Published : 27 Jun 2026, 09:16 PM
বাংলাদেশের টেস্ট দলে রবিউল হকের ডাক পাওয়ার খরটি বেশ পুরোনো। এখন বরং কৌতূহল, রোববার তিনি হারারে টেস্টে তিনি টেস্ট ক্যাপ পান কি না। তবে এবারই অভিষেক হোক বা না হোক, পেসারদের তীব্র প্রতিযোগিতার এই সময়ে টেস্টে স্কোয়াডে জায়গা করে নিতে পেরেও নিজেকে সৌভাগ্যবান মানছেন তিনি। জাতীয় দলের দুয়ার যেহেতু খুলেছে, খেলার সুযোগও মিলবে আজ হোক বা কাল।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তিনি বেশ ধারাবাহিক পারফরমার। সবশেষ জাতীয় লিগে উইকেট নিয়েছেন ২২টি। বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের একমাত্র রাউন্ডে নিয়েছেন ম্যাচে ছয় উইকেট। লাল বলের ক্রিকেটে দারুণ ছন্দেই আছেন। জিম্বাবুয়ের উড়ানে ওঠার আগে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি শোনালেন জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার পর অনুভূতি, কথা বললেন ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের পারফরম্যান্স, বোলিংয়ের ধরন, দর্শন আর প্রত্যাশা নিয়েও।
জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার মুহূর্তটা কেমন ছিল?
রবিউল হক: আশা ওরকম কখনও করিনি যে, সামনের বছর ভালো করে পরের বছর জাতীয় দলে খেলতে হবে। সবসময় লক্ষ্য রাখতাম পরের যে টুর্নামেন্টই আসবে, সুস্থ থেকে বা ফিট থেকে ভালোভাবে পারফর্ম করতে হবে। ঘরোয়াতে নিজের স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করতে হবে। যদি ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের স্ট্যান্ডার্ড ঠিক না করি, আমাকে জাতীয় দলে চিন্তা করবে না।
আমি বছরের পর বছর চেষ্টা করছি, কীভাবে ঘরোয়াতে কিভাবে নিজেকে সেরা জায়গায় নিয়ে যেতে পারি। অন্তত নিজের কাছে যেন ভালো লাগে, আমি এখানে ডমিনেট করছি। দাপুটে ক্রিকেট খেলাটা অনেক জরুরি ছিল। সবসময় চেষ্টা করি ডমিনেটিং ক্রিকেট কিভাবে খেললে বা কিভাবে প্র্যাকটিস করলে ঘরোয়া ক্রিকেটে আমি ভালো করতে পারব। বছরের পর বছর এভাবেই চেষ্টা করে গেছি নিজের স্কিলে উন্নতি থেকে থেকে শুরু করে ফিটনেস, গেম সেন্স— এই বিষয়গুলো নিয়েই সবসময় কাজ করে গেছি।
বাংলাদেশে এখন জাতীয় দল ও আশেপাশে পেসার। এত পেসারদের ভিড়ে এই সময়ে জাতীয় দলে ডাক পেয়ে নিজেও কি চমকে গেছেন?
রবিউল: তা বলতে পারব না। তবে একটা সময় আমার মনে হয়েছিল, হয়তো বা এখন একটা ডাক আসতে পারে। যদিও ওভাবে ভাবিনি। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছিল। কারণ আমি এই বছরে প্রথম শ্রেণি ক্রিকেটে এনসিএলে ও বিসিএলে অনেক ভালো পারফর্ম করেছি।
একটা সময় একটা খেলোয়াড়ের মনে আসে, একটা ভালো ছন্দে আছি, কিছু একটা ঘটতে পারে— এ রকম একটা ফিল আসে। আমার ওই রকম একটা ধারণা ছিল। সেভাবেই একটা সুযোগ আসছে।
জাতীয় লিগে উইকেট শিকারে মকিদুল ইসলামের সঙ্গে আপনার দারুণ একটা প্রতিযোগিতা হয়েছিল। তিনি এখন ইনজুরির কারণে মাঠের বাইরে। কি মনে হয়, তিনি ফিট থাকলে টেস্ট দলের ঢুকতেও আপনার সঙ্গে লড়াই হতো?
রবিউল: আমি কখনও কাউকে প্রতিযোগী হিসেবে চিন্তা করি না। কারণ সবার খেলা, সবার স্কিল আলাদা। সবাই পরিশ্রম করে সবার খেলার জন্য। মুগ্ধর (মুকিদুল) জন্য নিজেরই খারাপ লাগে। শুধু মুগ্ধ না, যত প্লেয়ার ইনজুরিতে থাকে, সবার জন্যই ব্যক্তিগতভাবে আমার অনেক খারাপ লাগে। আমি নিজেও এই ধাপগুলো পার করেছি। বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই পার করে। যারা এমন পরিস্থিতি পার করে, তারা কখনোই চায় না একটা খেলোয়াড় ইনজুরিতে থাকুক, আর তার জায়গায় আমি সুযোগ পাই।
প্রত্যেকেরই আলাদা ক্যারিয়ার, আলাদা জায়গা আছে। অবশ্যই যারা ইনজুরিতে পড়েছে, তারা যেন দ্রুততম উপায়ে সুস্থ হয়ে মাঠে ফেরে, এটাই প্রথম চাওয়া। মুগ্ধ রংপুর বিভাগের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। ও যখনই খেলে, তখনই আমাদের দলের ফলাফল ও পারফরম্যান্সটা অনেক আলাদা হয় আমাদের বিভাগে। ওর সঙ্গে আমার ভালো বোলিং জুটি আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে প্রতিযোগী মনে করি না। আমার খেলা নিয়ে থাকতে চাই ও থাকি। আমি চাই প্রত্যেকটা খেলোয়াড় যেন পরিশ্রম করে এবং ভালো খেলে।
জিম্বাবুয়েতে খেলার পূর্ব অভিজ্ঞতা আপনার নেই। সম্প্রতি বাংলাদেশ ইমার্জিং দলের হয়ে ম্যাচ খেললেন জিম্বাবুয়ে ‘এ’ দলের বিপক্ষে। ওদের সঙ্গে কথা হয়েছে কিছু?
রবিউল: জিম্বাবুয়ে ‘এ’ দলের কিছু খেলোয়াড়ের সঙ্গে কথা বলেছি, হারারের উইকেট সম্পর্কে। এখন শীতকালে আবহাওয়া কী রকম থাকে, সেটা নিয়ে যথেষ্ট ভালো তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছে ওরা। আমি ওইভবেই মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি। ওখানে গিয়ে হয়তো দুই দিন অনুশীলনের সুযোগ পাব, এর মধ্যেই আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। অবশ্য আমাকে এটা করতেই হবে।
বোলিংয়ে দুই দিকে সুইং করাতে পারেন। নতুন বলে আপনার ওপর সব সময় আস্থা রাখেন অধিনায়করা। জিম্বাবুয়ের আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে বোলিং নিয়ে চিন্তা-ভাবনাটা কেমন করেছেন?
রবিউল: টেস্ট ক্রিকেট পুরোটাই ধৈর্য আর স্কিলের খেলা। যদি এমন স্কিল থাকে, দুই দিকে সুইং করাতে পারি, এটা অনেক বড় সুবিধা। শুধু নতুন বলে না, একটা বড় জুটি হলে, তখন বল পুরোনো হলে তখন মূলত স্কিলের খেলা শুরু হয়। কিভাবে সেমি-নিউ বল বা পুরোনো বলে ব্রেক থ্রু করতে পারেন। কিভাবে আপনি জুটিতে বোলিং করছেন— এই জিনিসগুলো অনেক ম্যাটার করে। নতুন বল হোক, পুরাতন কিংবা সেমি-নিউ, আপনাকে ওই ধৈর্য্য রেখে দলকে পার্টনারশিপ বোলিং ডেলিভার করতে হবে।

হাসান মাহমুদের সঙ্গে অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলার অভিজ্ঞতা আছে। এখন জাতীয় দলে খেলবেন। দুইজনই প্রায় একই ধাঁচে বোলিং করেন। সুযোগ পেলে, দুই জনের একসঙ্গে বোলিং করার পরিকল্পনা কি থাকবে?
রবিউল: এখনও আমি নিশ্চিত না, খেলব কি না। কিন্তু প্রস্তুতি তো শতভাগ খেলারই থাকবে। যদি খেলি এবং দল যদি ওই রকম চিন্তা করে খেলানোর, অবশ্যই আমি এক প্রান্ত থেকে চেষ্টা করব কীভাবে দলকে শতভাগ দেওয়া যায়। রান আটকে হোক বা ভালো জায়গায় বল করে হোক। হাসান, খালেদ ভাই বা ইবাদত ভাই যারাই খেলি না কেন, তাদের সঙ্গে পার্টনারশিপে বোলিং করব। চেষ্টা করব সেরা উপায়ে দলকে সমর্থন করার এবং আমার পার্টনারকে।
দেশের ক্রিকেটে তো এখন সেনসেশন নাহিদ রানা। তাকে দেখে কি মনে হয়, আপনিও যদি এত জোরে বোলিং করতে পারতেন!
রবিউল: ১৪০-এর বেশি গতি বা নাহিদ রানা হচ্ছে ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম তো কখনও উদাহরণ নয়। টেস্ট ক্রিকেটে হচ্ছে স্কিল। জিমি অ্যান্ডারসন এখনও খেলে যাচ্ছেন কাউন্টি ক্রিকেটে। কত গতিতে বল করে? ১২৮-১২৫- ১৩০ কিলোমিটার। তিনি কিন্তু ৭০৪ (টেস্ট) উইকেটের মালিক। বেঞ্চমার্ক একটা জিনিস, আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে আপনি কীভাবে পারফর্ম করছেন। এটা ভালো ব্যাপার, একটা ভালো প্রতিযোগিতা চলছে।
নাহিদ রানা ১৪৫ কিলোমিটারে বল করে, ওটা দেখে যদি আপনিও কাজ করেন, তাতে আপনার গতি এক-দুই কিলোমিটারও বাড়ে, এটাই অনেক বড় জিনিস, এটাই অনেক সাহায্য করে। এই প্রতিযোগিতাটা খুব ভালো। একই সময়ে নিজের স্কিল ও স্ট্রেংথকে বিশ্বাস করতে হবে। লোভী হলে সমস্যা। লোভী হওয়া যাবে না যে, ও ১৪৫-এ করে, আমাকেও প্লাসে করতে হবে। বায়োমেকানিজম বলতে একটা ব্যাপার আছে। আপনার ফিজিক্যাল স্ট্রেংথ আরেকজন খেলোয়াড়ের মতো হবে না। একেকজন খেলোয়াড় একেক রকম স্কিল নিয়ে আসে। প্রত্যেকটা খেলোয়াড়ের নিজস্ব স্কিল থাকে।
যারা অনেক বেশি গতিতে বল করে, তাদের কিন্তু সুইংটা থাকে না। আবার যারা ১৩০ কিলোমিটারের বেশি বা ১৩৫-১৪০ এর নিচে, তাদের কিন্তু সুইং থাকে। যার সুইং আছে, সে সুইং দিয়ে কাজ করবে। যার পেস আছে, সে পেস দিয়ে সাপোর্ট করবে।
আপনি এক জায়গায় এবং একই লেংথে টানা বল করে যেতে পারেন। এটা আপনার শক্তির জায়গা। টেস্ট ক্রিকেটে সেটা কার্যকর করতে কতটা আত্মবিশ্বাসী?
রবিউল: যারা যেখানে সফল, তাকে সেই জায়গায় সফল বলেই সেভাবে চিন্তা করা হয়। আমার যেটা বেসিক, সেটার জন্যই জাতীয় দলে নেওয়া হয়েছে। আমি অবশ্য এই স্কিল নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। এখানে আমার উন্নতির অনেক জায়গা আছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেললে অভিজ্ঞতা হয়, এবং বোঝা যায় কোন কোন জায়গায় উন্নতি করা উচিত। কোন কাজ করলে নিজের স্ট্যান্ডার্ড আরও ওপরে উঠবে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভালো করতে শুধু অনুশীলন করলেই হবে না। খেলে খেলে শিখতে হবে, আয়ত্ত করতে হবে, অভিজ্ঞতা নিতে হবে। প্রতিনিয়ত উন্নতি করতে হবে। একটা জায়গায় গিয়ে আর থেমে থাকতে পারবেন না। আমার মনে হয় দিন দিন প্রত্যেকটা জায়গায় উন্নতি করতে হবে।
প্রথমবার টেস্ট দলে জায়গা পেয়েছেন। অধিনায়কের সঙ্গে কতটা কথা হয়েছে?
রবিউল: শান্ত ভাই অনেক সাপোর্টিভ। আগে বিসিএলে ওয়ালটনে একসঙ্গে খেলছি উনার নেতৃত্বে। খেলোয়াড়দের যথেষ্ট স্পেস দেন, স্বাধীনতা দেন পারফর্ম করার জন্য। ফোন করে বলছেন প্রস্তুত থাকতে আর নিজেকে তৈরি করতে।
আসলে এটা খুব ভালো জিনিস যে সময়ে টেস্ট ক্রিকেটে একটা বিপ্লব হচ্ছে বাংলাদেশে। এমন সময়ে উনি হোক বা নির্বাচকরা হোক বা টিম ম্যানেজমেন্ট হোক, সবাই মিলে চিন্তা করছে নতুন কাউকে দেখার। অনেক সাহসী সিদ্ধান্ত আমার মনে হয়। কারণ যখন একটা উইনিং ফ্লোতে থাকবেন, তখন সহজে কেউ ফ্লো পরিবর্তন করতে চায় না। এই সময়ে যখন সাহসটা দেখাচ্ছে, এর জন্য মনে হচ্ছে খুবই ভাগ্যবান আমি। অবশ্যই একজন সফল অধিনায়ক যখন এভাবে ভেবেছে, এটা আমার কাছে বিশেষ কিছু।