Published : 28 Jun 2026, 09:44 AM
ক্রিকেটে কখনও কখনও সংখ্যা স্রেফ নিরেট থাকে না, বরং জীবন্ত হয়ে ফুটে ওঠে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই ইনিংসে যেমন। এই ম্যাচে যার খেলারই কথার ছিল না, সেই আমির জাঙ্গু অসাধারণ এক ডাবল সেঞ্চুরি উপহার দিলেন দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমেই। ব্যাট হাতে ভয়ঙ্কর দুঃসময়ে ছিলেন যিনি, সেই রস্টন চেইসও খেললেন ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস। একটুর জন্য ডাবল সেঞ্চুরি হলো না তার। তবে সেই আক্ষেপের চেয়ে প্রাপ্তিগুলোই তো বড়। এই জুটির কীর্তিও খোদাই হয়ে গেল টেস্ট ইতিহাসে।
সবকিছুর ফলাফল, ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান পাহাড়ে চাপা পড়ে হাঁসফাঁস শ্রীলঙ্কার।
অ্যান্টিগা টেস্টের তৃতীয় দিনে ৯ উইকেটে ৬২৬ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
৩৭৩ বলে ২৩৩ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেন জাঙ্গু। ১৯ চারের সঙ্গে ইনিংসে ছক্কা ৩টি।
মজার ব্যাপার হলো, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এর আগে দুটি সেঞ্চুরি করেছেন তিনি, দুটিতেই রূপ দিয়েছেন ডাবল সেঞ্চুরিতে (২১৮ ও ২০৩)। গত বছর টেস্ট অভিষেকে ০ ও ৩০ রান করার পর এই টেস্টে ফিরে ছাড়িয়ে গেলেন নিজেকে। অথচ শেই হোপ চোটে না পড়লে এই ম্যাচে বাইরেই থাকতে হতো ২৮ বছর বয়সী বাঁহাতিকে।
চেইসের বাইরে থাকার কথা ছিল না। তিনিই যে দলের অধিনায়ক। তবে ফর্মের যে হাল ছিল, যে কো সময় খড়গ নেমে আসতেই পারত। এই টেস্টের আগে নেতৃত্বের ৮ টেস্টে কোনো ফিফটি ছিল না তার, ব্যাটিং গড় ছিল স্রেফ ১৩.৮১!
অধিনায়ক হিসেবে আগের ১৬ ইনিংস মিলিয়ে তিনি করেছিলেন ২২১ রান। এবার এক ইনিংসেই করলেন ১৯৪। ৩২৪ বলের ইনিংসে চার ১৩টি, ছক্কা ২টি।
২০ ইনিংস পর ফিফটি পর্যন্ত যেতে পারলেন তিনি। শতরানের স্বাদ পেলেন ৫৩ ইনিংস পর!
তার ষষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরি এটি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১১৫ ম্যাচের ক্যারিয়ারে তার আগের সর্বোচ্চ ছিল ১৩৭।
জাঙ্গু-চেইসের যুগলবন্দিতে প্রায় ১৫০ বছরের টেস্ট ইতিহাসে প্রথমবার ৪০০ রান উঠেছে ষষ্ঠ জুটিতে। আগের সেরা ছিল ২০১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের বেন স্টোকস ও জনি বেয়ারস্টোর ৩৯৯।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে যে কোনো উইকেটেই এর চেয়ে বড় জুটি আছে আর মোটে একটি। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে কিংস্টনে দ্বিতীয় উইকেটে ৪৪৬ রান যোগ করেছিলেন কিংবদন্তি স্যার গ্যারি সোবার্স ও কনরাড হান্ট। সেই ইনিংসেই প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিতে অপরাজিত ৩৬৫ রানের অবিস্মরণীয় ইনিংস খেলেছিলেন সোবার্স, ২৬০ রানে রান আউট হয়েছিলেন হান্ট।
সেই জুটিকে মনে করালেনে এবার জাঙ্গু ও চেইস। অ্যান্টিগার স্যার ভিভ রিচার্ডস স্টেডিয়ামে এই জুটির আগে ১৬৮ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বিপদে ছিল ক্যারিবিয়ানরা। সেখান থেকে ৭৮ রানে দ্বিতীয় দিন শেষ করেন জাঙ্গু, ৪২ রানে চেইস।
তৃতীয় দিনে তাদের ম্যারাথন জুটি ছুটতেই থাকে। ২২৬ বলে সেঞ্চুরি ছুঁয়ে হুঙ্কার ছুড়ে খ্যাপাটে উদযাপন করেন জাঙ্গু। নিজেও হয়তো ধারণা করেননি, আরও বড় মাইলফলকে পৌঁছবেন তিনি।
চেইসের শতরান আসে ২১৬ বলে।
প্রথম দুই সেশনে কোনো উইকেট পায়নি শ্রীলঙ্কা। আগের দিন ১ ওভার বোলিং করেই মাঠ ছেড়ে যাওয়া পেসার লাহিরু কুমারার অভাব অনুভূত হয় প্রবলভাবেই। অন্য বোলারদের ওপর পড়ে বাড়তি চাপ।
চা বিরতির পর জাঙ্গু দুইশতে পা রাখেন ৩৪২ বলে। এরপর বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রান করতে থাকেন। মিলান রাথ্নায়েকের বলে পুল করে একটি ছক্কা মারার পরের বলে আবার একই শটের চেষ্টায় আউট হয়ে যান।
চেইসের ডাবল সেঞ্চুরিও মনে হচ্ছিল স্রেফ সময়ের ব্যাপার। তবে ইনিংসজুড়ে দারুণ সব সুইপ খেলেও হুট করে গড়বড় হয়ে যায়। বাঁহাতি স্পিনার সোনাল দিনুশার বলে বেশি সাফল করে সুইপের চেষ্টায় বোল্ড হয়ে যান পায়ের পেছন দিয়ে।
পরের ওভারে কিমার রোচ আউট হতেই ইনিংস ঘোষণা করে ক্যারিবিয়ানরা।
ওই উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথমবার ৫ উইকেটের স্বাদ পান রাথ্নায়েকে।
দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নামা স্পিনিং অলরাউন্ডার দিনুশা দুই উইকেট নেন ৫৬ ওভারে ২৩৪ রান দিয়ে। শ্রীলঙ্কার হয়ে এক ইনিংসে এর চেয়ে বেশি রান দেওয়ার নজির একটিই। ২০০৯ সালে ভারতের বিপক্ষে মুম্বাইয়ে ৫৫.৩ ওভারে ২৪০ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিয়েছিলেন রাঙ্গানা হেরাথ।
বিশাল ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে ব্যাটিংয়ে নেমে শেষ বিকেলে ওপেনার পাথুম নিসাঙ্কাকে হারায় শ্রীলঙ্কা। নিশান মাদুশকা ও নাইটওয়াচম্যাচ কাসুন রাজিথা শেষ সময়টা পার করে দেন।
তবে তাদের অপেক্ষায় কঠিন চ্যালেঞ্জ। ইনিংস পরাজয় এড়াতেই প্রয়োজন আরও ৩০৩ রান।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
শ্রীলঙ্কা ১ম ইনিংস: ৩০৮
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১ম ইনিংস: ১৬০.৫ ওভারে ৬২৬/৯ (ডি.) (আগের দিন ২৭১/৫) (জাঙ্গু ২৩৩, চেইস ১৯৪, আলজারি জোসেফ ২১, শামার জোসেফ ১৭*, রোচ ০; আসিথা ২৮-৮-৫৬-২, কুমারা ১-০-৪-০, রাজিথা ২৬-৩-১০২-০, রাথ্নায়াকা ৩৫.৫-৮-১২৪-৫, দিনুশা ৫৬-১-২৩৪-২, ধানাঞ্জায়া ৫-০-১৭-০, কামিন্দু ৯-০-৪৬-০)।
শ্রীলঙ্কা ২য় ইনিংস: ৪ ওভারে ১৫/১ (নিসাঙ্কা ৩, মাদুশকা ২*, রাজিথা ৪*; রোচ ২-০-৬-০, সিলস ২-০-৫-১)।