভাবে। এটার ব্যাখ্যা কী?
আমিনুল: ব্যাপারটি আমি আসলে গতকালকেই দেখলাম। গঠনতন্ত্রে আছে সাবেক ক্রিকেটার বা ক্রিকেট সংগঠক হতে হবে। তবে যিনি ক্রিকেটের কাজ করবেন, তিনি সাবেক ক্রিকেটার বা সংগঠক না হলেও … কী বলা যায়… টেকনিক্যালভাবে আমরা কীভাবে ক্রিকেটের কাজে লাগাতে পারি… সেই চেষ্টা করছি। তবে এটা ঠিক, গঠনতন্ত্রের সঙ্গে আমাদের অ্যাডজাস্ট করতে হবে এটা।
গঠনতন্ত্রের বাইরের কোনো কিছুকে ‘অ্যাডজাস্ট’ করা কিভাবে সম্ভব?
আমিনুল: প্রয়োজনের খাতিরে কিছু জিনিস ‘ইয়ে’ করতে হয়। সেই অ্যাডজাস্টমেন্ট আমরা করব জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সঙ্গে বসে।
তাহলে কি সাবেক ক্রিকেটার বা সংগঠকদের মধ্যে উপযুক্ত কেউ নেই আপনার উপদেষ্টা হওয়ার জন্য?
আমিনুল: অবশ্যই আছে। আপনি সঠিকই বলছেন। তবে এটা তো মাত্র শুরু হলো। আমরা একটা ‘ক্যাপ্টেনস টিম’ করব, তাদেরকে মৌলিক ক্রিকেটের কাজে কীভাবে কাজে লাগাতে পারি, সেটাও আছে আমার ওই চার্টারে।
যেমন ধরুন, আমরা যে টেস্ট মর্যাদার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশব্যাপী প্রোগ্রাম করছি, এর কারণটিই হচ্ছে একটি লঞ্চপ্যাড প্রস্তুত করা যে, ওখানকার যে জেলা প্রশাসক আছেন, বা পুলিশ প্রধান আছে কিংবা অন্য যারা স্টেকহোল্ডার আছেন, তাদেরকে বলতে চাই যে এভাবে এভাবে আমরা আপনার বিভাগে বা জেলায় কাজ করতে চাই, লঙ্গার ভার্সন ক্রিকেট করতে চাই।
এটা এজন্য বলছি যে, ওখানে কিন্তু একজন ‘হেড অব ক্রিকেট’ থাকবেন, যিনি অবশ্যই হবেন সাবেক ক্রিকেটার। উদাহরণের জন্য বলছি, রাজশাহীতে যেমন পাইলটকে (সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ) প্রস্তাব দিতে পারি, বা অন্য জায়গায় এরকম অন্যদেরকে, তারা সাবেক ক্রিকেটারই হবেন।
তাদের সঙ্গে আমরা বসব। এটা কিন্তু উপদেষ্টা থেকেও আরও বড় কাজ, অপারেশনাল কাজ হবে। সেখানে আমরা তাদেরকে কাজে লাগাব।
শুধু এটাই নয়, ১২ থেকে ২০ জন থাকবে, যারা দেশব্যপী ক্রিকেট কোচদের কোচিং করাবে। সেখানে অবশ্যই সাবেক ক্রিকেটারদের কাজে লাগাব। যারা সাবেক ক্রিকেটার বা সদ্য অবসরে গেছেন, তাদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট করে আমরা দেশের ক্রিকেটের উন্নতিতে কাজে লাগাব। আমি যদি এই সময়ে কাজে না লাগাই, আর কবে লাগাব!